ফিনল্যান্ডে গত ৩১ মার্চ করোনায় নতুন করে আক্রান্ত হয় ৬০৭ জন এবং মৃত্যুবরণ করে ১৮ জন মানুষ। মাত্র সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন মানুষের দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকার সব প্রকার রেস্টুরেন্ট এবং পানশালা ছয় সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে, যা প্রয়োজনে আরও বাড়তে পারে। মাস্কের ব্যবহার সব প্রকার যানবাহনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ছয়জনের বেশি মানুষের একস্থানে মিলিত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং বাড়ির বাইরে যে কোনো স্থানে একে অপরের থেকে দুই মিটার দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করা সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এর ওপরে বিদেশ থেকে ফিরলে দুই সপ্তাহের আইসোলেশন তো আছেই।

ফিনল্যান্ডে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুই চলছে। তবে সেবা প্রদান করা হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইনে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মানুষের বাইরে বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে বললেই চলে। এতকিছুর পরও করোনা সংক্রমণকে বাগে আনতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে ফিনিশ সরকার। এমতাবস্থায়, সংক্রমণের সংখ্যাও যেমন বাড়ছে দিন দিন, তেমনি মৃত্যুর মিছিলেও যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। এতকিছুর পরও অনেকের মতো ফিনিশরাও আশাবদী, একদিন করোনা সংক্রমণ শেষ হয়ে যাবে, স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে সবার জীবনে। আর এ লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া প্রতিটা উদ্যোগে ফিনিশরা ব্যাপকভাবে সাড়া দিচ্ছে। আর এজন্যই ফিনল্যান্ডে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। অধিকন্তু, অনুপাতের দিক দিয়ে বিচার করলে করোনা সংক্রমণে মৃত্যুর হার পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় ফিনল্যান্ডে সর্বনিম্ন।

ফিনল্যান্ডের চেয়ে বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণের অবস্থা আপাত দৃষ্টিতে বেশ খারাপ মনে হচ্ছে। সংক্রমণ এবং মৃত্যু দুটোই একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বেড়ে চলেছে বাংলাদেশে। ফিনল্যান্ডের চেয়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ঢের বেশি; ফিনল্যান্ডে যেখানে মাত্র সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে, সেখানে বাংলাদেশে ১৮০ মিলিয়ন মানুষের বসবাস। এখনই দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দিলে, সরকারিভাবে নেওয়া বিধিনিষেধ না মানলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে বা চলে যাবে।

আমাদের সবসময় একটা কথা মনে রাখতে হবে, করোনা চিকিৎসায় এখনও কোনো ওষুধ আবিস্কার হয়নি। বিভিন্ন কোম্পানি যেমন অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন, মডার্না এবং বায়োএনটেক অ্যান্ড ফাইজার করোনাভাইরাসের যে টিকা তৈরি করেছে, এগুলো শুধু অস্থায়ী সুরক্ষা দেবে। কভিড-১৯ ভাইরাসকে মারতে পারবে না। আবার যারা টিকা গ্রহণ করবে তারা কিন্তু কভিড-১৯ ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই আপাতত সাবধানতা অবলম্বন করা ছাড়া করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া বেশ মুশকিল।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই পুস্তকে করোনাভাইরাসের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তব জগতে এর প্রাদুর্ভাব প্রথম শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান শহর থেকে এবং পরে তা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এ ভাইরাস কোথা থেকে কখন কীভাবে মানুষের দেহে প্রথম সংক্রমণ ঘটল সে-সংক্রান্ত বিভিন্ন কথন প্রচলিত আছে। তবে আসল সংক্রমণ উৎস এখনও রহস্যময়। প্রাদুর্ভাবের দিক দিয়ে করোনাভাইরাস বেশ নতুন (এক বছর পাঁচ মাসের মতো) তাই আমরা এই ভাইরাস সম্পর্কে এখনও অনেক কিছুই জানি না। আবার করোনা তার ধরনেও পরিবর্তন আনছে, ভবিষ্যতে আরও পরিবর্তন আনবে কিনা এখনও তা নিশ্চিত না। সবকিছু মিলিয়ে করোনাভাইরাস মানুষের জীবনকে বেশ জটিল, অনিশ্চিত এবং স্থবির করে তুলেছে।

