১.

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর। মানে সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। নিন্দুকেরা বলেন, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আমাদের জাতীয় নেতারা মুজিব নগরে একবারও যাওয়ার সময় পাননি। কুড়িগ্রামের রৌমারীও তেমনি এক অভিশপ্ত ভূখণ্ডের নাম। আমাদের অকৃতজ্ঞার নজির।

ফেসবুকে মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় সংগীত গাওয়ার একটি ভিডিও ভেসে বেড়াচ্ছে। নৌকায় বসে বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার শটও সেটাতে আছে। মুক্তিযোদ্ধারা টহল দিচ্ছেন হাটে, হাটে ধান-পাট-পান বিক্রি হচ্ছে। যে মাঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাচ্ছেন, ট্রেনিং দিচ্ছেন; সেই মাঠ, সেই হাট, সেই সিজি জামান হাই স্কুল, সেই চাঁদমারী এখনও হুবহু আছে। শুধু বীর মুক্তিযোদ্ধারা নেই। নেই ভাস্কর্য, নেই স্মৃতি সংরক্ষণ। কথিত উন্নয়ন নেই বলে রোমারী রৌমারীতেই আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরমাণু বোমা পড়ে বিধ্বস্ত হিরোশিমা-নাগাসাকি অবিকল রেখে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের তরফে। সে এক সচেতন চেষ্টা। আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দলিল বিজয় চিহ্ন যে রৌমারী, তা বেহাত হচ্ছে উল্টো রাষ্ট্রের তরফে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের দরকার ছিল রৌমারীর। দুনিয়াকে দেখানোর দরকার ছিল মুক্তাঞ্চলের। নিজস্ব প্রশাসনিক এলাকার। দুনিয়া দেখো, আমরা ৬৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিজ ভূমিতে ট্রেনিং নিচ্ছি। বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রশাসন আছে, আছে ব্যাংক-হাসপাতাল- পোস্ট অফিস-থানা। তাজউদ্দীন থেকে কর্নেল তাহের, ওসমানী থেকে কাদের সিদ্দিকী সবাই এখানে এসে অফিস করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তব রাজধানী রৌমারী। মুক্তিযুদ্ধ শেষ, আর কেউ ফিরেও তাকালেন না! স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের একটি অংশ কি রৌমারী দাবি করে না?

২.

রৌমারীর জনগণ অতিথিপরায়ণ হিসেবে বিখ্যাত। তারা পুরো ৯ মাস এতজনকে খাওয়ালেন, পরালেন, আশ্রয় দিলেন আর যুদ্ধ শেষে তাদের ভুলে গেলাম। স্রেফ ভুলে গেলাম। বড়লোক আত্মীয়রা যেভাবে গরিব আত্মীয়কে অকৃতজ্ঞের মতো ভুলে যায়। সেক্টর কমান্ডারদের নেতৃত্বে একবার অন্তত মুক্তিযোদ্ধাদের মিলন করা যেত। এই বছর অন্তত সেটি করা যায়। রৌমারীবাসী দীর্ঘদিন ধরে মুক্তাঞ্চল হিসেবে রৌমারীর নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত দেখতে চায়। এই স্বীকৃতিটুকু কি খুব বড় দাবি? অন্তত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সেটাও কি বেশি হবে? মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর কোনো জায়গাটি রৌমারীর চাইতে বেশি উপযুক্ত? রাজধানীর সেগুনবাগিচার চেয়ে অন্তত বেশি উপযুক্ত নয়?

