মহান মুক্তিযুদ্ধে হাওরবাসীর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। নয় মাসের যুদ্ধে হাওরের পানি বহুবার লাল হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘাটলে হাওরের অকুতোভয় বীর সেনাদের অনেক বীরত্ব গাঁথার খোঁজ পাওয়া যায়। এর স্বীকৃতি স্বরূপ অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ খেতাবও পেয়েছেন; যাদের মাঝে হাওরের জেলে পরিবারেরও কয়েকজন আছেন। একাত্তরের ২৮ মার্চে সুনামগঞ্জ শহরে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আনসার সদস্য আবুল হোসেন। তিনি জেলে পরিবারের সদস্য ছিলেন। তাঁর নামে সুনামগঞ্জে রয়েছে 'শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তন'। কিন্তু প্রশ্ন জাগে স্বাধীনতার স্বাদ কতটুকু পাচ্ছে হাওরের জেলেরা?

হাওরের মানুষের প্রধান দু'টি পেশার একটি হলো মাছ ধরা। মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করেন হাওরের প্রায় এক চতুর্থাংশ মানুষ। এক সময় এই হার আরও বেশি ছিল। হাওরে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়াসহ নানা কারণে অনেকেই ছেড়েছেন এই পেশা। জলমহাল নীতিমালা ২০০৯ অনুযায়ী কেউ মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে জিবীকা নির্বাহ করলেই তিনি জেলে নন। শুধু প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে মাছ ধরে যারা জীবীকা নির্বাহ করেন তারাই জেলে। গত ৫০ বছরে হাওরের জেলেদের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেক জেলে পরিবার এখন আর শুধু মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করতে পারছেন না। তাই তারা বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে হাওরের জেলেদের জীবনেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। যেসব জেলে পরিবার কোনোদিনও চিন্ত্মা করেনি ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলবে, তাদের ঘরে বিদ্যুত এসেছে। যারা কোনোদিন চিন্তা করেনি বাড়ির সামনে পাকা সড়ক হবে বা চার চাকার গাড়ি দেখবেন, তাদের অনেকেই তাও দেখছেন। এটি নিঃসন্দেহে তাদের জন্য খুশির বিষয়। কিন্তু একই সাথে তারা হারিয়েছেনও অনেক কিছু।

একদিকে জেলেদের অধিকার হনন হচ্ছে, অন্যদিকে কমছে তাদের আয়-রোজগার। জলমহাল ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে জলমাহল নীতিমালা ২০০৯। নীতিমালায় জেলেদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরকার বেশ কিছু ধারা রেখেছে। কিন্তু বাস্তবে এসবের প্রয়োগ হচ্ছে না। এ যেন 'কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই'। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত মৎস্যজীবী নয় অমৎস্যজীবীরাই লিজ নিচ্ছেন বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সমিতি লিজ পেলেও তাদের নাম করে স্থানীয় প্রভাবশালীরাই ভোগ করছেন ঐ জলাভূমি। আবার কখনও বাহারি মৎস্যজীবী সমিতি নামে যে সংগঠন দেখানো হচ্ছে সেখানে কোনো মৎস্যজীবী নেই।

জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় পরিবর্তন চান জেলেরা। নীতিমালা অনুযায়ী ২০ একর এর ছোট বিলগুলো লিজ দেন উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ২০ একর এর বেশি আয়তনের জলমহাল ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি তিন বছরের জন্য বন্দোবস্টত্ম প্রদান করে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মৎস্যজীবী সংগঠনকে চিহ্নিত করেন। রেজিস্ট্রশন করে জেলা সমবায় অফিস। সেক্ষেত্রে যদি যাচাই করে দেখা যায় সমিতির দেওয়া তালিকায় সকলে প্রকৃত মৎস্যজীবী, তবে উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির বিবেচনার জন্য প্রত্যয়নপত্র দেবেন। উপজেলা ও জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ১৫ জন করে সদস্য থাকেন। ১৫ জনের এই কমিটি দু'টিতে মৎস্যজীবী সদস্য আছেন মাত্র ২ জন করে। তাদের ছাড়াই কোরাম হয়। তাই সভাগুলোতে তাদের সচরাচর উপস্থিত হতে দেখা যায় না। কমিটিতে মৎস্যজীবী সদস্য বাড়ানোর দাবি করছেন জেলেরা। কমিটিতে সংসদ সদস্যকে উপদেষ্টা রাখা হয়েছে। এই উপদেষ্টার উপদেশেই অনেক কলকাঠি নড়ে। তাই কমিটির অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় অগণতান্ত্রিকভাবে। জেলেরা সংসদ সদস্যকে উপদেষ্টা না রাখারও দাবি জানাচ্ছেন। প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জলমহাল ইজারা দিলে মাছের যেমন উৎপাদন বাড়ত তেমনি জেলেদের অধিকারও সুরক্ষা হত। কিন্তু জেলেদের সক্ষমতা না বাড়লে তা সম্ভব নয়। এজন্য জেলেদের বিনা সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। একই সাথে কমাতে হবে লিজ মানিও।

হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে মাছের প্রজাতি ধ্বংসকারী কোনা জাল ও কারেন্ট জালের ব্যবহার। একই সাথে হাওরে মাছের পোনাও অবমুক্ত করতে হবে। হাওরে জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ এই তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখলে মাছের উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। পদ্মায় এখন যেভাবে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পরছে তেমনি হাওরেও ধরা পরবে রুই, কাতলার মত সুস্বাদু মাছ। প্রাকৃতিক উৎস হতে খাবার সংগ্রহ করে বলে হাওরের মাছের স্বাদ একটু বেশিই হয়। তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখার কথা বললে জেলেরা বলেন- 'মাছ না ধরলে খাব কিভাবে?' সামান্য কয়টি মাছ বিক্রি করেইতো তারা দৈনন্দিন খরচ মেটান। এজন্য তারা যে ক'দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখবেন সে ক'দিন সরকারের কাছে প্রণোদনা দাবি করেন। জেলেদের প্রণোদনা দিয়ে জাটকা নিধন বন্ধে সরকার ইতোমধ্যে সফলতা দেখিয়েছে। সেক্ষেত্রে সরকার ২ লাখ ২৪ হাজার জেলেকে পরিচয়পত্র দিয়ে তাদের বছরে তিন মাস সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এনেছে। ইলিশ উৎপাদনে আমাদের এই সফলতায় বিস্মিত হয়েছেন অন্যান্য দেশের মৎস্য গবেষকরা। হাওরের জেলেদের এমন প্রণোদনা দিলে এবং কঠোরভাবে তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখলে হাওরেও মৎস্য বিপস্নব ঘটবে। মাছের ফলন বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। এক লাখ জেলে পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা করে দিলে তিন মাসে খরচ হবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা; কিন্তু এর ফলে বছরে কয়েক'শ কোটি টাকার সমমূল্যের মাছের উৎপাদন বাড়বে। হাওরের সুস্বাদু মাছ বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও উপার্জন করা যাবে। জেলেদের আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। তিন-চার মাস মাছ না ধরার পরে যে মাছটি বড় হবে সে মাছ কি জেলেরা ধরতে পারবেন? যদি তারা ঐ মাছ না-ই ধরতে পারেন তবে মাছ বড় হলে তাদের লাভ কি? তাদের মনে এই প্রশ্ন জাগার সঙ্গত কারণও রয়েছে। ইতিপূর্বে মাছ ধরতে গিয়ে ইজারাদারদের গুলিতে অনেক জেলেকে জীবন দিতে হয়েছে।এখনো জেলেদের রক্তে লাল হচ্ছে হাওরের পানি। জলমহাল নিয়ে সংঘর্ষ হলে জীবন বাজি রেখে জেলেদেরই জলমহাল রক্ষায় প্রাণপণ সংগ্রাম করতে হয়। জেলেদেরই জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে হয়।

মন্তব্য করুন