হিংসা আর প্রতিহিংসার মোড়কে লুকিয়ে থাকা প্রেতাত্মা হেফাজতে ইসলাম। নতুন আঙ্গিকে পুরোনো বিষের রণকৌশল। পাকিস্তানি চিন্তা কাঠামোর উকিল। '৭১-এর পরাজিত শক্তির একনিষ্ঠ গোষ্ঠীজ্ঞাতি। ভুললে চলবে না, তারা অশিষ্ট, বিকৃত ও হিংস্র। ভেতরে পরাজয়ের ক্ষোভ ধ্বংসাত্মক। তাদের উত্তরসূরিরা বাংলা ভাষা চায়নি। চায়নি স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু আমার দেখা নয়াচীনে লিখেছেন, 'ইসলামের মূল কথা শান্তি, ইমান, বিশ্বভ্রাতৃত্ব। সেখানে ধর্মযাজকদের দ্বারা শান্তির পরিবর্তে দেখা দিলো অশান্তি, ইমানের পরিবর্তে বেইমানি, বিশ্বভ্রাতৃত্বের জায়গায় দেখা দিলো ভাই ভাইকে শোষণ বা নির্যাতন করা।'

ধর্মান্ধদের ফতোয়ার ইতিহাস অনেক পুরোনো। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা নতুন খোলসে পুরোনো রূপ মাত্র। অনেকেই হয়তো বলার চেষ্টা করছে হঠাৎ করে এদের উগ্রতা কেন? এটা পুরোনো বাতি প্রস্তুতি নিয়েই জ্বলে ওঠা। ইতিহাস তাই বলে। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে হেফাজত আর জামায়াত বিশাল বিশাল ফতোয়া দেয়। অথচ ধর্ম কী বলে? আমার দেখা নয়াচীনে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- 'মুসলিম মেয়েরা পুরুষদের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যেত, অস্ত্র এগিয়ে দিতো। আহতদের সেবা-শুশ্রূষা করত। হজরত রসুলে করিমের (সা.) স্ত্রী হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) নিজে বক্তৃতা করতেন, 'দুনিয়ার ইসলামই নারীর অধিকার দিয়াছে। সত্য কথা বলতে গেলে, একটা জাতির অর্ধেক জনসাধারণ যদি ঘরের কোণে বসে শুধু বংশবৃদ্ধির কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ না করে, তা হলে সেই জাতি দুনিয়ায় কোনোদিন বড় হতে পারে না।'

পুরুষ শ্রেষ্ঠ আর স্ত্রী জাতি নিকৃষ্ট- এটাই ফতোয়াবাজদের নীতি। নারী নেতৃত্ব হারাম বলে ফতোয়া দেয়। অথচ বিভিন্ন নামে দল গঠন করে নারী নেতৃত্বের সঙ্গে জোট করে। ক্ষমতায় যাওয়ারও স্বপ্ন দেখে। এরাই আবার নারী নিয়ে রিসোর্টে যায়। নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ফতোয়া দিয়ে ২০১০ সালে হেফাজত আলোচনায় আসে। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বাঁচানোর জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তৈরি হওয়া গণজোয়ারকে এরা নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করেছিল। এরপর একের পরে এক অযৌক্তিক ফতোয়া দিতে থাকে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য নানারকম ভাস্কর্য অপসারণের দাবিতে সোচ্চার তারা। বাঙালি জাতি তো '৭১-এ আনুষ্ঠানিকভাবে সাল্ফপ্রদায়িক শক্তিকে বিদায় করে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ দীর্ঘ সময় আন্দোলন সংগ্রাম আর মুক্তির মাধ্যমে অসাল্ফপ্রদায়িকতার বীজ বপন করেছে। কারও ক্ষমতা নেই একে নস্যাৎ করার।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঐতিহাসিক মুহূর্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করেছে বিশ্ববাসী। বাঙালি জাতির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন বিশ্বনেতারা। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন। মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বন্ধু দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এসেছিলেন ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপ্রধানরা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কেন্দ্র করে ধর্মান্ধ ফতোয়াবাজ হেফাজত শুরু করল নতুন ফতোয়া। তাদের উদ্দেশ্য নরেন্দ্র মোদি নয়, বরং বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। মোদি বিরোধিতার নামে তারা সহিংসতা করবে, জ্বালাও-পোড়াও করবে, জাতীয় পতাকা পুড়বে, বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাংচুর করবে, শহীদ মিনার ভাঙবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করবে, মুক্তিযোদ্ধা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষকে হত্যা করবে- এটাই স্বাভাবিক। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকায় হেফাজতের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম মূলত একাত্তরের পরাজয়ের গল্গানি থেকে।

