মানুষ পৃথিবীতে আসে অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে- যার জন্য মানুষই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে। জীবনে নানা রকম সমস্যা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকে, যা মানুষকে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু কিছু মানুষ নিজ যোগ্যতায় ও গুণে সব বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করে আচরণ, কর্ম, কর্তব্যনিষ্ঠার দ্বারা কিছু দৃষ্টান্ত সমাজে রেখে যান; যা নিজ জীবনের জন্য হয়ে থাকে মূল্যবান সম্পদ, অন্যের জন্য অনুসরণযোগ্য আদর্শ। এমন কিছু মানুষের একজন ছিলেন সবিতা চক্রবর্ত্তী, যিনি আমার মা। আচরণ, কর্ম, কর্তব্যনিষ্ঠা ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে শোধ করেন মানুষের কাছে তার জীবনের ঋণ, সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মকে আবদ্ধ করেন অশেষ ঋণে। আজ তার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। নাটোরের কাফুরিয়ার বিখ্যাত জমিদার পরিবার লাহিড়ী বাড়িতে ১৯২৭ সালের ১৫ জুন সবিতা লাহিড়ী নামে যে শিশুটি জন্মেছিল- সময়ান্তরে বৈবাহিকসূত্রে নওগাঁ জেলার (তৎকালীন রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমা) বদলগাছী উপজেলার বৃহত্তর বালুভরা গ্রামে এসে তিনি হয়ে গেলেন সবিতা চক্রবর্ত্তী। বিদুষী, মমতাময়ী নারী সবিতা চক্রবর্ত্তী মানুষ হিসেবে মনুষ্যত্ব ও মহত্বের যে নিদর্শন রেখে গেছেন তা কখনোই ভোলার নয়। এলাকায় শিক্ষা-সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সমাজকল্যাণ ও সেবাব্রতে তিনি যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সে জন্য নওগাঁ অঞ্চলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বালুভরাসহ নওগাঁ অঞ্চলের অনেক হিন্দু পরিবার দেশ ত্যাগ করলেও আমাদের পরিবার দেশমাতৃকার টানে রয়ে যায়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সপরিবারে শরণার্থী হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বালুরঘাটে আশ্রয় গ্রহণ করি। শরণার্থী জীবনের যে চরম কষ্ট, তা ভুক্তভোগীরাই উপলব্ধি করেন। স্বাধীন হওয়ার পর আমরা সপরিবারে বাংলাদেশে ফিরে আসি। আমাদের ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। বালুভরা আর.বি. উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমাস্টারের কক্ষে কয়েক মাস বাস করি। বেশ কিছু পরিবার পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা মাটির ঘরগুলোতে বসবাস করছিল। কয়েক মাসের মধ্যে নিজেদের জন্মভিটায় আমরা কোনোমতে বসবাস করার মতো ঘর নির্মাণের ব্যবস্থা করে নিই স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায়। কিন্তু আমার মায়ের দৃষ্টি স্কুলের প্রতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ছেলেমেয়েরা যাতে নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারে তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ঘন ঘন মিটিং করে স্কুলের শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজে অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করা- এ যেন তার নিত্যদিনের কাজ হয়ে গিয়েছিল। তার জীবনে একটা বড় স্বপ্ন ছিল বালুভরা আর.বি. উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করার। ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা করতে পারে, সৎ গুণাবলি অর্জন করতে পারে, মানুষের মতো মানুষ হয়ে যাতে দেশ ও দশের সেবা করতে পারে, সে জন্য আজীবন পরিশ্রম করে গেছেন। বৃহত্তর বালুভরা অঞ্চলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সমাজকল্যাণ ও সেবাব্রতে তিনি যে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন, সে জন্য এ অঞ্চলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই বিদুষী নারীকে স্মরণ করেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বৃহত্তর বালুভরাবাসীর দাবি ও ঐকান্তিক আগ্রহেই তার মৃত্যুর পর এ প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিটির নামকরণ হয় 'সবিতা চক্রবর্ত্তী স্মৃতি গ্রন্থাগার'।
শিক্ষা-দীক্ষা, সভ্যতা-সংস্কৃতির লালন ও বিস্তারের জন্য গ্রন্থাগার চিরদিনই সমাজের একক ও সমষ্টিগত জীবনে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। সবিতা চক্রবর্ত্তীর ভাবনা ছিল যেন শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, চিন্তায়, চেতনায়, মানসিকতায়, শিক্ষায়, সভ্যতায়, বিবেচনাবোধে, পরিমিতিবোধে সচেতন হয় এবং নবীন প্রজন্ম যাতে এসবের চর্চা করতে পারে, নিজেদের ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। আমাদের সমাজ, মূলোবোধ নৈতিক অবক্ষয় ও সংকটে আক্রান্ত। আজ প্রয়োজন প্রত্যেক পরিবারে সবিতা চক্রবর্ত্তীর মতো সৎ, নিষ্ঠাবান, নৈতিক সাহসী মানুষ। যারা সমাজটা বদলে দিতে পারেন। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সাবেক সিনিয়র সচিব
sauren.chak@gmail.com

মন্তব্য করুন