সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আবর্তন এবং এ আবর্তন থেকে সময়ের উৎপত্তি। যে সময়ের মধ্যে আমরা বাস করছি তার একটি একক বর্ষ। সেই এক বর্ষকাল সময় একবার ঘুরে এসে আমাদের নববর্ষ আসে। এই নববর্ষ পৃথিবীর দেশে দেশে রয়েছে। অপরাপর জাতির মতো বাংলা নববর্ষবরণ বাঙালির একটি সার্বজনীন উৎসব। রবীন্দ্রনাথ বলতেন, উৎসব মানেই কবিত্ব। নববর্ষ এমন একটি কবিত্ব, যা একাকী কোনো ব্যক্তির নয় বা নিভৃতে বসে রচিত নয়। এটি সমবেত জনপুঞ্জের একত্র আনন্দ ছন্দ ও সুরের মধ্যে নিজেদের বিস্তার করা। নিজেদের সক্রিয় করে তোলা। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ থেকে নববর্ষ শুরু। এটি আমাদের অতি আদরের ধন। এই নববর্ষকে কেন্দ্র করে গ্রামে-গঞ্জে এবং শহরে একটা নগরলৌকিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যে সংস্কৃতির মূলকথা হলো গ্রামীণ বাংলার কুটির শিল্প। কুটির শিল্পের ঐতিহ্য চলে এসেছে মেলার আকারে, যেটি আবির্ভূত হয়েছে নতুন রূপে। আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি কুটির শিল্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক গতিশীলতা একদিকে যেমন বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, সাধারণ মানুষের কর্মক্ষমতা আর উৎপাদনও বেড়েছে এর মাধ্যমে। তেমনি মানুষে মানুষে সংযোগ ও আনন্দ সম্পর্ক একটা নতুন উৎকর্ষ লাভ করেছে।
পহেলা বৈশাখে আমরা নতুন জামাকাপড় পরিধান করি, বিশেষ করে নারীদের শাড়ি পহেলা বৈশাখের এক অত্যাবশ্যকীয় অংশ। এ সময় নগর যেন একটা নতুন রূপে সেজে ওঠে। বাঙালি নারীদের যে স্বকীয়তা, স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার; সব একত্র হয়ে ফুটে ওঠে এই উৎসবে। বর্ষবরণের উৎসবে আনন্দে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায় ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ সবাই।
আরেকটি দিক হলো, পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত এবং লোকশিল্পকে কেন্দ্র করে যত লোকজ শিল্প আঙ্গিক আছে; সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয় এবং মানুষ তা উপভোগ করে। বিশেষ করে জারি-সারি-ভাটিয়ালি লোকসংগীত, বাউল গান ইত্যাদি যেন পুনর্জীবনপ্রাপ্ত হয় এবং এর মধ্য দিয়েই বছর বছর এগুলো টিকে থাকছে এবং এর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট মানুষদের জীবিকার সংস্থান হচ্ছে।
এ ছাড়া মেয়েরা যেসব শখের অলংকার পরিধান করে, বর্ষবরণে সেসবের একটা নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। গ্রামে-গঞ্জে বৈশাখী মেলার অন্যতম আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে মেয়েদের অলংকার-প্রসাধন।
আরেকটি হচ্ছে আর্ট বা শিল্পকর্ম। আজকালকার পহেলা বৈশাখের মেলায় রং-তুলি নিয়ে শিল্পীরা আসেন। উৎসবে আগত মানুষদের মুখমণ্ডলে পহেলা বৈশাখের বিভিন্ন প্রতীক এঁকে দেন তারা। নানান রঙে হাত-মুখ রাঙিয়ে মানুষ আনন্দ উদযাপন করেন। দিনে দিনে এটিও যেন বর্ষবরণের একটি অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
বৈশাখী বর্ষবরণে আমরা বিশেষ করে যে খাবার-দাবার তৈরি করি, গ্রামে পহেলা বৈশাখের আগের দিন চৈত্রসংক্রান্তিতে ছেলেমেয়েরা নানারকম শাক তুলে আনে। চৈত্রের শেষ দিনে সেই শাক রান্না করে খাওয়ার মতো এমন বহু প্রচলন দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকেও এর কার্যকারিতা আছে। তখন এত গরম পড়ে, যেখানে এই তেতো শাক, লতা-পাতা আমাদের শরীরের জন্য উপকারী ও প্রতিষেধকের ভূমিকা পালন করে। অঞ্চলভেদে এই প্রচলিত লোকাচারেরও রয়েছে নানা বৈশিষ্ট্য। পহেলা বৈশাখের দিন পিঠা-পায়েস আমাদের জীবনের নতুন পর্বের আনন্দকে ধারণ করে। আগেকার দিনে ছোট ছেলেমেয়েরা বড়দের থেকে পাওয়া আধুলি, সিকি পয়সা নিয়ে মেলায় যেত, চরকিতে চড়ত, বানর খেলা দেখত এবং নানা ধরনের মিষ্টি জাতীয় খাবার আর খেলনা কিনে বাড়ি ফিরত।