বৈশ্বিক প্যান্ডামিক করোনা মোকাবিলা করা খুবই কষ্টসাধ্য, কিন্তু অসম্ভব নয়। কোনো দেশে যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা থাকে, জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা থাকে, তাহলে সে দেশে এ ধরনের প্যান্ডামিক মোকাবিলা করা খুব কঠিন নয়। ইতোমধ্যে এ রকম বেশ কয়েকটি দেশ করোনা মোকাবিলায় ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অবস্থান অনেকটা তলানিতে। বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা মেনে তথা হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, লকডাউন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, মনোবল বাড়ানো, ভ্যাকসিনেশন প্রভৃতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মহামারি মোকাবিলা করা যেতে পারে।

করোনা মোকাবিলায় একটি দেশের লকডাউন একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে জনমনে আছে নানা প্রশ্ন। পৃথিবীর ঘন জনবসতির দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম বৃহৎ দেশ। এ দেশের প্রায় ৩৬ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এত বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে ঘরে আবদ্ধ রাখতে হলে কী প্রয়োজন তা চিন্তা করে লকডাউন দেওয়া উচিত। কার্যকরী লকডাউন করতে হলে সরকারকে জনগণের প্রতি আরও বেশি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

সরকারের কাছে নিশ্চয়ই দেশের খানা সংখ্যা এবং তাদের আয়ের উৎস কী, কতটি খানা বছরের কতদিন ঘর থেকে খায়, এক দিন কাজ না করলে খাওয়া জোটে না এমন খানার সংখ্যা বা কত? এসব তথ্য সরকারের কাছে আছে। অন্যদিকে কোন ব্যবসায়ীর পুঁজি কত, কী ধরনের ব্যবসা করে, কোন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তার কেমন সম্পদ আছে সেটিও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আছে। ফলে আতঙ্কিত বা বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা। কিন্তু কেন এমন লকডাউন? কেন এমন লুকোচুরি- এমন প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে। এতে কি সরকারের অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে ওঠে না? কাজেই করোনা মোকাবিলায় লকডাউন কার ক্ষতি কার লাভ এ নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যায়।

এখন দেখা যাক লকডাউন এবং কঠোর লকডাউনের চিত্র। রেল, বাস, বিমান বন্ধ। ব্যক্তিগত গাড়ি চলছে, রাজধানীর প্রবেশপথে ব্যারিকেড, ভেতরে গলিতে সব চলাচল করছে। রাজধানী ছাড়া অন্য শহরগুলোর চিত্র মেইন রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কিন্তু গলিতে সব চলছে। মুভমেন্ট পাসের নামে চলছে ব্যক্তিগত গাড়ি। শিল্পকারখানা চলছে, শ্রমিকদের যানবাহনের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও অনেক শিল্পকারখানা তা করেনি। শ্রমিকারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং হেঁটে চলাচল করছে। এ চিত্র থেকে লকডাউন আর কঠোর লকডাউনের কার্যকারিতা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

লকডাউন কার্যকরী করতে সমস্যা নেই। কিন্তু ত্রাণের ব্যবস্থা না করে, ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে না দিয়ে, গরিবদের ওপর বীরত্ব দেখিয়ে লাভ কী? মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও সিএনজি চলছে তাতে কোনো সমস্যা নেই। শুধু রিকশাচালকদের ওপরই কঠোর হওয়া যায়! আগে ত্রাণ দিন তারপর লকডাউনের কথা বলুন- এমন কথা শোনা যায় রিকশাচালকের কণ্ঠে। এর পাশাপাশি ঢাকার বস্তি এলাকা বা পথে-ঘাটে লক্ষ্য করলে তার চেয়েও ভয়াবহ চিত্র দেখা যাবে। লকডাউনে কারোর ওপর কঠোরতা আবার কারোর প্রতি নমনীয়তা! সমাজ এবং রাষ্ট্র যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে ধনী আর দরিদ্রের মধ্যে তা কারোরই বুঝতে অসুবিধা হয় না।

তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সরকার ও বিরোধী দলগুলোর আন্তরিক প্রচেষ্টা। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়ানো। মহামারিতে মৃত্যুর মিছিল কমাতে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই।



মন্তব্য করুন