স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অদম্য অগ্রযাত্রার পথে। উন্নয়নে বিশ্বের রোল মডেল। এর পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশরা ২০০ বছরে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করে শুধু বর্ধিত মুনাফা তাদের দেশে পাচার করেনি, লুটপাট করেছে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও খনিজসম্পদ। পাকিস্তান শাসনামলে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের কেবল ধারাবাহিকতা ছিল না, ক্ষেত্রবিশেষে ছিল ব্রিটিশ শাসনামল থেকেও কয়েকগুণ বেশি।

কৃষিজ পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানি করে পূর্ব পাকিস্তানের যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো, তা দিয়ে অবকাঠামো গড়ে উঠত পশ্চিম পাকিস্তানে। পাশাপাশি পরিবেশ বিধ্বংসী নীতি ও প্রকল্প গ্রহণ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্প পরিবেশের সেই ক্ষত বহন করছে পাকিস্তান আমল থেকে। স্বাধীন বাংলাদেশেও বন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ব্রিটিশ শাসনামলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা বের হতে পারিনি।

বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি নদীমাতৃক দেশ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধকালীন 'তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা' এ স্লোগানে মুখরিত ছিল বাংলার আকাশ-বাতাস। আমাদের জাতীয় সংগীত নির্বাচন করা হয়, সেখানে ফুটে উঠেছে বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশ। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন শুরু হলে প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং দূষণ নিরোধকে সামনে রেখে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে বাংলাদেশ সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। ওই সম্মেলনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ গঠন করে দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, যা পরে পরিবেশ অধিদপ্তরে রূপান্তরিত হয়।

১৯৭২ সালে প্রণয়ন করা হয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন। এ আইনের মাধ্যমেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ৩০টির বেশি এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়। আর সুন্দরবনকে দেওয়া হয় বিশেষ বনাঞ্চলের মর্যাদা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল সমুদ্র। সমুদ্রের পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে টেরেটোরিয়াল ওয়াটার্স অ্যান্ড ম্যারিটাইম জোনস অ্যাক্ট পাস করেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এদেশ সামরিক শাসনের অধীনে থাকে দীর্ঘ সময়। সামরিক ও অগণতান্ত্রিক শাসনকে বৈধতা দিতে বেসামরিকীরণের পাশাপাশি দেশকে শিল্পায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারায় নিয়ে যেতে পুঁজিপতিদের রাজনীতিতে টেনে আনা হয়। ফলে ক্ষমতা ও পুঁজিকেন্দ্রিক রাজনীতির সূচনা হয়। আশির দশকে উন্নত বিশ্ব পরিবেশগত নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া শুরু করলেও বাংলাদেশ এ ব্যাপারে ছিল উদাসীন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্তর্নিহিত নীতি ছিল আগে শিল্পায়নের মাধ্যমে ব্যাপক উন্নয়ন, পরে পরিবেশ। সর্বনাশার শুরু সেখান থেকেই। শিল্পের জন্য কৃষিজমি সংকোচন, বনের ও পতিত জমি দখল করে শিল্প ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতিতে নদ-নদীর পানি দূষণ, বায়ু ও শব্দ দূষণ। একদিকে অপরিকল্পত শিল্পায়ন, অন্যদিকে অপরিকল্পিত শিল্পায়নের অনিবার্য ফলস্বরূপ অপরিকল্পিত নগরায়ণ দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে আরও নাজুক করে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রেকর্ড রিজার্ভ, ক্রমবর্ধমান রপ্তানি ও শিল্প খাত, জেলায় জেলায় মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এপপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার ও টানেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র্র, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট এবং হাল আমলে গ্রামকে শহরে রূপান্তরসহ নানা বিষয়কে যখন প্রাপ্তি হিসেবে দেখানো হয়; তখন অপ্রাপ্তির খাতায় সর্বাগ্রে অবস্থান করে দেশের পরিবেশ খাত। আমরা উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে হাঁটছি, অন্যদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসের খাদ্যের দিকে ক্রমেই অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের অস্তিত্বের জন্য মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বন বিভাগের হিসাবেই তা বর্তমানে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। আর বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে মোট আয়তনের মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ বনভূমি। শত শত নদীর অস্তিত্ব কাগুজে মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে নেই। অনেক নদীকে পরিণত করা হয়েছে সরু খালে। শিল্পবর্জ্য ও গৃহস্থালি আবর্জনা ফেলার অন্যতম গন্তব্য নদী ও জলাশয়।

কৃষিপ্রধান অর্থনৈতিক দেশে হাওর, জলাশয় ও আবাদি জমি ধ্বংসের মাধ্যমে আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। পরিবেশ ও প্রকৃতির ভিশন নিয়ে আমাদের স্পষ্টতা নেই। যে সুন্দরবন সংরক্ষণে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, সেই বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য হুমকির মুখে। টেকসই পর্যটনের অনুপস্থিতিতে কপবাজার সুমদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ, জলাবন ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল আজ অস্তিত্ব সংকটে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো তাদের এলাকার পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখলেও তাদের পাশ কাটিয়ে ইকোপার্ক, বিলাসবহুল হোটেল ও রিসোর্ট, পিকনিক স্পট নির্মাণ করায় ওইসব এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন।

স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বাবলম্বী ও মর্যাদাবান জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। এখানে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখ করার মতো। জনগণের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন, খাদ্য ও বাসস্থানের নিরাপত্তায় বাংলাদেশের এগিয়ে চলা বিশ্বের কাছে বিস্ময়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে অগ্রাধিকার খাত হওয়া উচিত পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভালো করেছে। সামনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে জড়িত হলো আগামীর বিশ্বে বাংলাদেশের টিকে থাকা-না থাকার প্রসঙ্গ। প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে ইট-পাথরের অবকাঠামো গড়ে তোলার খণ্ডিত উন্নয়ন ধারা থেকে বের হয়ে সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর না দিলে বাংলাদেশের আগামীর বিশ্বে টিকে থাকাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে আজ যুগোপযোগী পরিবেশ নীতি রয়েছে। পরিবেশ আইনও শক্তিশালী। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন রয়েছে। বাংলাদেশের সমস্যা হলো এসব আইনের প্রয়োগে ব্যর্থতা।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের অন্যতম বৈশ্বিক অংশীদার। আন্তর্জাতিক আইন ও ঘোষণার স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নয়, পরিবেশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে- 'রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবে।'
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রত্যাশা হলো নির্মল পরিবেশ ও সুস্থ প্রকৃতি। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য না থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ও রেকর্ড বৈদেশিক রিজার্ভ অর্থহীন।

মন্তব্য করুন