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, পহেলা বৈশাখ মানেই হালখাতা। যুগ যুগ ধরে বাংলা অঞ্চলে এই হালখাতা চলে আসছে। ব্যবসায়ীরা এদিন হালখাতা করেন। দোকানে আগত নতুন-পুরোনো ক্রেতাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করেন। ক্রেতারাও বাকি-বকেয়া চুকিয়ে দিয়ে সাধ্যমতো বছরের প্রথম সদাইটা করার চেষ্টা করেন। এতে ব্যবসায়ীরও লাভ এবং যে কিনছেন তারও আনন্দ। সর্বক্ষেত্রে এ আনন্দই পহেলা বৈশাখের মূল শক্তি। এ শক্তি আমাদের জীবনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং আমরা সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার মতো ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে গড়ে তুলতে পারি।
আধুনিককালে বর্ষবরণে চারুকলা অনুষদ থেকে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হয়, তাকে অনন্য ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত বলা চলে; যা কিনা এখন অন্যতম বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। অর্থাৎ আধুনিক বিশ্বে বহুজাতিক বিশ্বপরিমণ্ডলে বাঙালির জাতিগত আধুনিক অংশগ্রহণ এবং এ শোভাযাত্রায় যে মুখোশ পরিধান করা হয়, সেগুলো আমাদের আদি জীবনের ধারাবাহিকতা থেকে এসে বর্তমান জীবন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। আমরা সংস্কৃতিচর্চা করছি নানাভাবে। আগেকার বাঙালির লোকচর্চাকে আমরা একালের সাংস্কৃতিক চর্চায় ধারণ করছি। এটিই হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যের চর্চাধারা এবং এ ঐতিহ্যের মধ্যেই বেঁচে থাকে বর্তমান। ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে আমরা বর্তমানে দাঁড়াতে পারি না।
গত কয়েক বছরে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বইমেলাও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এভাবে ঐতিহ্যিক চর্চা এবং ইতিহাসের পাঠে এটি আমাদের জ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বাঙালির ঐতিহ্য, বাঙালির সংস্কৃতি, বাঙালির অর্থনৈতিক চলমানতা এবং বাঙালির অর্থনৈতিক বিকাশ পহেলা বৈশাখে রূপ পায়। ইতোমধ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নববর্ষে উৎসব ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। এর মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে জাতীয় এ উৎসবটি রাষ্ট্রীয় রূপ লাভ করেছে। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের মানুষের আরও বেশি অবশ্যম্ভাবী উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই উৎসবের আনন্দ সর্বজনীন। সর্বজনীন বলেই এটি কোনো সম্প্রদায়বিশেষের উৎসব নয়। সর্বজনীন বলেই এতে সব ধর্ম, সব শ্রেণি, সব সম্প্রদায়ের লোক স্বাচ্ছন্দ্যে আনন্দিত চিত্তে অংশগ্রহণ করতে পারে।
এই যে অংশগ্রহণ, এই আনন্দ- এটি জীবন, রাষ্ট্র ও সমাজকে মুক্ত রাখে, স্বাধীন রাখে এবং বিকাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এ বিকাশটাই আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমি মনে করি, নববর্ষের উৎসব আমাদের জন্য এমন একটি উৎসব যাতে আমরা বেঁচে থাকার আনন্দটুকু পেতে পারি। শত দুঃখ-কষ্ট থাকলেও বর্ষবরণের আনন্দ আমাদের সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত এতে অংশগ্রহণ করেন এবং তাতে কোনো বাধা নেই। যার যার জায়গা থেকে তারা নির্বাধ মনের প্রকাশ ঘটান। নববর্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আছে এবং অনেকেরই লেখালেখি আছে, যা আমাদের সাহিত্যের অংশ। কাজেই সবদিক থেকেই অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে জনমনে আনন্দচিত্তের প্রকাশক রূপ হিসেবে পহেলা বৈশাখ আমাদের কাছে বিশেষ দিন। এ আমাদের বাংলার সব মানুষের আপন উৎসব। সবাইকে শুভ নববর্ষ।

লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন