করোনা মহামারির প্রথম ধাক্কা সরকার ভালোভাবেই সামলে উঠেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউটা ভয়ংকর আকার ধারণ করে আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের পরতে পরতে। এক দুই করে এখন কমবেশি একশর মতো মানুষের মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন! হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর চাপ বেড়েছে। আশার কথা, সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এক হাজার শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। যার মাধ্যমে কিছু মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার একটা জায়গা তৈরি হবে।

করোনা মোকাবিলায় বহু ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা পরিদৃষ্ট হলেও জনসাধারণের মধ্যে সে পরিমাণে সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। একশ্রেণির মানুষের দৃষ্টিতে মাস্ক পরার কোনো প্রয়োজন নেই, নেই টিকা নেওয়ারও কোনো দরকার। লকডাউন নিয়েও রয়েছে নানা শ্রেণির নানা মত। এটা ঠিক যে, লকডাউনের ফলে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু কঠিন হয়নি কার? সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকট আরও প্রবল। তারা তো কারও কাছে যেতে পারেন না, হাত পাততে পারেন না। এই শ্রেণিটি গুমরে কাঁদছে। এই রকম একটা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে তবুও বাংলাদেশ তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছে।

সরকার মনে করছে মানুষ বেঁচে থাকলে বাংলাদেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে খুব বেশি দেরি হবে না। সরকার সর্বাগ্রে মানুষের জীবন বাঁচানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অবশ্য এর জন্য দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, কমপন্থা প্রণয়ন ও মানবজীবনমুখী চিন্তা। স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সরকারের সহযোগিতা নিয়ে চরম এই দুঃসহ দিনে সত্যিকার ভুক্তভোগী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে শুধু আন্তরিক হলেই চলবে।

চরম ভাবাপন্ন, মুমূর্ষু স্বদেশের এসব দিনে তার ওপর জগদ্দল পাথরের ওপর চেপে বসেছে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। অবশ্য এই চিত্র তো নতুন নয়। সরকারকেও নানাভাবে এদের সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তাদের রাজনীতির কুৎসিত রূপ প্রদর্শন করে। প্রকাশ্য দিবালোকে ইসলামের নাম করে নানা জায়গায় কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদর্শন করে, মিথ্যা তথ্য প্রদান করে। আর এসব তো নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

বাংলাদেশের পরতে পরতে, আনাচে-কানাচে এসব দেশবিরোধী তথাকথিত ধর্মীয় গুরুদের অবাধ বিচরণ ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যায় মানুষ শান্তির ধর্ম ইসলামের শিক্ষা গ্রহণের বিপরীতে প্রত্যক্ষ করছে ভুল ব্যাখ্যা ও উগ্র চিন্তা। উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে নির্মূলে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকরী পদক্ষেপের চেয়ে বরং বহু ক্ষেত্রেই নমনীয়তা পরিদৃষ্ট হয়েছে। এ দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি দিনের পর দিন নৈরাজ্য, খুন, জখম, হত্যা সংঘটিত করছে। তার সুবিচার চায় বাংলাদেশ। একটি স্বাভাবিক বাংলাদেশ দেখতে চায় দেশের আপামর জনগোষ্ঠী।

সম্প্রতি হেফাজতের নেতা মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বহুকাল ধরে এই হেফাজতি নেতা ইসলাম ধর্মের নাম করে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তরে উগ্র বক্তব্য প্রদান করে আসছিলেন। হেফাজতের বড় নেতারা তার কৃতকর্মের দায় নিতে নারাজ। খুব স্বাভাবিক। এটাও রাজনীতিতে হেফাজতিদের নতুন অপকূটকৌশল। এদের নতুন করে সুযোগ খোঁজার সুযোগ নিশ্চয়ই সরকার দেবে না। বরং তাদের অতীত, বর্তমান সব কর্মকাণ্ড, বক্তব্যগুলো খতিয়ে দেখা হোক; যারা যারা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের সঙ্গে জড়িত তাদেরও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক।

শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা পৃথিবীতেই করোনার চেয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ কম ভয়ানক নয়। এখন পৃথিবী লড়ছে শুধু করোনার বিরুদ্ধে, বাংলাদেশকে দুর্নিবার লড়ে যেতে হচ্ছে দুটোর বিরুদ্ধেই। বাঙালি জাতির ইতিহাস পরাজয়ের ইতিহাস নয়। অতএব, এ লড়াইয়েও জিততে হবে।


মন্তব্য করুন