করোনাকালে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনগুলো সম্পর্কে কিছু কথা যোগ করতে চাই। প্রজ্ঞাপনটি কে জারি করেছেন বা কোন দপ্তর থেকে জারি করা হয়েছে সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রজ্ঞাপনে কী বলা হয়েছে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ২৯ মার্চ ২০২১ তারিখে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্তে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। উক্ত প্রজ্ঞাপনে ১৮টি অনুচ্ছেদ আছে। উক্ত প্রজ্ঞাপনের (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠান সীমিত করতে হবে। সীমিত কথাটি অন্তসারশূন্য। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে দুই হাজার লোকের সমাগম হলে আয়োজনকারীর কাছে ব্যাখা চাইলে বলা যায়, চার হাজারের স্থলে সীমিত করে দুই হাজার করা হয়েছে। আরও অনেক নির্দেশনা আছে, যা অন্তসারশূন্য। প্রজ্ঞাপন, আইন, বিধি এবং নীতিকথা এক নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একাকার করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনের বাকি অনুচ্ছেদগুলো সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। সুতরাং প্রজ্ঞাপন নীতি কথার শামিল হয়ে মূলহীন হয়ে পড়েছে। উক্ত প্রজ্ঞাপনের ২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আপাতত দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। কিন্তু দুই সপ্তাহ নয়, মাত্র ৩-৪ দিন পরেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৪-৪-২০২১ থেকে ১২-৪-২০২১ তারিখ পর্যন্ত ৪টি বা ততোধিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে এবং দুই সপ্তাহ বলবৎ প্রজ্ঞাপনকে রহিত করা হয়েছে। এত বেশি বেশি প্রজ্ঞাপন জারি করায় মনে হয় যেন করোনাভাইরাসের রূপ বদলকে হার মানিয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ১২-৪-২০২১ তারিখের প্রজ্ঞাপনের (জ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে উন্মুক্ত স্থানে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। বাজার কর্তৃপক্ষ/স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে। উন্মুক্ত স্থানে কাঁচাবাজারে যাতায়াত সবার জন্য উন্মুক্ত। সুতরাং মুভমেন্ট পাস সংগ্রহ করার কোনো উপায় নেই। কাঁচাবাজারের নিত্যদিনের জনসমাগম এড়ানোর জন্য লকডাউনের দু'দিন আগে ঘোষণা দিলে সংশ্নিষ্টরা অন্তত ১৫ দিনের জন্য কাঁচাবাজার করে রাখতে পারে এবং তারপর সপ্তাহে দু'দিন খোলা থাকার ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে। উন্মুক্ত বাজারে সবার যাওয়ার আইনানুগ অনুমোদন থাকায় রাস্তায় ভিড় কমার কোনো উপায় নেই। ঢিলেঢালা লকডাউনে রাস্তায় মানুষের ঢল। অনেকেই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, রোগী বাড়লে সামাল দেওয়া অসম্ভব। বলা যেতে পারে- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, ওষুধ ক্রয়, কাঁচাবাজার, শিল্প-কারখানা প্রভৃতি বন্ধ থাকলে জনদুর্ভোগ বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন, সবার আগে মানুষের জীবন। এ জন্য অনেক দেশে দীর্ঘদিনের জন্য কারফিউ পর্যন্ত জারি করা হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় অকার্যকর লকডাউনের পরিবর্তে কার্যকর লকডাউন দেওয়া যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮ (২০১৮ নম্বর ৬১নং আইন) সম্পর্কে কিছু আলোচনা প্রয়োজন। পূর্বেকার ৪টি আইনকে একত্র করে এ গুরুত্বপূর্ণ আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। (ক) আইনটি প্রণয়নের সময় করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯ ছিল না। তাই এই আইনে উল্লিখিত মহামারি রোগগুলোর তালিকায় ৪ (ব) ধারার চিকনগুনিয়ার পরে ৪ (ভ) ধারায় করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯ সংযুক্ত করে ৪(ভ)-এর পর ৪(ম) ধারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে। কারণ মহামারি আইনে করোনা উল্লেখ না থাকলে এই আইনে শাস্তি দেওয়া সম্ভব নয়। এই আইনে শাস্তি দিলেও এ আইনে করোনা বা কভিড-১৯ উল্লেখ না থাকায় আপিলে শাস্তি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। (খ) এ আইনের ২৪(১) ধারায় সংক্রামক রোগের বিস্তারের শাস্তি অনূর্ধ্ব ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ড। বিষয়টি না জানার কারণে সম্ভবত এক লাখ টাকার স্থলে ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে বা হচ্ছে। এ আইনের ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের অধীনে কোনো দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান করলে শাস্তি অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ড। আইন অমান্য করলে যে শাস্তি, আইন প্রয়োগে বাধার সৃষ্টি করলে তার চেয়ে বেশি বা অন্তত সমপরিমাণ শাস্তি হইয়া উচিত। আইনের এ ধারাটি সংশোধন করে শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।

এই মহামারি আইনের ২৪(১) এবং ২৫(১) ধারা অনুযায়ী, শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনটি বহুল প্রচারের জন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট/আইন কার্যকরী করার কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে তার পূর্বে আইনটি ইতোমধ্যে সংশোধিত না হয়ে থাকলে অর্ডিন্যান্স জারি করে মহামারির তালিকায় করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯ সংযুক্ত করা প্রয়োজন। এ আইনের ৩২ ধারায় এ আইনের অধীনে বিধি প্রণয়নের কথা বলা আছে। ইতোমধ্যে বিধি প্রণীত না হয়ে থাকলে জরুরি ভিত্তিতে বিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে।

মন্তব্য করুন