পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ। সে হিসেবে ২৯৪ আসনবিশিষ্ট বিধানসভায় ৬৯ আসন তফসিলিদের জন্য সংরক্ষিত। ১৯৪৭ সালের আগে অবিভক্ত বাংলায় তফসিলি সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে নমঃশূদ্র সমাজ ছিল একক বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। কিন্তু বিভক্ত বাংলায় নমঃশূদ্রদের প্রায় ৯০ শতাংশ পূর্ববঙ্গের অংশে পড়ে যায়। ফলে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতীয় রাজনীতিতে সম্প্রদায়টিকে প্রান্তিক ভূমিকায় চলে যেতে হয়। সাত দশকের অধিককাল ধরে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে ক্রমশ মতুয়ারা রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠছে। বাঙালি উদ্বাস্তু ও মতুয়া- সমাসবদ্ধ শব্দ হিসেবে ব্যবহূত হওয়ার এটা অন্যতম কারণ।

বর্তমানে মতুয়ারা রাজনৈতিক বর্গ হয়ে উঠলেও, ১৯৪৭ ও তার পূর্বাপর সময়ে তফসিলি তথা নমঃশূদ্র পরিচয়ে তারা পরিচিত ছিলে। সে সময়ে এই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে ব্যারিস্টার পি আর ঠাকুর (১৯০২-১৯৯০) ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগ করে কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি তখন ভারতীয় সংবিধান সভার সদস্য থাকায় সর্বভারতীয় তফসিলি রাজনীতি ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পি আর ঠাকুর রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব থাকায় কংগ্রেস আগে থেকেই তাকে গুরুত্ব দিতে থাকে। ব্যারিস্টার ঠাকুরের ঠাকুরদা শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর (১৮৪৬-১৯৩৭) গণশিক্ষা আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়ে নমঃশূদ্র ও অন্যান্য দলিত জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করেন। গুরুচাঁদের পিতা শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২-১৮৭৮) বর্ণবাদের বিপরীতে বহুজনবাদী মতুয়া আন্দোলনকে দাঁড় করান।

ব্যারিস্টার পি আর ঠাকুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মতুয়া মহাসংঘের মাধ্যমে নমঃশূদ্র ও অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়কে সংগঠিত করা। মতুয়া আন্দোলন শুরু হয়েছিল উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে। আন্দোলনটি মূলত বর্ণবাদকে প্রত্যাখ্যান করে নানা জাতে বিভক্ত নিম্নবর্ণের কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করার অভিনব প্রয়াস। কৃষক সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দক্ষিণ বাংলায় মতুয়া আন্দোলনের প্রসার ঘটতে থাকে। হরিপুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের (১৮৪৬-১৯৩৭) নেতৃত্বে কৃষকদের মধ্যে শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। এ পর্যায়ে মতুয়া আন্দোলন কতটা শক্তি অর্জন করেছিল তা বোঝা যায় এ আন্দোলন থেকে উঠে আসা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী পদে পদায়ন থেকে। কিন্তু আন্দোলনটি বড় রকমের একটি ধাক্কা খায় ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক হঠকারিতায়- যার ফলে ওড়াকান্দিকে ঘিরে মতুয়া আন্দোলনের বৃত্তটি পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

ব্যারিস্টার পি আর ঠাকুর প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তবে ১৯৫০ সালের পর থেকে মতুয়া উদ্বাস্তুর স্রোত আছড়ে পড়তে থাকলে তিনি বাস্তবতার মুখোমুখি হন। নিজের উদ্যোগে ভারতে প্রথম বেসরকারি উদ্বাস্তু কলোনী ঠাকুনগর গড়ে তুলতে তিনি কলকাতার বাড়ি বিক্রি করেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন উদ্বাস্তু ক্যাম্পগুলো সফর করেন। পূর্ববঙ্গে সমৃদ্ধ জনপদের মানুষ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে নৈনিতাল থেকে আন্দামান, আসাম থেকে দণ্ডকারণ্য- ১৬৪ ক্যাম্পের এ জীবন ভিটে ছাড়ার বেদনার এক মহাকাব্য বটে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালে এসে ব্যারিস্টার ঠাকুর বুঝতে পারেন কংগ্রেস মতুয়াদের প্রতি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে এবং তিনি স্বেচ্ছায় রাজ্যের মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসেন। এ সময় তাকে কিছুদিন কারাবরণও করতে হয়। এরপর তিনি তার দুই মহান পূর্বসূরি হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মতুয়া মহাসংঘকে শক্তিশালী করতে সর্বাত্মক গুরুত্ব দেন। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসকে হটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলেও মরিচঝাপির উদ্বাস্তু গণহত্যায় পি আর ঠাকুর বিচলিত হয়ে পড়েন এবং মতুয়া আন্দোলন ও উদ্বাস্তু আন্দোলনের ওপর জোর দেন। ১৯৯০ সালে তার প্রয়াণের পর তার স্ত্রী বীণাপানি ঠাকুর মতুয়া মহাসংঘের সংঘাধিপতির পদে আসীন হন।