তবে এটা প্রমাণিত যে, করোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। আর এজন্যই এর সংক্রমণ শৃঙ্খলকে ভাঙাই করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। আমাদের অনেকেই টিকা নেওয়া শুরু করেছে, তবে এতে গা ছেড়ে দেওয়া চলবে না। নিয়মিত মাস্কের ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঘন ঘন হাত পরিস্কার করাসহ সরকারিভাবে নেওয়া সব নিয়মকানুন মানতে হবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই যে বিষয়টা বহুল আলোচিত হয়ে আসছে তা হলো অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তারা সহজেই করোনাকে জয় করতে পারছে, সমস্যা হচ্ছে তাদের নিয়ে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে যে কোনো সময়, যে কোনো বয়সের, যে কেউ, যে কোনো স্থান থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা শুরু করতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং লাইফ স্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে ফিটনেস স্তরের উন্নয়ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে, করোনাভাইরাসের ক্ষতি থেকে বাঁচতে, আমরা সবসময় ফিট থাকার চেষ্টা করি। মনে রাখতে হবে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে, কমতে থাকে ফিটনেস স্তরও। তাই ফিটনেসের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ফিনল্যান্ড ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়া শুরু করেছে। চলতি বছরের ১ এপ্রিল তারিখের খবর অনুযায়ী এক মিলিয়নের বেশি মানুষ এরই মধ্যে টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছে। এখানে টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুটো জিনিস গুরুত্ব পাচ্ছে। তা হলো বয়স এবং স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি। যত বেশি বয়স তত আগে টিকা পাচ্ছে। সাধারণ ক্ষেত্রে এখনও ৬৫ বছর বয়সের নিচে কেউ টিকা পায়নি। ফিনিশ সরকার আশা পোষণ করছে, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে তারা সব ফিনিশ নাগরিককে করোনার টিকা দিতে পারবে। বর্তমানে ফিনল্যান্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ব্যবহার করছে। তবে আগামীতে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো জনসন অ্যান্ড জনসন, মডার্না বা বায়োএনটেক অ্যান্ড ফাইজারের টিকা ব্যবহারে এগিয়ে যাবে। ফিনল্যান্ড তার নিজস্ব করোনাভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে যা ২০২২ সালের শুরুতে মানবদেহে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

করোনাভাইরাসের স্থায়িত্ব এবং আমাদের বিশাল জনসংখ্যার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাশাপাশি অন্যান্য টিকা প্রস্তুতকারী কোম্পানির কাছ থেকেও দ্রুত টিকা কেনার চেষ্টা করা। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প অনেক দেশের তুলনায় মানসম্পন্ন ওষুধ প্রস্তুতের ক্ষেত্রে বেশ দক্ষ। আর তাই স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো টিকা প্রস্তুতকারী অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন, মডার্না বা বায়োএনটেক অ্যান্ড ফাইজারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বা উৎপাদন চুক্তিতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের টিকা প্রস্তুতের চেষ্টা করতে পারে। এতে করে স্থানীয় টিকা সরবরাহের গতি বাড়বে। দেশের মানুষ দ্রুত করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পাবে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না করোনাভাইরাস সংক্রমণ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে, তাই নিজস্ব টিকা আগামীতে খুব জরুরি হয়ে পড়তে পারে। এটা মাথায় রেখে বাংলাদেশের স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে দেশীয় করোনাভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা শুরু করতে পারে, যেটা ফিনল্যান্ড ইতোমধ্যে শুরু করেছে। আর যতদিন পর্যন্ত টিকার সহজলভ্যতা না হচ্ছে, ততদিন কঠোরভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

 

মন্তব্য করুন