চুয়ান্নর নির্বাচনে ধর্ম ব্যবসায়ীদের পূর্বপুরুষ মুসলিম লীগ ফতোয়া দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখছেন, 'মুসলিম লীগ যখন দেখতে পারলেন তাদের অবস্থা ভালো না, তখন এক দাবার ঘুঁটি চাললেন। অনেক বড় বড় আলেম, পীর ও মাওলানা সাহেবকে হাজির করলেন। এক ধর্মসভা ডেকে ফতোয়া দিলেন আমার বিরুদ্ধে যে, আমাকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না, ধর্ম শেষ হয়ে যাবে। সাথে শর্ষিনার পীর সাহেব, বরগুনার পীর সাহেব, শিবপুরের পীর সাহেব, রহমতপুরের শাহ সাহেব সকলেই আমার বিরুদ্ধে নেমে পড়লেন এবং যত রকম ফতোয়া দেওয়া যায় তাহা দিতে কৃপণতা করলেন না। দুই চারজন ছাড়া প্রায় সকল মওলানা, মৌলভী সাহেবরা এবং তাদের তালবেলেমরা নেমে পড়ল। একদিকে টাকা, অন্যদিকে পীর সাহেবরা, পীর সাহেবদের সমর্থকরা টাকার লোভে রাতের আরাম ও দিনের বিশ্রাম ত্যাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আমাকে পরাজিত করার জন্য।'

তারা '৭০ এর নির্বাচনে ফতোয়া দিয়েছিল- আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে। এখনও তারা ধারাবাহিকভাবে ফতোয়া দিয়ে যাচ্ছে; আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে কাফের হয়ে যাবে, দেশ ভারত হয়ে যাবে; মসজিদ, মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাবে, সেখানে উলুধ্বনি বাজবে। এখন নতুন ফতোয়া- আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতাদের জানাজা পড়ানো হারাম। তারা নাস্তিক, কাফের, মুশরেক। মহান মুক্তিযুদ্ধে ফতোয়ার বাতাস ছিল- পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধ করা হারাম। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন আশ্রয় প্রশ্রয়ে পরিপুষ্ট হয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে, ধর্মের অপব্যাখ্যা করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে তারা। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড তাদের পুরোনো আচরণ। তারা জাতীয় সংগীত মানে না। বাংলাদেশের সংবিধান মানে না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে না। তাদের মূল উদ্দেশ্য পাকিস্তানি ধারার প্রদেশ।

তারা এখনও স্বপ্ন দেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হত্যা করে আবার পাকিস্তানি রাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া। সেজন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র করছে। তারা ইতিহাস বিকৃতি করে ফাঁসি হওয়া রাজাকারদের শহীদ বানিয়ে নতুন প্রজন্ম ও বিশ্ববাসীর কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের ভুলভাবে উত্থাপন করার চেষ্টা করছে। ভারত নিয়ে তাদের অ্যালার্জি নতুন নয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সহযোগিতায় তাদের পরাজিত করা হয়েছিল। এটাই মূল কারণ।

সব ধর্মের মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু যে নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করতে চেয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নের জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররমসহ ধর্মীয় যেসব প্রতিষ্ঠান হয়েছে তা সবই বঙ্গবন্ধু করেছেন। আর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একযোগে ৫৬০টি মডেল মসজিদসহ সারাদেশে যত মসজিদ, মাদ্রাসা তৈরি, সংস্কার ও পরিচালনার জন্য যত অর্থ দেওয়া হচ্ছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। শুধু তাই নয়, সব ধর্মের মানুষের উপাসনালয়ের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সময় এসেছে ধর্মের নিরাপত্তা বিধানে সরকারের কঠোর নজরদারি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার স্বার্থে, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার্থে হেফাজত, জামায়াত-শিবির সন্ত্রাসীদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিকভাবে বয়কট করার উপযুক্ত সময় এখনই।

মন্তব্য করুন