এ সময় দুটি ঘটনা মতুয়া আন্দোলনকে বেগবান করতে রসদ জোগায়:এক. ২০০৩ সালে অটলবিহারি বাজপেয়ি সরকার সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট পাস করে। তাতে ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাইয়ের পর যারা পূর্ববঙ্গ এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছেন তাদের বৈধ কাগজসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিধান যুক্ত করে। বাঙালি উদ্বাস্তুদের পক্ষে শর্ত পূরণ করা এক প্রকার অসম্ভব বিধায় তারা আন্দোলনে নামেন। ২০০৪ সালে মতুয়াধাম ঠাকুরনগরে অনশনের মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা হয়। অনশনে নেতৃত্ব দেন সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস। দিল্লি থেকে ছুটে আসেন আম্বেদকরের গড়া সংগঠন আরপিআই-এর লোকসভা সদস্য রামদাস আঠাবলে। তিনি অনশনকারীদের অনশন ভঙ্গ করান এবং বীণাপাণি ঠাকুরের বড় ছেলে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস সত্ত্বেও নাগরিকত্ব সমস্যা অধরা থেকে যায়। মতুয়া মহাসংঘের অনুপ্রেরণায় সারা ভারতে গড়ে ওঠে 'নিখিল ভারত বাঙালি উদ্বাস্তু সমন্বয় সমিতি'।

দুই. ঘটনা সময়কাল ২০০৫ সাল। বনগাঁর কাছে হেলেঞ্চাতে মতুয়ারা হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ কলেজ করার উদ্যোগ নেয়। প্রয়োজনীয় জমি ও অর্থ সংগ্রহের পর মতুয়ারা রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করে। রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার কলেজের অনুমোদন দিলেও, কলেজের নাম বদলিয়ে রাখা হয় ড. আম্বেদকর কলেজ। আম্বেদকর সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে মতুয়াদের কাছে শ্রদ্ধেয়। আহত মতুয়ারা বীণাপাণি ঠাকুরের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচনে প্রতিশোধ নিতে সংগঠিত হন। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বনগাঁ ও তার সন্নিহিত বিধানসভার নিশ্চিত আসনগুলোতে বামফ্রন্ট পরাজিত হয়। কারণ আবিস্কার করার পর কিছু পদক্ষেপ নিলেও বামফ্রন্ট আর মতুয়াদের মন জয় করতে পারেনি।

২০১০ সালে মতুয়া মহাসংঘ ও উদ্বাস্তু সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে নাগরিকত্বের দাবিতে কলকাতায় প্রায় পাঁচ লাখ লোকের সমাবেশ হয়। বীণাপাণি ঠাকুর সভায় সভাপতিত্ব করেন। সমসাময়িক কোনো সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মতুয়া মহাসংঘের সদস্য পদ গ্রহণ করেন। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বীণাপাণি ঠাকুরের ছোট ছেলে মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর, ড. উপেন বিশ্বাস (পূর্বভারতের সিবিআই উপপ্রধান), রমেন বিশ্বাস (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নরেন বিশ্বাসের ভাই)-এর মতো উদ্বাস্তু নেতাদের তৃণমূল বিধানসভা নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়। এই নির্বাচনে মতুয়াদের পূর্ণ সমর্থন পেয়ে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় গিয়ে মতুয়া নেতাদের মন্ত্রী বা লোকসভার সদস্য করলেও নাগরিকত্ব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে থাকে।

