বিভিন্ন সময়ে আর্য-অনার্যসহ নানা জাতি-গোষ্ঠীর আগমনে শিল্প শৌকর্যে সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের এই জনপদ। কালের প্রয়োজন ও সামাজিক প্রক্রিয়ায় প্রাচীন লোকশিল্পের অনেক কিছুই আজ বিবর্তিত, বিলুপ্ত ও পরিমার্জিত হয়েছে। আমাদের লোকজ শিল্প কোনো একক শিল্পীর শিল্প কর্ম নয়। প্রাচীনকাল থেকে এটি একটি সুসংহত সমাজ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমেও সৃষ্ট হয়নি। প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনেই পূর্বপুরুষদের লোক বিশ্বাস সম্পৃক্ত হয়ে নানা প্রতীকী অলংকরণের মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছে। যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য হয়ে শরীর ও মনের সঙ্গে মিশে নিজ সত্তায় রূপায়িত হয়েছে। এটি দর্শন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য। আমাদের বাঙালি লোকশিল্পের খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। ঢাকাই মসলিন উপমহাদেশের লোকশিল্পের গর্ব ছিল। এখনও এ দেশের নানা শিল্পসামগ্রী পৃথিবীর নানা স্থানে রপ্তানি হচ্ছে।

আমাদের দাদি-নানিরা সংসারের কাজ সেরে অলসদুপুরে বসতেন কাঁথা সেলাই করতে। বর্ষাকালে যখন চারদিকে পানি থইথই করত; অথবা সন্ধ্যার পর সাংসারিক কাজ সেরে হারিকেনের আলোয় বসতেন নানা শিল্প নৈপুণ্যের কাজ নিয়ে। হারিকেনের মৃদু আলোতেই তারা ভালো দেখতেন। তাদের চোখ ছিল অসাধারণ জ্যোর্তিময়। সে সময়ের সেই কাঁথা আজ নকশিকাঁথা শিল্পে পরিণত হয়েছে। কাঁথা সেলাইয়ের আধুনিক রূপ যশোর স্টিচ। কালো পাথরের বুকে বাটালির টুক টুক শব্দে পাথর খোদাই হয়ে তৈরি হতো রকমারি নকশা যা ছাঁচ নামে পরিচিত। এসব ছাঁচে তৈরি হতো নানা ডিজাইনের নকশাখচিত পিঠা ও আমসত্ত্ব। গ্রীষ্ফ্মের অসহনীয় গরমে ব্যবহার করা হতো হাতপাখা। তালপাতা শুকিয়ে বা বাঁশের চাটাই দিয়ে অথবা কাপড় দিয়ে ডিজাইন করে নানা বৈচিত্র্যের নকশায় তৈরি হতো পাখা। কাপড়ের পাখায় নানা কারুকাজের পাশাপাশি সেলাই করে লেখা হতো ছন্দ।

হাতের নিপুণতায় বা সুতার কাজে ফুটে উঠত শিল্প নৈপুণ্য। পাট থেকে তৈরি হতো শিকা, বেণি, দাউন বসার আসন, ঝুলন্ত খাট, খেলনা প্রভৃতি। শোলা দিয়ে তৈরি হতো টোপর ফুল ও খেলনা। শোলা গাছ শুকিয়ে কাণ্ড থেকে সাদা অংশ বের করে তৈরি করা হয় নানা সৌখিনসামগ্রী। বর্তমানে এসবে জরি ও চুমকির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বিয়ের টোপর তৈরিতে শোলা শিল্পের ব্যবহার আমাদের মানবীয় অনুভূতিতে স্পর্শ করে। আমাদের সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে মৃৎসামগ্রীর অঞ্চলভিত্তিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। হাঁড়ি, পাতিল, দইয়ের ভাঁড়, পিঠার ছাঁচ, সানকি, কলকি, ঠিলা, ফুলদানি, ফুলের টব, ইট, পুতুল, মটকা, ঝাঁঝর প্রভৃতির ব্যবহার হতো প্রতিটি গ্রামে। মৃৎশিল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল কুমার সম্প্রদায়। কুমার চাকার মাধ্যমে মাটি ঘুরিয়ে শৈল্পিক হাতে তৈরি করে নানা শিল্পসামগ্রী। কুমারদের তৈরি পটচিত্র, কার্টুন ও ভাস্কর্য শিল্প বিশেষ উৎকর্ষতা লাভ করেছে। আমাদের দেশের প্রত্নস্থলগুলো থেকে প্রাপ্ত নকশাখচিত ইট ও মাটির তৈরি নানা শিল্পসামগ্রী থেকে প্রমাণিত এই শিল্প ও পেশা অনেক পুরোনো।

