কভিড-১৯ মহামারির কথা বাদ দিলে, বাংলাদেশ আজ কয়েকটি মাহেন্দ্রক্ষণ অতিক্রম করছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ছাড়াও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সাফল্যের একশ বছর পার করছে। তার সঙ্গে দেশের অনন্য মাইলফলক 'উন্নয়নশীল দেশের' স্বীকৃতি অর্জন মাহেন্দ্রক্ষণগুলোকে আরও মহিমান্বিত করেছে। আজ আমরা বিশ্বসেরা অর্থনীতিবিদদের ও বিশ্বনেতাদের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত! বঙ্গবন্ধুর দীক্ষায় দীক্ষিত বাঙালিরা আজ নত শির সোজা করে দাঁড়িয়েছে, কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি। আমরা প্রমাণ করেছি, দেশটা তলাবিহীন ঝুড়ি ছিল না, বরং দানবরা সব খেয়ে ঝুড়িটি ফাঁকা করে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মানবতার সূচকগুলোর বেশ কয়েকটিতে আজ এগিয়ে আমরা।

দুই. দেশের গবেষণা নিয়ে বিশেষ করে প্রবাসী বন্ধুদের নেতিবাচক ধারণা দেখে হতাশ হই। প্রশ্ন হলো, দেশে গবেষণা ছিলই-বা কবে? ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত একজন প্রবীণ অধ্যাপকের হাত ধরে ১৯৯৭ সালে আমার গবেষণায় হাতেখড়ি। সেসময় আমার তত্ত্বাবধায়ক স্যারের মধ্যে শিক্ষার্থী-গবেষকদের গবেষণার উপকরণ জোগান দিতে না পারার চরম হতাশা দেখেছি। তার মুখে শুনেছি যে, আগের দিনে বিদেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও আধুনিক গবেষণা হতো। দুর্ভাগ্য যে, আমার ছাত্রত্বের সে সময়গুলো গবেষণার উপকরণ কিছুই ছিল না বললেই চলে। তার মানে দানবের দল আমাদের সম্পদের ঝুড়িটি ফাঁকা করে গিয়েছিল।

গবেষণা করতে রসদ লাগে! জাপানের টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে একটানা সাড়ে সাত বছর গবেষণা করার সৌভাগ্য হয়েছিল। পিএইচডি ডিগ্রির পর চার বছরের অধিক সময় উচ্চতর গবেষণা করেছি। গবেষণার জন্য কি দরকার? বিদেশে গবেষণা ভাতাই-বা কেমন? অর্থের জোগান কাকে বলে? আর এসব অর্থের জোগান দাতাই-বা কারা? সব ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছিল। প্রবাসী বন্ধুরা যারা গবেষণা পেশায় রয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই বিষয়গুলো আঁচ করতে পারছেন। মূলত ইন্ডাস্ট্রি ও দাতা সংস্থাগুলো গবেষণার সিংহভাগ অর্থের জোগান দিয়ে থাকে। বিদেশে গেলে আমরা অনেকেই অতীতকে ভুলে যেতে চাই। হয়তো-বা তার যথাযথ কারণও রয়েছে। যাহোক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যসব সুবিধার কথা না হয় বাদই দিলাম, আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থী-গবেষককে কত গবেষণা ভাতা দেওয়া হয় বা আদৌ দেওয়া হয় কিনা তা একবার ভেবে দেখুন। তাহলে বিশেষ করে প্রবাসী বন্ধুদের নিজেদের ভরা পেট নিয়ে ক্ষুধার্ত আমাদের দেখলে আর কুঁজো মনে হবে না। ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে আর যা-ই হোক, ভালো মানের গবেষণা করা যায় না বলেই স্বীকৃত।

তিন. বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় সিক্ত আমাদের কৃষি খাত ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কৃষি খাতকে বাস্তবতার নিরিখেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ খাতে গবেষণায় অর্থের জোগান পর্যাপ্ত না হলেও ধারাবাহিকভাবে তা অব্যাহত রয়েছে। তার ফলও আমরা দেখতে পাচ্ছি। অন্যধারার গবেষণার সাফল্য আমাদের এখনও নজর কাড়ে না। কারণ গবেষণার তেমন কোনো সাফল্য নেই বা থাকলেও তার খবর রাখে কে? গবেষণার অগ্রগতি বা মান যাচাইয়ের সূচক প্রধানত দুটি- ১. সায়েন্টিফিক কনফারেন্সে গবেষণাকর্মের উপস্থাপন ও ২. স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশনা। সায়েন্টিফিক কনফারেন্সে গবেষণার ধারাবাহিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। তাই গবেষকরা নিজের গবেষণার মান যাচাইয়ের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে সায়েন্টিফিক কনফারেন্সে যোগদান করেন।