বারবার খানা জরিপে কুড়িগ্রাম দারিদ্র্যের শীর্ষে থাকে। ব্রিটিশ আমলে দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত আসা রেললাইন রৌমারী পর্যন্ত আর এগুলোই না। গ্যাসলাইন জামালপুর পর্যন্ত এসেই থেমে গেল। অথচ রৌমারীর তাঁতশিল্প শেষ হয়ে গেল সুতার অভাবে। যেনতেনভাবে কাপড় বুনলেও বাজার পেলেন না তারা। শুধু যোগাযোগের অভাবে স্থানীয় এ্যাণ্ডি (রেশম) শিল্প মারা পড়ল। বাঁশ-বেতও গেল। রৌমারীবাসী কারিগর থেকে শ্রমিকে পরিণত হলেন। গৃহভিত্তিক শিল্প শেষ। জেলেরা যে ব্রহ্মপুত্রের মাছে পুরো অঞ্চলের আমিষের চাহিদা মেটাতেন, বালুদস্যুরা সেই নদীকেও শেষ করেছেন। জিঞ্জিরাম, হলহলিয়া, ব্রহ্মপুত্র যেভাবে এখানে প্রাকৃতিক সেচব্যবস্থা নির্মাণ করেছিল, তাও শেষ করেছে উন্নয়নবাদীরা। আধুনিক সেচব্যবস্থার জনক স্যার উইলিয়াম উইলকপ বাংলার নদীগুলো দেখে বলেছিলেন, চলমান নদী আর গতিশীল স্রোতধারার সেচ মাছের ডিমকে মাঠময় ছড়িয়ে দেয়। সেখানে তারা আশ্রয় পায় এবং ধানক্ষেত বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে জীবন্ত থাকে।

কিন্তু ভূমিদস্যু ও বালুদস্যু প্রভাবশালী উন্নয়নবাদীরা রৌমারীর নদনদীকে শেষ করে দিয়েছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধারা যেখানে চাঁদমারী করতেন, সেই সিজি জামান হাই স্কুলের সামনে দিয়েই যে নদীটি প্রবাহিত হতো, সেটির মাঝদিয়ে এখন উন্নয়নের সড়ক। ইতিহাস থেকে নদীটি এখন নাই হয়ে গেছে। আমাদের যা কিছু প্রয়োজন তা প্রাচীন যুগের মানুষেরা করে রেখে গেছেন, এখন কেবল তাদের মতো দায়িত্বশীল ভূমিকা আমাদেরই গ্রহণ করতে হবে এবং আবার পানি ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করে তুলতে হবে। আমরা দারুণ এক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়েছি।

রৌমারীর জনগণ ঐতিহ্যিকভাবে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার যে প্রবণতা অর্জন করেছেন, তা আসমান থেকে পড়েনি। এটা এসেছে উইলকপের ভাষায় নদনদীগুলোর ঘোলা পানি বণ্টনের ব্যবস্থা থেকে। নদনদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে। সেই নদনদী, সেই রৌমারীকে রেলব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে কোনো কৃতজ্ঞতার নজির জাতিগতভাবে স্থাপন করছি।

সারা বাংলাদেশে প্রতিটি জেলায় ইপিজেড হচ্ছে। কুড়িগ্রামে সেই তৎপরতা নেই। বলা হয়, গ্যাস সংযোগ না থাকার কথা। বলা হয়, বগুড়া থেকে রংপুর, তারপর রংপুর থেকে কুড়িগ্রাম। দিল্লিকা বহুদূর হ্যায়। কিন্তু জামালপুরের পাশেই রৌমারী। রৌমারীতে গ্যাস সংযোগ দিয়ে শিল্পাঞ্চল করা গেলে সেখানে কুড়িগ্রামবাসী তো কাজ করতে পারবে। রৌমারীতে শিল্পাঞ্চল করা হয় না কেন? রৌমারীতে তো স্থলবন্দরও আছে, যা দিয়ে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিও করা যাবে। তাহলে?

মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনারা যারা অন্ন নিলেন, আশ্রয় নিলেন তারাই তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন। যে জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা পারাপার করালেন, তারা এখন বালুদস্যুদের দাপটে মাছের দেখা পায় না। মাছ না পেয়ে ভারতে মাছ মারতে গিয়ে জেল খাটেন। সেই জেলেদের প্রতি, চিলমারী- রৌমারীবাসীর প্রতি আপনাদের কৃতজ্ঞতাবোধ নেই? তাদের ক্ষুধায়-চিকিৎসাহীনতায় রেখে কোন সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসব আপনারা করবেন?


মন্তব্য করুন