কাঠ শিল্পের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে ছুতার সম্প্রদায়। খাট-পালঙ্ক, খুঁটি, দরজা-জানালা, বেড়াসহ কাঠের তৈরি প্রায় প্রতিটি জিনিসে একসময় নকশাখচিত থাকত। কাঠের ঢেঁকি গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরের প্রয়োজনীয় উপাদান ছিল। বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি হতো চালনি, কুলা, ডালা, ঢুলি, ঝাঁটা, চাটাইসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী। উপকূলীয় অঞ্চলে নারিকেল গাছের প্রাধান্য থাকায় সেখানকার নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি হতো এক ধরনের বিশেষ রশি। নারিকেলের খোল দিয়ে বানানো হতো হুক্কা। এভাবে যুগে যুগে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের তৈরি জিনিসপত্র লোকশিল্পে পরিণত হয়েছে। যা আমাদের গৌরব ও অহঙ্কার।

বর্তমান সময়ের শিল্পধারায় লক্ষ্য করা যায় প্রাচ্যের আদল। যা কৃত্রিম এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে অগ্রসরমান, আধুনিক জগতের নানা ইঙ্গিত মননশীল চিন্তায় ভরপুর। তবে আধুনিক শিল্পধারা যতই উন্নত হোক না কেন, সেটি প্রাচীন লোকায়ত শিল্পধারার ওপর নির্ভরশীল। তাই আবহমান বাংলার লোকজ শিল্প গভীর জীবনব্যদী আমাদের প্রতিটি শিল্পের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায় দেশজ উপাদানের প্রভূত ব্যবহার। যাতে রয়েছে মাটি মানুষ ও দেশের পরিচয়। বাংলাদেশের সাহিত্য, কবিতা, চিত্রশিল্প, ভাস্কর্য, সংগীত, নাচ-গান, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য, লোক ও কারুশিল্প নিজ ভৌগোলিক সীমারেখায় একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ের শিল্প। যা আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থারও ইঙ্গিতবহ।

আমাদের ভূখণ্ডে নানা পালাবদলের ফলে আমরা হারাতে বসেছি নিজ সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা। যার প্রথম সূচনা ঘটে ইংরেজ উপনিবেশ আমলে। কালে কালে নানা গোষ্ঠী আমাদের বহমান ঐতিহ্যময় শিল্পধারাকে থামিয়ে নিজেদের মতবাদ চাপিয়ে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো সভ্যতা গড়তে পারেনি। শুধু দখলীকৃত দেশ থেকে সম্পদ আহরণ করে নিজেদের দেশের উন্নতি সাধন করেছে। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য কালচক্রে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক ক্ষমতাভোগকারী দেশগুলো থেকে জন্মলাভ করেছে ইউরোপীয় বা পশ্চিমা সভ্যতা। যার যাঁতাকলে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি।

আমাদের লোকশিল্প অনেক পুরোনো ও বিস্তৃত। নকশিকাঁথা, লোকচিত্র, পাখা, পাটি, শিকা, খেলনা পুতুল, মাটির ফলক, দারুশিল্প, বাঁশ ও বেতের বেড়া, কলকি, হুক্কা, লোক অলংকার, লোক বাদ্যযন্ত্র, নকশিপিঠা, নকশিসাঁচ, মাছ ধরার উপকরণ, দেয়ালচিত্র, ঘুড়ি, মুখোশ, পিঁড়িসহ নানা কিছু নিয়ে লোকশিল্পের বিস্তৃত জগৎ। অপূর্ব এসব রচনাশৈলী যুগযুগান্তরের উদ্ভাবনী শক্তি ও অভিজ্ঞতার ফসল। একসময় এই শিল্প নিজস্ব চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হলেও কালক্রমে বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়। এভাবেই শিল্পের নিজস্ব ধারার পরিবর্তন ও বিলুপ্তি ঘটতে থাকে।

অন্যদের অভিরুচির কারণে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও অবয়বের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণগত মানের পরিবর্তন হয়। চলে যায় গণ্ডির বাইরে। সৌখিন লোকদের রস পিপাসা মেটাতে গিয়ে লোকশিল্প স্বকীয়তা হারায়। কারুবিপণির দৌরাত্ম্যের ফলে এই শিল্পে নাভিশ্বাস নেমে আসে, শিল্পের ঐতিহ্য নষ্ট হওয়ায় শিল্পীরাও হারিয়ে ফেলে দরদ ও অনুভূতি। যন্ত্রচালিত শিল্পের প্রসার, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আমাদের শিল্পকে চড়া দামে কিনে পাশ্চাত্যে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে আমাদের অতীত। লোকশিল্পের লালনক্ষেত্র আমাদের গ্রামবাংলা, কিন্তু এই গ্রামীণ সমাজ কাঠামোতে ফাটল ধরানো হয়েছে। এক শ্রেণির লোভকাতর মানুষের কারণে লোকশিল্পের স্বাতন্ত্র্য ধারা ব্যাহত হচ্ছে। এসবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের এই ঐতিহ্যে আর কতদিন টিকে থাকবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।



মন্তব্য করুন