শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম অন্যতম। চরাঞ্চল বেষ্টিত চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুরসহ ৯টি উপজেলার সমন্বয়ে কুড়িগ্রাম জেলা। 

স্বাধীনতার আগে এ জেলার শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকলেও স্বাধীনতা-উত্তর গত ৫০ বছরে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটলেও তা পুরোপুরি এখনও অর্জিত হয়নি। শিক্ষা অর্জনে জেলায় ৪৩টি কলেজ, ২৫৭টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২২৪টি মাদ্রাসা, ১১১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইবতেদায়িসহ ৪৪৮টি মাদ্রাসা, একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও একটি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা গ্রহণ করছে। বর্তমানে এ জেলার শিক্ষার হার ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকের মতো ছেলেমেয়ে এখনও শিক্ষার আলো থেকে দূরেই আছে।

বিশেষ করে চরম দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা গ্রহণের বদলে কাজকর্মে জড়িত থাকে ছেলেমেয়েরা। আবার স্কুল, কলেজে ভর্তি হলেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও এ জেলায় বেশি। এমনকি আর্থিক অভাব-অনটনে এসএসসি পাস করেও অনেকে জেলার বাইরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতিও কম। এ জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। গতানুগতিক কৃষি চাষাবাদই একমাত্র অবলম্বন। কৃষিক্ষেত্রে গবেষণা কিংবা কৃষি ফার্মিংয়ের কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। তবে কুড়িগ্রাম শহরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হলে শিক্ষার প্রসারসহ উন্নত প্রযুক্তির চাষাবাদে অনেক অগ্রগতি হবে মর্মে জেলাবাসীর আশঙ্কা। কুড়িগ্রামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য জেলার বাইরে গিয়ে লেখাপড়া করতে হয়। এখন কুড়িগ্রামে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে স্বভাবতই এখানে শিক্ষা ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

গত ৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল মন্ত্রিসভা বৈঠকে 'কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০২১'-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হলে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হবে ৪৬টি, বর্তমানে ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চালু আছে সাতটি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে এখানে কৃষিবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কৃষি খাতে উদ্ভাবনী সুযোগ সৃষ্টি, সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান, টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি ও উচ্চফলনশীল কৃষিজ পণ্যের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। আবার অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এ বিশ্ববিদ্যালয়েও চ্যান্সেলর, ভাইস চ্যান্সেলর, বিশেষায়িত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক, পরামর্শক, গবেষণা সহকারী, স্কলার বা কোনো ব্যক্তিকে বিভিন্ন বাছাই বোর্ডের মাধ্যমে নিয়োগ দিতে পারবে। 

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০২১ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কুড়িগ্রাম একসময় মঙ্গাপীড়িত ছিল, সেখানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হলে গবেষণা হবে, ফার্মিং হবে। এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাদের আর্থসামাজিক, শিক্ষা, গবেষণার উন্নতি ঘটবে। তিনি আরও বলেন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও ফার্মিংয়ের মাধ্যমে যে টেকনোলজি ডেভেলপ হবে তা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলে বিস্তৃত হবে এবং গোটা উত্তরাঞ্চলের লোকজন ফার্মিংয়ের মাধ্যমে ভুট্টা, শাকসবজি, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যান্য কৃষি চাষাবাদ ও মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে আর্থিক অবস্থা আরও উন্নত করতে পারবে।

আগেই বলেছি, আমাদের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ফলে কৃষির সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে কৃষি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। যেখানে হাতেকলমে কাজ জানা না থাকলে শিক্ষাজীবন শেষেও বেকার থাকতে হয়। কৃষিশিক্ষায় শিক্ষিত হলে মুরগির খামার, ডেইরি ফার্ম, গরু মোটাতাজাকরণ, মাসরুম চাষ, মৌ চাষ, জৈব সার উৎপাদন, জীবাণু সার উৎপাদন, বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ, ফুল, মসলা, নার্সারিসহ বিভিন্ন বীজ উৎপাদন, রেশম চাষ, মাছ চাষ, ইনকিউবেটরে মুরগির বাচ্চা উৎপাদন, হাঁস, কবুতর পালনসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। যেখানে সরকার ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষিশিক্ষাকে চতুর্থ বিষয়ের (ঐচ্ছিক) কাঠামোতে নিয়ে এসেছে। এমনকি ব্যবহারিক নম্বর ৪০ থেকে কমিয়ে ২৫ করা হয়েছে। এতে ছাত্রছাত্রীরা কৃষি বিষয়ে পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অথচ মাধ্যমিক স্তর থেকে কৃষিশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সেখানে কৃষি বিষয়কে কোন যুক্তিতে এবং কেন ঐচ্ছিক বা চতুর্থ বিষয়ে নিয়ে আসা হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তবে আমরা মনে করি, কৃষির সমৃদ্ধি করতে হলে কৃষিশিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক বিষয়ে মাধ্যমিক স্তর থেকেই অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ কৃষি বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। ফলে কৃষিকে বাঁচাতে হলে কৃষিশিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, কৃষির উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন। টেকসই কৃষির উন্নয়ন ছাড়া সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণও সম্ভব নয়। এ দেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টায় কৃষিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে সত্য। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এদেশের কৃষক শত প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে চাষাবাদ করে যাচ্ছে। যদিও এখনও কৃষিতে শিক্ষিত কর্মোদ্যোগী মানুষের সম্পৃক্ততা অনেক কম। তবে যেভাবে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ হচ্ছে, তাতে আমরা আশাবাদী, নিকট ভবিষ্যতে শিক্ষিত কর্মোদ্যোগীদের সম্পৃক্ততা কৃষি কাজে বেড়ে যাবে। এ জন্য কৃষিশিক্ষা ও কৃষিতে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। যে কারণে এই মুহূর্তে কুড়িগ্রামে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োচিত। এতে করে এঞ্চলে কৃষির অনেক উন্নতি ঘটবে। বিশেষ করে আলু, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষাবাদে এ অঞ্চলকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পিছিয়ে থাকা মাছ উৎপাদনে নতুন করে সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

বিষয় : কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কুড়িগ্রাম

মন্তব্য করুন