মূল্যবোধের অবক্ষয় কোন স্তরে পৌঁছালে এমন ভাষায় হুঙ্কার ছাড়তে পারেন একজন পেশাজীবী! ভিডিওচিত্রে আমরা যা দেখেছি, তা আমাদের সামাজিক দৈন্যতা আর মূল্যবোধের অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ।

ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয় নয়, দায়িত্বের অংশ মাত্র। তবুও আমরা ক্ষমতার দাপট দেখাই কারণে-অকারণে- এ যেন আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে গেছে। আর এই ক্ষমতা যারা প্রদর্শন করতে পারে, আইন-আদালত যেন তাদের কাছে নস্যি! 

১৪ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জরুরি চলাচলের প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার নির্দেশনা দিয়েছিল। লকডাউনের সময় বিশেষ প্রয়োজনে জনসাধারণকে পাস সংগ্রহ করে চলাচলের নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ পুলিশ। দুটি নির্দেশনার কোনোটিই জনস্বার্থের পরিপন্থি ছিল না। কাউকে হয়রানি আর অপদস্থ নয়, কভিড-১৯-এর ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জীবন রক্ষার প্রয়োজনে সরকারের সামনে অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার উচিত সরকার গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা।

দুর্যোগ অবস্থায় একটি জাতি যেমন সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে, অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলায় আজকের এই যুদ্ধেও জাতির সর্বোচ্চ সংযমই ভয়াবহতা প্রতিরোধে একমাত্র কৌশল। এ সত্যটি মেনে নিতে ক্ষুধার্ত দিনমজুরের অসুবিধা হলেও, সমাজের শিক্ষিত বিলাসী শ্রেণির অসংযত আচরণ ও বিধিবিধান অমান্য করার প্রবণতা তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক সাফল্য আজ সর্বজন বিদিত। একদা ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস আর দুর্ভিক্ষের দেশটিকে আজ পৃথিবীর অনেক দেশই সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি চারিত্রিক দৃঢ়তা, নৈতিক সামাজিক মূল্যবোধ আর শিষ্টাচারেও আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। যতদূর জানি, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে চাকরিজীবনের শুরু থেকেই নৈতিকতা, শিষ্টাচার, ব্যক্তিত্বের বিকাশ, রাষ্ট্রীয় ও আইনের বিধিবিধান নিয়ে নানা রকম প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এসব প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিকে যেমন আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখানোর কথা, পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি বিনয় আর শিষ্টাচারেও সমৃদ্ধ হওয়ার কথা। ১৮ এপ্রিল ঢাকার রাজপথে ডাক্তার, পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেটের ভিডিওচিত্রে আমরা তা দেখিনি বললেই চলে।

অথচ অন্যান্য দেশের অবস্থা যদি আমরা দেখি, গেল সপ্তাহে কানাডার দু'বারের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার শপারস ড্রাগমারট নামে একটি ওষুধের দোকান তথা ফার্মেসিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে কভিডের ভ্যাকসিন নিলেন। লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অনেকেই তাকে চিনলেও কেউই তাকে সিরিয়ালের ব্যাঘাত ঘটিয়ে সামনে যেতে উৎসাহিত করেননি। যখন তার সিরিয়াল এলো দায়িত্বে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী তার আইডি সংগ্রহ করলেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হলেন তিনিই পরিচয়পত্র বহনকারী হারপার। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে চিনতে না পারার অপরাধে দায়িত্ব পালন করা স্বাস্থ্যকর্মী তো কোনো ক্ষোভ বা বিক্ষোভের শিকার হননি? ১৪ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) কর্তৃক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে ইস্যুকৃত পত্রে চলাচলের সময় দাপ্তরিক পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এই পরিপত্রের কোথাও তো মনোগ্রাম খচিত গাড়ি বিশেষ পাস হিসেবে ব্যবহূত হবে- এমন কোনো নির্দেশনা নেই। ভুলক্রমে পরিচয়পত্র সঙ্গে না থাকায় বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশের পরিবর্তে দাম্ভিকতার সঙ্গে যে অসংযত আচরণ প্রদর্শন দেখা গেল, আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দিলেন তা কি কোনোভাবেই তার পেশা আর পারিবারিক মর্যাদার সঙ্গে মানানসই?

অথচ বিএমএ, স্বাচিপসহ চিকিৎসকদের তিনটি সংগঠন পুলিশ আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিচার দাবি করে ঘটনার প্রতিকার চেয়েছে। নিজেদের পেশার একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত অসৌজনমূলক আচরণকে বিবেচনায় না নিয়ে পেশাজীবী চিকিৎসকদের সংগঠন কি সরকারের নির্দেশিত বিধিবিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে? বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনও ঘটনার নিন্দা করে প্রতিকার চেয়েছে। এরাও অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া অবধি সব নাগরিকের প্রতি সহনশীল সম্মানজনক আচরণ করার জন্য নিজ পেশার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানাতে পারেনি! তাহলে সমাজ আর রাষ্ট্রে বিনয়, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠায় তাদের কি কোনো দায়বদ্ধতাই নেই!

জীবন-জীবিকা নিয়ে সারা পৃথিবীর মতো বাংলার মানুষও আজ এক কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত। জীবনের ভয়ে সন্তান যখন বাবার মুখাগ্নি করতে অস্বীকৃতি জানায়, সন্তান যখন তার মা-বাবাকে হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যায়, পরম আত্মীয়রাও যখন শেষ বিদায়ে শ্রদ্ধা জানাতে অনীহা প্রকাশ করে, সেই চরম দুঃসময়েও পুলিশ, সিভিল প্রশাসন, চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীরাই তো অন্তিম যাত্রার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠেন।

সংবাদমাধ্যমের এক তথ্য থেকে জানা যায়, কভিড-১৯ আমার দেশের শতাধিক মেধাবী চিকিৎসকের জীবন কেড়ে নিয়েছে। দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রশাসনের ২৫ জন মেধাবী কর্মকর্তার অকাল প্রয়াণে দেশ-জাতির পাশাপাশি তাদের পরিবারগুলো অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যে দেশের পুলিশ পরিবার-পরিজনের বেঁচে থাকার দাবিকে উপেক্ষা রাতের আঁধারে ক্ষুধার্ত মানুষের ঘরে খাবার জোগান দেয়, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকে, যে দেশের চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজ জীবন হুমকিতে ফেলে সন্তানসন্ততি আর আপনজনদের ফেলে যাওয়া কভিড রোগীর নিয়মিত সেবা দিয়ে বেড়ায়, সে দেশে কে বড়? পুলিশ না ডাক্তার- এমন হুঙ্কারকে দেশের জনগণ শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করলে খুবই অন্যায় হবে কি? সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার রক্ষায় আপনাদের মতো দায়িত্বশীলরা আরও যত্নবান না হলে জাতি হিসেবে আমাদের দুর্দশার কালটি যে আরও দীর্ঘায়িত হবে, তাতে সন্দেহের অবকাশই বা কোথায়?

মন্তব্য করুন