এ সময় আরেকটি ঘটনা মতুয়াদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ২০১৭ সালের শুরুতে আসামের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দেয় সেখানকার বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকপঞ্জিতে নাম তোলা হবে। আসামে বাঙালি হিন্দুরা ব্যাপক হারে বিজেপিকে ভোট দেয় এবং বিজেপি আসামে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসে বিজেপি বিপরীত আচরণ করতে থাকে। এর প্রতিবাদে আসামের বাঙালি উদ্বাস্তুরা ধেমাজী জেলার শিলাপাথারে ৬ মার্চ প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। 'নিখিল ভারত বাঙালি উদ্বাস্তু সমন্বয় সমিতি'র সর্বভারতীয় সভাপতি ডা. সুবোধ বিশ্বাসসহ অনেকে সে সভায় যোগ দেন। কিন্তু স্থানীয় সংগঠন আসু নিজেদের অফিস ভাঙচুর করে এবং জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দায় চাপায় বাঙালিদের ওপর। মামলায় ডা. সুবোধ বিশ্বাসসহ ৫৬ জন বাঙালি উদ্বাস্তু নেতা গ্রেপ্তার হন। তাদের এক প্রকার বিনা বিচারে ১৯ মাস হাজতবাস করতে হয়।

এ সময় বীণাপাণি ঠাকুর প্রয়াত হওয়ায় এবং মতুয়া মহাসংঘ দ্বিধাবিভক্ত থাকায় জোরালো কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তবে বিজেপি মতুয়াদের ক্ষোভকে পূঁজি করে ঠাকুরনগরে আগেই যোগাযোগ শুরু করেছিল এবং তাদের নাগরিকত্বের দাবি পূরণে আশ্বাস দেয়। মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরের নেতৃত্বাধীন মতুয়া মহাসংঘ বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয় এবং তার ছোট ছেলে শান্তনু ঠাকুরকে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বনগাঁ আসনে বিজেপি মনোনয়ন দেয়। তৃণমূলের মনোনয়ন পান বনগাঁর তখনকার লোকসভা সদস্য ও শান্তনু ঠাকুরের জ্যাঠিমা মমতা ঠাকুর। নির্বাচনে বনগাঁ ও পার্শ্ববর্তী রানাঘাট আসনে বিজেপি জয়লাভ করে এবং যার ফলে সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-২০১৯ পাস হয়।

তবে ২০১৯ সালের আইনে বাঙালি উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব পাবার বিষয়টিতে জটিলতা থেকেই যায়। তাছাড়া প্রয়োজনীয় রুলস জারি না করায় পুরো বিষয়টি এখনও ঝুলে আছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে তফসিলিদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৬৯টি। এছাড়াও অন্যান্য আসনে তফসিলি তথা মতুয়াদের কম-বেশি ভোট রয়েছে। বিজেপি বুঝতে পারে মমতা ঠাকুরের নেতৃত্বে মতুয়া মহাসংঘের একটি অংশ তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছে এবং তিনি 'মতুয়া উন্নয়ন পর্ষদ'-এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় করার পদক্ষেপ নিয়েছে ও হরিচাঁদের জন্মতিথিতে ছুটি ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে মতুয়াদের মধ্যে দলিত চেতনা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং ১৯৯০ দশক থেকে বাঙালি দলিত সাহিত্য আন্দোলন চলে আসছে। নির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্য সরকার 'পশ্চিমবঙ্গ দলিত সাহিত্য একাডেমি' প্রতিষ্ঠা করেছে। চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন ব্যাপারীসহ যার বেশ কয়েকজন সদস্য মতুয়া। দলিত সাহিত্য আন্দোলন ও নাগরিকত্ব আন্দোলনের মুখ কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর, শরদিন্দু উদ্দীপন, সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাসের মতো অনেকে বামপন্থি ও বহুজনবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ রকম পরিস্থিতিতে একচেটিয়া মতুয়া ভোট পাওয়া এক প্রকার অসম্ভব। সে অসম্ভবকে সম্ভব করতে এবং মতুয়াদের আবেগকে কাজে লাগাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মতুয়া আদর্শের পবিত্র তীর্থ শ্রীধাম ওড়াকান্দি (বাংলাদেশ) এসে শ্রীশ্রী হরি মন্দিরে পূজা দেন।

আগামী ২ মে ভোট গণনার মাধ্যমে বোঝা যাবে মতুয়ারা কতটা বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। তবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে নাগরিকত্বের প্রশ্নে মতুয়া আন্দোলন আরও মোচড়ের অপেক্ষা করছে।

মন্তব্য করুন