অজস্র ফুলের সম্ভারে মেঠোপথে ধুলার ঝড় উড়িয়ে চারপাশের সবকিছু অন্ধকার করে দিয়ে চলে যায় যেন চৈত্র। এই সময়ে নদীতীরবর্তী গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশের মেয়ে-বউরা প্রাচীন কৃষি সভ্যতার আনুষঙ্গিক নানা বিশ্বাস ও সংস্কারে মেতে ওঠে। তন্মধ্যে একটি হলো বিগত বছরের সবকিছু ছেড়ে ফেলে নতুন করে সবকিছু সাজানো। পরিবারের সবার কল্যাণে, পারিবারিক সমৃদ্ধ কৃষির উন্নয়নে নারী এ- ক্ষেত্রে পথিকৃৎ। বছর শেষে অর্থনৈতিক উন্নয়নের খতিয়ান ও গ্রামের মানুষের আনন্দ-উৎসব একযোগে, সমান্তরালে আরম্ভ হতো। যুগের পরিবর্তনে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও এখনও শেষ চৈত্রের দিনগুলোতে গৃহস্থ বাড়ির আঙিনা শুধু নয়, সংসারের আনাচে-কানাচে সারা বছরের শত ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে ব্যস্ত বাড়ির বউ-ঝিরা চঞ্চল ত্রস্ত পায়ে ঘরের বেড়ার ঝুল ঝাড়ে, পুরোনো হাঁড়ি-কুড়ি, উঠান, বাড়িঘর ঘষেমেজে একেবারে ঝকঝকে-তকতকে করে তোলে। পুকুরঘাট, বাঁশঝাড়, বাড়ির চারপাশ সব পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, বাদ যায় না কিছুই। আগে মাটির পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল ফেলে দিয়ে নতুন হাঁড়িকুড়ি কেনা হতো। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি, কড়াই, ঢাকনির প্রচলন হওয়াতে সেই চল আর নেই। দামও বেড়ে গেছে। ধানের ডোল, মাচা, গোলা সবই ত্রস্ত পায়ে পরিস্কার করে চৈত্রসংক্রান্তির আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। আড়ং হবে হাটখোলায়। খোঁজ পড়ে মুড়ির ধান কনকচূড়, খইয়ের ধান চিনিশংকর, চিড়ার ধান পঙ্খীরাজের। কত আগেই এ সব ধান বাড়ির বউয়েরা রোদে দিয়ে শুকিয়ে চাল করে রেখেছে। চৈত্র মাস আরম্ভের সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যায় চিড়ে কোটা, মুড়ি ভাজার ধুম। ভোরে উঠে কাজ শুরু করে। মাঝে রান্নাবান্না, বাচ্চার যত্ন, গোয়াল পরিস্কার, ঘুটে দেওয়া, পরিবারের সবার খাবার দেওয়া তো আছেই। কাজ তো আর একটা নয়। মোয়া-মুড়কি বানানো, নারিকেলের নাড়ূ, তিলের নাড়ূ, নকশি পিঠা বানানো, নারিকেলের চিড়া, কলাই ডালের বড়ি বানানো, বেসন বানানোর আয়োজন চলে তো চলেই। এসব শেষে ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার হিড়িক পড়ে। মাটির ঘর লেপাপোছা শেষে দরজা-জানালায়-দেয়ালে আলপনা আঁকা। আছে চৈত্রসংক্রান্তির পূজার আয়োজন। আছে বসন্তের রোগ দূর করার দেশীয় ভেজষ চিকিৎসার ঘরোয়া আয়োজন। এই সময়ে পুকুর-নদী-খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যায়। দেখা দেয় চর্মরোগ। ডায়রিয়া ও কলেরার প্রাদুর্ভাবও ঘটে। কৃষি ও চিকিৎসার আবিষ্কারক নারী ঘর-সংসারের মানুষজনের সুস্থতায় শত কাজের মধ্যে নিম পাতা বাটে, শুকিয়ে রাখে, কড়া রোদে বড়ি তৈরি করে। সজনে পাতা শুকিয়ে রাখে।

বাংলার কৃষক, তাঁতি, জেলে, বাগদি, কুমার, কামার কোনো বাড়িতেই কাজের অন্ত থাকে না এই সময়ে যখন গরম রোদে মাথা ফাটানোর উপক্রম করে ধুলা উড়িয়ে চৈত্র চলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। গ্রামের মানুষ গাজন বা চড়ক পূজা ও মেলার প্রত্যাশায় থাকে। আড়ং হবে আড়ং বলে খুশিতে ডগমগিয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও 'হর-গৌরী' সেজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল-ডাল-আনাজপাতি সংগ্রহ করে, পূজা দিয়ে রান্না করে গ্রামের ঠাকুর বাড়িতে সবাই মিলে খায়। গান করে। প্রত্যন্ত গ্রামের নিস্তরঙ্গ গার্হস্থ্য জীবনে ছেলে-বুড়ো সবার মনে এ বড় আনন্দ সঞ্চারিত করে। বৈশাখ আসে নববর্ষ নিয়ে নানান রসাল ফলের সম্ভার সাজিয়ে।

