মাইকেল চাকমা গুম হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আজ। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তার জনগণের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবিতে সংগ্রামরত রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠক ও মুখপাত্র হিসেবে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সংগঠনী কাউন্সিলের (জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল) কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং টিমের সদস্য এবং জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য। তার ব্যক্তিগত কোনো শত্রু ছিল বলে জানা যায়নি। 

তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তার জনগণের ওপর শাসক বাঙালি জাতির শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। বাংলাদেশ যে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির নয়; একই সঙ্গে চাকমা-মারমা-তঞ্চঙ্গ্যা-সাঁওাল-ওঁরাও-মুন্ডা-মান্দি-মণিপুরি-হাজংসহ ৪৫টি জাতিসত্তার জন্মভূমি- এই বিশ্বাসবোধ থেকে তিনি জাতিগত সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকারের জন্য সংগ্রামে দৃঢ় ছিলেন। এমন একজন রাজনীতিক, সংগঠককে কে বা কারা তুলে নিয়ে গেল? আর তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের কর্মী ও সংগঠনের জন্য অনেক জরুরি।

মাইকেল চাকমার পরিবারের সদস্য এবং তার সংগঠনের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়েছিল, পুলিশ প্রথমদিকে উদ্ধারে তৎপরতা দেখালেও পরবর্তী সময়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মাইকেল চাকমার ফোনের লোকেশন বিশ্নেষণ করে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়নি। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ও অভিযানের মাধ্যমে মাইকেল চাকমাকে উদ্ধার করা পুলিশের পক্ষে অসম্ভব হতো না। এসব থেকে পরিবারের বন্ধমূল ধারণা- মাইকেল চাকমা কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার হেফাজতে রয়েছেন। এ থেকে তাদের জোর দাবি- অবিলম্বে মাইকেল চাকমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। আর মাইকেল চাকমার যদি কোনো কিছু হয় তাহলে এর সব দায়দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে।

মাইকেল চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম ও জাতীয় রাজনৈতিক মহলে একজন পরিচিত মুখ। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তার জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের সমতলের শোষিত-নির্যাতিত-অপমানিত-বঞ্চিত জাতিসত্তার জনগণের অধিকারের জন্য লড়েছেন। দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংবিধান, সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে সক্রিয় রেখেছিলেন।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পার হয়ে এলেও এখনও বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের লোকদের মিথ্যা মামলার শিকার হতে হয়। হতে হয় গুম। জনগণের কাছে জবাবদিহিতে বাধ্য নয় এমন এক শাসক শ্রেণি গত ৫০ বছর ধরে এদেশের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবাধ শোষণ, লুণ্ঠন ও দুর্নীতি অব্যাহত রাখতে এরাই সারাদেশে জারি রেখেছে এক বেপরোয়া রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাস। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা নিবর্তনমূলক আইনে কণ্ঠ রোধ করে চলেছে মিডিয়া, সংবাদপত্র, বিরোধী মতকে।

মাইকেল চাকমার অপরাধ, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে জমির ওপর জাতিসত্তার জনগণের বংশপরম্পরাগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক লড়াই সংগঠিত করার কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। বাঙালি ভিন্ন বাংলাদেশের ধর্মীয়, জাতি ও ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তার জনগণের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা ও এ অঞ্চলে বেসামরিক কর্তৃত্বের গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। পাহাড় ও সমতলের জনগণের গণতান্ত্রিক বিকাশে এসব গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তার জনগণের উত্থান যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যটি আজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

মাইকেল চাকমাসহ গুম হওয়া নাগরিকদের সুস্থ অবস্থায় তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গণতান্ত্রিক দাবিতে বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষ যত দ্রুত সংগ্রামে ময়দানে ঐক্যবদ্ধ হবে ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান করে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করবেন, তবেই অতীতের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে।


মন্তব্য করুন