পারিবারিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আবেগ-ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পায় যেই ক্ষণে সংসার আলোকিত করে স্রষ্টার উপহারস্বরূপ সুস্থ স্বাভাবিক নীরোগ শিশু পৃথিবীতে আগমন ঘটে। এ আনন্দ স্বর্গীয়। যার সঙ্গে কোনো প্রপঞ্চই তুলনীয় হতে পারে না। যেসব দম্পতি নিঃসন্তান তারাই কেবল অনুভব করতে পারে ফুলবিহীন বাগানের মালীর দায়িত্বের কষ্টকর অভিব্যক্তি। কিন্তু বিপত্তিটা দেখা দেয় তখনই, যখন ভূমিষ্ঠ সন্তান স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যায় ভোগে। এ ক্ষেত্রে পিতামাতার কি কোনো হাত আছে? এ দায় কেন সমাজ পিতামাতাকে দিচ্ছে? অটিজমে আক্রান্ত হওয়া শিশুর নানাবিধ কার্যকারণ পর্যালোচনা এবং গবেষণা শেষে চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন পর্যন্ত এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়নি। যদিও মস্তিস্কের স্বাভাবিক গঠন বংশগতি, গর্ভকালে মায়ের ভাইরাস জ্বর, জন্মের সময় শিশুর অপিজেনের অভাব, পরিবেশ দূষণ এবং অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলাফলকে অনুঘটক হিসেবে দায়ীর কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। সমাজ বা পরিবেশ কোন বিবেচনায় এদের অভিশাপ বা বোঝা হিসেবে আখ্যা দেওয়ার রেওয়াজ চালু রেখেছে, তা বোধগম্য নয়। এসব গিফটেড চিলড্রেনকে কোনোভাবেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং অবহেলার পাত্র বানিয়ে সামাজিক জীব তকমায় নিজেদের বিবেচক হিসেবে দাবি করতে পারি না।

অটিজম নিয়ে আলাপ-আলোচনা খুব বেশিদিন আগে থেকে শুরু হয়নি। এসব শিশুকে নিয়ে পিতামাতা, পরিবার নানাবিধ আশঙ্কায় এবং অস্বস্তিতে ভোগে। কোথায় গেলে কার কাছে এবং কীভাবে চিকিৎসার আওতায় আনা যাবে তা অনেকেরই অজানা। এ ব্যাপারে সচেতনতাবোধ এবং অজ্ঞতার ফলশ্রুতিতে অনিশ্চয়তার মাঝে অভিভাবকদের দিন গুনতে হয়। অথচ অটিজম কোনো রোগ বা প্রতিবন্ধিত্ব নয়। এটা মূলত নিউরো ডেভেলপমেন্ট অসংগতি। বিশ্বের সব দেশেই এবং সমাজেই এরূপ শিশুর উপস্থিতি দেখা যায়। এক জরিপে উঠে এসেছে বিশ্বের প্রায় প্রতি ১১০ জনের একজনের মাঝে এরূপ অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। যেখানটায় বাংলাদেশের হার ০.৮ শতাংশ। অটিজম শিশুর পরিসংখ্যানিক প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে অনুমেয় হয়, সাধারণত ছেলে শিশুদের এ সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা মেয়ে শিশুর তুলনায় চারগুণ বেশি। গিফটেড চিলড্রেনরা স্বাভাবিক শিশু থেকে আলাদা বা দূরে থাকতে পছন্দ করে। এরা সামাজিকভাবে মেলামেশা করতে চায় না। ক্লাসে সর্বদাই আলাদা এবং নীরব থাকতে ভালোবাসে। এসব শিশু কথা বলতে পারে, আবার নাও বলতে পারে। তবে প্রায়ই গুছিয়ে কথা বলতে গিয়ে আটকে যায়। সাধারণত আঠারো মাস থেকে শিশুর বয়স তিন বছর হওয়া অবধি অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর প্রতি চারজনের একজনের মাঝে খিঁচুনির প্রবণতা দেখা যায়। যে কোনো ধরনের জিজ্ঞাসায় অসংলগ্ন উত্তর প্রদান এদের স্বাভাবিক ধরন হিসেবে বিবেচিত হয়। যত কম বয়সে এদের শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় এনে পরিচর্যা করা যাবে, তত সহজেই সমাজের স্বাভাবিক অবকাঠামোর সঙ্গে অভিযোজন ঘটিয়ে সক্ষমতার আলোকে বিকশিত করার পথ সুগম হবে। তবে প্রশ্ন হলো, কীভাবে শনাক্ত করব? কারা করবে? অভিভাবক, পরিবার, সমাজ, বইপত্র ঘেঁটে, ইন্টারনেট দেখে অনুমিত ধারণার আলোকে লেভেলিং না করে চিকিৎসকের প্রত্যয়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত স্থির করতে হবে। অন্যথায় পাছে গলদের সমূহ আশঙ্গা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ অটিস্টিক শিশু এবং অটিজমবিষয়ক সচেতনতা এবং প্রতিকারমূলক কার্যক্রম গ্রহণে প্রধানমন্ত্রীর তনয়া অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদের নাম সর্বাগ্রে স্মরণের দাবি রাখে। যেখানটায় এক জরিপে দেখা যায়, এ দেশে ১৭ লাখ শিশু অটিজমে আক্রান্ত। শিশুদের মূলধারার বাইরে রেখে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির আশঙ্কায় এবং সমাজদরদি মনোভাব পোষণের মানসিকতায় তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে আমাদের সম্মানিত করেছেন। বিশ্বব্যাপী এ বিষয়ে জবাবদিহিতা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ইতিবাচক মনোভাব মূল্যবোধের চর্চা মানবিক আচরণ এবং গণসচেতনতা আনয়নের প্রয়াসে ২০০৮ সালের ২ এপ্রিল থেকে অটিজম সচেতনতা দিবস পালনের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনের মানসে কাজ চলছে। যার প্রভাবে এবং সায়মা ওয়াজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১১ সালের ২৫ জুলাই Autism Spectrum Disorders and Development Disabilities in Bangladesh and South Asian বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। যেখানে বিশ্বের ১১টি দেশের অংশগ্রহণে ঐতিহাসিক ঢাকা ঘোষণা গৃহীত হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার ১৪টি মন্ত্রণালয় নিয়ে অটিজমবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে এ দেশে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির সূচনা পর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি সরকারের আটটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির কার্যক্রমও জানান দিচ্ছে এ বিষয়ে সরকারের মনোভাব এবং সদিচ্ছা, যা কিনা অটিজমে আক্রান্ত অভিভাবক সমাজে বাতিঘর হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এসব শিশুর কল্যাণ ও জীবনমানের স্বাভাবিকতা আনয়নের প্রয়াসে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ প্রণয়নের সরকার ব্রতী হয়। ফলে ২০১৪ সালে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট বোর্ড গঠন করা হয় যা এসব গিফটেড বেবির সুরক্ষা এবং এদের সম্পদে রূপান্তরে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে। ২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে পালক সংযোজন হয়। বর্তমানে ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ দেশের ১৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে অটিজমবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস চালানো হচ্ছে।