তাঁতি বাড়িতে থাকে না ঘুমানোর অবসর। রাতদিন তাঁতের শব্দ, কাপড় বুনোনের ধুম। করোনাকালে চিত্র অন্য রকম। অন্য বছরের তুলনায় শাড়ির অর্ডার অর্থাৎ চাহিদা কম। যেখানে এই সময়ে পঁচিশজন তাঁত শ্রমিক দিনরাত কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারত না, সেখানে অনেকে তাঁতই চালাতে পারছে না।

বাগদিপাড়াতে এবারে নেই বাঁশ ও বেতের কাজের ব্যস্ততা। ঝিনাইদহের সনেকার মন খারাপ। মেলা হবে কিনা সন্দেহ। ধানের ডোল, মাছ ধরার খাঁচা যারা বানায়, তাদের বাজার ভালো আছে। আর ক'দিন পরেই বোরো ধান উঠবে। কিন্তু সুখ নেই কৃষকের মনে। কী যে হয়েছে বুঝতে পারে না বংশ পরম্পরায় কৃষক আলাউদ্দী। ধানে চাল ঠিক মতো হচ্ছে নাকো। গরমি দুধ-ধান শুকিয়ে চিডা হই গেছে। ইডা কি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যি হলনি! চিন্তিত মনে হয় তাকে।

রোমেছা জবের ছাতু বানায়, প্যাকেট করে বিক্রি করে। হালিমুন পুঁতির মালা বানায়। রুক্ষ্ণিনী মাটির পুতুল, ঘোড়া, সরা তৈরি করে। মাধুরী রঙিন হাঁড়িতে নকশা আঁকে। চড়ক মেলা না হলে এসব বিক্রি হবে কেমন করে? তাদের আয়রোজগার তো এসব কাজের মধ্য দিয়েই হয়। গ্রামের অর্থনীতিতে মেলার একটা বড় ভূমিকা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। গ্রামের লোকের বিশ্বাস, চড়কের বাণফোঁড়ের কষ্টকর ক্লেশের মধ্য দিয়ে বিগত বছরের সব পাপ ক্ষয় হয়ে যায়। এটা গ্রামের সবার সুখ-শান্তির জন্য ভগবানের কাছে আরাধনার একটা পদ্ধতি। এই শেষ চৈত্রের মেলা সমাপ্ত হতো বৈশাখ শুরুর এক সপ্তাহ পরে। সেই সব মেলাতে কুষ্টিয়া, নড়াইল, কিশোরগঞ্জ, যশোরে লাঠিখেলা হতো। নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলে হতো ষাঁড়ের লড়াই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে দেখেছি মোরগের লড়াই হতে। মুন্সীগঞ্জে হতো গরুর দৌড়। প্রায় সব জেলাতে হাডুডু খেলা হতো। চৈত্রসংক্রান্তির মেলা উপলক্ষে গ্রামে গ্রামে যে সাজ সাজ রব ঘরে ঘরে পড়ত, তা ছিল মূলত গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার একটি প্রাচীন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে আনন্দ-আয়োজন ছিল খেলাধুলা ও গান-বাজনার সংস্কৃতি।

প্রখ্যাত গোপাল হালদার তার লেখা গ্রন্থে বিভিন্ন সময়ে এই কথাটি বলার চেষ্টা করেছেন যে, বস্তুসম্পদ জাতির সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম প্রধান উপকরণ আর মানবসম্পদ সংস্কৃতির রুদ্ধদ্বার খুলবার চাবিকাঠি। সংস্কৃতি বস্তুটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি গতির প্রশ্ন। কুসংস্কার মানুষের জীবনকে করে গতিহীন। আর সংস্কৃতি মানুষের জীবনে আনে গতিবেগ, সজীবতা। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা গ্রামীণ জীবনের গতির সংস্কৃতি এই করোনাকালে আমরা কীভাবে চালু রাখব? হাজারো কাজের মধ্যে আমরা ঘরের মধ্যে চৈত্র-বৈশাখের আনন্দ আয়োজন করব। সঙ্গে কৃষক, তাঁতি, খুদে উদ্যোক্তাদের কথাও মনে রাখি। ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতার হাত বাড়াই। এবং সরকারের সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয় কোনো ভর্তুকি খুদে উদ্যোক্তা, কুমার, কামার, তাঁতি ও কৃষকদের দিতে পারে কিনা, বিবেচনার আবেদন করি।






মন্তব্য করুন