কভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত করেছে, বেশিরভাগ শিশুকে সাময়িকভাবে স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। করোনার কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রায় ১৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অনলাইনে ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতির পাঠদান চলছে। 

অভ্যন্তরীণভাবে অনলাইনে কিছু স্কুল-কলেজের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে করেও শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্দেশ্য পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না। কারণ সবার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের সমান সুযোগ নেই। কিছু কিছু এলাকায় ইন্টারনেটের গতিও অনলাইন ক্লাস উপযোগী নয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। দফায় দফায় পিছিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ। সব মিলে পৌনে ৪ কোটি ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গত বছরের মার্চে দেশে যখন মহামারির প্রথম তরঙ্গ প্রবাহিত হয়েছিল, তখন শিশুদের রক্ষার জন্য সরকারের প্রথম কাজ ছিল স্কুল বন্ধ করে দেওয়া। ফলে গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ বছর ৩০ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ঘোষণা ছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ছুটি ২২ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের জন্য অনলাইনে ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে বিকল্প পাঠদান পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব শিক্ষার্থীর কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না।

গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণে অংশ নিয়েছে। ব্র্যাকের সমীক্ষা মতে, টেলিভিশন পাঠদানে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ অন্তত অর্ধেক শিক্ষার্থীই দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের বাইরে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণের অধীনে এসেছে। আর স্কুল শিক্ষকদের মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ৮৫ শতাংশকে লেখাপড়ার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।

দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের দেশের সব শিক্ষার্থীর শিক্ষার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নেই। এর অর্থ তীব্র দারিদ্র্যের জন্য শিক্ষা এবং সাক্ষরতা অর্জনের স্তরগুলো খুব কম হতে পারে। এদিকে করোনা ভাইরাসজনিত কারণে বাল্যবিয়ে বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে দূরে সরে অভিভাবকদের সঙ্গে অনেকেই ইতোমধ্যে কাজে যোগদান করেছে। তাদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনা কতখানি সম্ভব হবে বলা মুশকিল।

অন্যদিকে করোনায় আরেক বড় ক্ষতি হয়েছে উচ্চশিক্ষার। করোনা শুরুর কিছুদিন পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রথমে অনলাইনে ক্লাস এবং পরে পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সংক্রমণ কমার পর গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনার্স শেষ বর্ষ/সেমিস্টার এবং মাস্টার্সের পরীক্ষাও নেয়। কিন্তু অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি বাতিলের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝপথে বিভিন্ন সেমিস্টারের পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। আর আগের সেমিস্টারের পরীক্ষা নিতে না পারায় এখন অনলাইনে পরবর্তী সেমিস্টারের ক্লাসও স্থগিত আছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতেও শত শত পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে করোনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক থেকে দেড় বছরের সেশনজট তৈরি হয়েছে। আর প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই বন্ধ আছে গবেষণা কার্যক্রম।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, করোনায় শিক্ষার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং সুদূরপ্রসারী। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরাও বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষক এবং স্টাফরা বেশ নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে জীবন পার করছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, কেবল শেষ অবলম্বন হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়া উচিত ছিল। তবুও প্রায় সব দেশই করোনার বিস্তার রোধে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও অন্য সব ক্রিয়াকলাপ যথারীতি থেকে যায়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে শিশু এবং যুবসমাজের সংক্রমিত হওয়ার হার কম, এমনকি এটি এতটা গুরুতর হয় না যে, মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়তে হয়। তাই বিকল্প উপায়ে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে সুচিন্তিত পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে মফস্বলের স্কুল-কলেজ যেখানে খোলা জায়গায় ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা আছে, সেখানে খুলে দেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে।

মন্তব্য করুন