প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হঠাৎ বাড়ছে। টানা দু'দিন ধরে আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজারের ওপরে রয়েছে। মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। করোনা সংক্রমণের সার্বিক বিষয় নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। পরামর্শ দিয়েছেন মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে। একই সঙ্গে আইসিইউর পরিবর্তে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ কী ধরনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন, তা জানতে জিনোম সিকোয়েন্সিং করারও তাগিদ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সমকালের সঙ্গে তার কথোপকথন তুলে ধরা হলো-
সমকাল : সংক্রমণ হঠাৎ করে এতটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে কী কারণ বলে আপনি মনে করেন।
ডা. আব্দুল্লাহ : সংক্রমণ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং মাস্ক ব্যবহার না করা। নিম্নমুখী সংক্রমণের কারণে মানুষ মনে করেছিল করোনা বিদায় নিয়েছে। এর মধ্যেই টিকাদান শুরু হওয়ার কারণেও মানুষ অধিক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। অধিকাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করছিল না। বিয়েসহ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ধুম পড়ে যায়। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে অস্বাভাবিক ভিড় বেড়ে যায়। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের মনোভাব ছিল, করোনাভাইরাস চলে গেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মানুষের এমন বেপরোয়া চলাফেরার ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যেই সংক্রমণ আবারও বাড়তে থাকে। এখন এটি আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। গত দু'দিনের সংক্রমণ পরিস্থিতি গত বছরের জুন-জুলাই মাসকে পেছনে ফেলেছে। এই সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
সমকাল : করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আপনার পরামর্শ কী।
ডা. আব্দুল্লাহ : করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। অর্থাৎ মাস্ক ব্যবহার করা। এই মাস্ক পরলে নিজে এবং অন্যকে সুরক্ষিত রাখা যাবে। আর ঘনঘন ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। হাত না ধুয়ে মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ করা যাবে না। এটি শুরু থেকেই আমরা বলে আসছি। এর বাইরে সরকার গত সোমবার যে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে, তা যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে।
সমকাল : সরকারি নির্দেশনা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী।
ডা. আব্দুল্লাহ : সরকারি নির্দেশনা অবশ্যই সচেতনতা বাড়াবে। কিন্তু ওই নির্দেশনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। নির্দেশনা মানতে বাধ্য করা হবে এবং মানতেই হবে- এ জাতীয় শব্দ প্রয়োগ করলে হয়তো আরও জোরালো হতো। এখন সংশ্নিষ্ট বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থাগুলো কীভাবে ওই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে, তা দেখতে হবে।
সমকাল : বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো কিংবা আংশিক লকডাউন দেওয়া উচিত কিনা?
ডা. আব্দুল্লাহ : বাংলাদেশের মতো একটি দেশে লকডাউন কিংবা ছুটি কার্যকর করা সম্ভব নয়। গত বছর সাধারণ ছুটি নিয়ে অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ছুটি ঘোষণার পর মানুষ ঈদের ছুটির মতো গ্রামে ফিরে গেছে। আবার গ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরেছে। এতে করে সংক্রমণ পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। সুতরাং লকডাউন কিংবা ছুটিতে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়, যা বাংলাদেশের মতো একটি দেশের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য আংশিক কিংবা জোনভিত্তিক লকডাউন করা যেতে পারে। অধিক সংক্রমিত এলাকা বিশেষ করে যেসব এলাকায় শনাক্তের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করে জোনভিত্তিক লকডাউন করা যেতে পারে। ২১ দিন করে ওইসব এলাকায় লকডাউন দিয়ে রাখা গেলে সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সমকাল : হাসপাতালে আইসিইউর পাশাপাশি সাধারণ শয্যায়ও সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে আপনার পরামর্শ জানতে চাই।
ডা. আব্দুল্লাহ : সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতালের শয্যার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য সরকারকে দ্রুত আরও কিছু হাসপাতাল প্রস্তুত করতে হবে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, নতুন করে সংক্রমিতদের অধিকাংশ রাজধানীর বাসিন্দা। সুতরাং ঢাকায় আরও কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল প্রয়োজন। গত বছর মানুষ আক্রান্ত হলেও অধিকাংশকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি। বাসাবাড়িতে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করে অধিকাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। কিন্তু নতুন করে সংক্রমণ বাড়ার পর আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। এটি আতঙ্কের। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আইসিইউর তুলনায় হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা অধিক কার্যকর। সুতরাং প্রতিটি হাসপাতালে দ্রুততম সময়ে এই হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা পৌঁছাতে সরকারের নজর দিতে হবে।
সমকাল : অনেকে মনে করেন, করোনার রূপ পরিবর্তন হয়েছে। নতুন ধরনের করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ডা. আব্দুল্লাহ : যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে নতুন ধরনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এই তিনটি ধরনই আগের ধরনের তুলনায় শক্তিশালী। অর্থাৎ এগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। বাংলাদেশেও নতুন ধরনের এই ভাইরাস সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এর বাইরে বাংলাদেশেও অন্য কোনো ধরন ও সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত জিনোম সিকোয়েন্সিং করা প্রয়োজন। কারণ জিনোম সিকোয়েন্সিং করা গেলে জানা যাবে কোন ধরনের ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।





মন্তব্য করুন