এ দেশের সামাজিক নিরাপত্তা অগ্রগতি এবং মানবকল্যাণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি মানবহিতৈষী ব্যক্তিদের প্রচেষ্টাও আমরা দেখতে পাই। যেখানটায় এ দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে সরকারি পর্যায়ে চালু করার হিম্মত দেখাতে পারেনি, সেখানটায় কিনা ডাক্তার হুমায়রা সাঈদের হাত ধরে বেসরকারি পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনার গোড়া পত্তন ঘটে। অটিজমবিষয়ক কার্যক্রম ও প্রথমে ব্যক্তি উদ্যোগে বিকশিত হয় এবং পরবর্তীতে সরকার এ খাতে মনোযোগ দেয়। এ দেশে সূচনা ফাউন্ডেশন অটিজম সচেতনতা এবং এসব শিশুর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি প্রয়াস স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বিউটিফুল মাইন্ডসহ নানা সংস্থা এ কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করছে।

এত সবের পরও কি এসব শিশুর ব্যাপারে পরিবার ও সমাজের মনোভাব ইতিবাচক? এখানটায় প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিভাবকরা স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে এদের মিশতে দেন না এবং তিরস্কারের হাতিয়ারে পরিণত করেন। এ কারণেই অভিভাবকরা হীনমন্যতা ও হতাশায় জর্জরিত হয়ে সমাজ ও পরিবেশ থেকে এদের বিচ্ছিন্ন রেখে এক ধরনের প্রশান্তি খোঁজে। সামাজিক কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্কার এবং অজ্ঞতার প্রভাবে এসব শিশুসম্পদের পরিবর্তে দায়ে রূপান্তরিত হতে দেখা যায়। তা কি কাম্য? আধুনিকতার উৎকর্ষতার যুগে এমন মনোভাব আমাদের দৈন্যতার ইঙ্গিত বহন করে।

এরাও মানুষ, এদেরও আছে বাঁচার অধিকার। সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্ক মায়া-মমতা এবং ভালোবাসা দিয়ে যদি এসব গিফটেড শিশুর পরিচর্যা করা যায়, তবেই এরা সম্পদে পরিণত হয়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদের বার্তা নিয়ে আসতে পারে। এদের প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়ে যদি সমানুভূতি অর্থাৎ, তাদের সঙ্গে মিশে আমরা মনোভাব তৈরি করতে পারি, তাহলে অভিভাবকরা স্বস্তি পাবেন এবং এদের স্বাচ্ছন্দ্যে সমাজের মূল স্রোতে মিশতে প্রাণিত করবে। যেখানটায় ব্যক্তি পর্যায় থেকে সামষ্টিক- সর্বক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আসুন এসব গিফটেড শিশুর প্রতি সচেতন সদয় এবং যত্নবান হই। আশা এবং বিশ্বাস, অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ব্যর্থ হবে না। সেদিন দূরে নয়, আমরা হয়তো বৈষম্যহীন এবং মানবিক সমাজ সহসাই দেখব, যেখানে সৃষ্টিকর্তা প্রেরিত এসব গিফটেড শিশুর প্রতি অবজ্ঞা ও অসচেতনতা এবং বৈষম্যমূলক আচরণের যবনিকাপাত ঘটবে। সমাজ শান্তি ও সৌরভের আভা এবং পুলক অনুভব করবে।

মন্তব্য করুন