বিগত এক দশকে দেশে অনুষ্ঠিত আট-দশটি সায়েন্টিফিক কনফারেন্সে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে দেশে গবেষণা অগ্রগতি অবলোকন করেছি খুব কাছ থেকে। বিগত ২০১২ বা ২০১৩ সালে কোন কনফারেন্সে ১০০-১৫০ পেপার জমা হলেই আমরা খুশি থাকতাম। মজার বিষয় হলো, ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের লক্ষ্যে 'বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)' ঢাকা-কর্তৃক আয়োজিত সায়েন্টিফিক কনফারেন্সে পেপার জমা পড়েছিল হাজারেরও বেশি! বিগত বছরগুলো থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই অগ্রগতি ঘটেছে। প্রশ্ন হতে পারে, কনফারেন্সে বিদেশিদের পেপারের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান নাকি দেশের গবেষণার সংখ্যা বেড়েছে?

যদি বিদেশিদের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন হলো বাংলাদেশি কনফারেন্সে বিদেশিরা এত পেপার জমা দিচ্ছেনই-বা কেন? সবাইকে বাস্তবতাটুকু ভেবে দেখার আহ্বান করছি। আরেকটি বিষয়, প্রায়শই আমাদের দেশের শিক্ষার মান নিয়েও নেতিবাচকভাবে প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু আমার মনে একটা উল্টো প্রশ্ন জাগে। তা হলো, শিক্ষার মান যদি তলানিতেই যেত, তাহলে এ দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়ে ডিগ্রি না নিয়ে ফেরত আসার কথা ছিল! বিগত বিশ বছরে এ ধরনের ঘটনা জানা নেই, যদিও আগে এ ধরনের ঘটনার কথা আমাদের শিক্ষকদের কাছে শুনেছি।

চার. একজন তত্ত্বাবধায়ক পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের জন্য সম্মানী হিসেবে কত অর্থপ্রাপ্ত হন ও আর অন্য কী কী সুবিধা পেয়ে থাকেন সেসব তথ্য দিয়ে লজ্জা দিতে চাই না। দেশে গবেষকরা অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছে। তবে গত পাঁচ-সাত বছরের দেশের গবেষকদের অর্জন বিশেষ করে বিশ্বনন্দিত জার্নালে প্রকাশনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করুন। আশান্বিত হবেন, দেখবেন দেশের গবেষণা রসাতলে যায়নি! আরও দেখবেন, গবেষকদের লক্ষ্য স্থির রয়েছে। পরিশেষে উপলব্ধি করবেন যে, দেশের গবেষক-যোদ্ধাদের ব্যঙ্গ্যাত্মক 'তিন আঙুলে স্যালুট' নয়, বরং 'দুই আঙুল' দিয়ে সম্মানসূচক স্যালুট দিতে ইচ্ছা করবে।

আমাদের দেশের বয়স যদিও অর্ধশত বছর, তথাপি মনে রাখা দরকার-১৯৭৫ সালে মাত্র চার বছর বয়সের শিশুতুল্য দেশটি ঘাতকের বুলেটের আঘাতে প্রিয়তম অভিভাবককে হারিয়েছিল। তার পরবর্তী ১৫-২০ বছরেও নানা আঘাতে দেশটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিল। বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে ব্যক্তিগতভাবে ভীষণ আশাবাদী যে, ২০৩০ সালের মধ্যে গবেষণা নিয়ে বাঙালিরা বিশ্বকে আরেকবার জাত চেনাবে। দেশের গবেষণা নিয়ে হতাশায় না ভুগে ইতিবাচক চিন্তা করুন। হতাশা প্রসঙ্গে দুই লাইনের একটা গল্প দিয়ে শেষ করছি। অনিন্দ্য সুন্দরী রাজকুমারী অন্য রাজ্যের রাজকুমার বরের অপেক্ষায় বিয়ের পিঁড়িতে বসে আছে। কিন্তু রাজকুমারী ভুল খবর পেল যে, পথিমধ্যে ডাকাত দল রাজকুমারকে হত্যা করেছে। খবরটি যাচাই না করেই হতাশায় তখন রাজকুমারী আত্মহনন করে বসল। অনুসন্ধান বা খবর যাচাই না করে হতাশায় ভুগবেন না। হাত বাড়িয়ে দেখুন আপনার কানটি হয়তো ঠিকঠাক জায়গা মতোই রয়েছে!



মন্তব্য করুন