'প্রত্যেকটি ক্রিয়ার একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।' নিউটনের গতি সূত্রের তৃতীয় সূত্রটি সবার ভালোভাবে জানা থাকলেও প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্রদ্বয় এত বেশি আলোচিত নয়। ১৬৬৭ সালে এই সূত্রটি প্রকাশের পর থেকে এখন পর্যন্ত মানুষ নানাবিধ ঘটনাবলিকে তৃতীয় সূত্রের আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে থাকেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্রমাণিত হয়। 

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত হেফাজত ইসলামের 'বিশাল সমাবেশ' প্রতিক্রিয়াটি তার মাত্র তিন মাস আগে (২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি) ঘটে যাওয়া শাহবাগ চত্বরে সংঘটিত অভূতপূর্ব 'গণজাগরণ ক্রিয়ার'ই আলোচিত তৃতীয় সূত্রের অনিবার্য ফল কিনা তা আমি নিশ্চিত করে বলতে চাই না। তবে তা যদি তৃতীয় সূত্রের অনিবার্য ফল হয়, তাহলে প্রশ্ন হতে পারে- 'শাহবাগ চত্বর' ক্রিয়াটির উৎস ক্রিয়া কী ছিল? খুব সহজ উত্তরটি হলো, আব্দুল কাদের মোল্লাকে আদালত কর্তৃক ফাঁসির আদেশ না দেওয়ায় ফুঁসে ওঠা শাহবাগ চত্বরে স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে লাখো জনতার 'মহাশান্তিপূর্ণ অবস্থান'। এখন প্রশ্ন হতে পারে এই 'মহাশান্তিপূর্ণ অবস্থান' ক্রিয়ারই বা উৎস ক্রিয়া কী ছিল? হ্যাঁ, সে উত্তর খুঁজে পেতে বেশ খানিক পেছনে ফিরে যেতে হবে।

বাংলাদেশের অনেকের সুপরিচিত মুখ ইমরান এইচ সরকার। যদিও এই 'সরকার'কে আমরা আগে কোনো সরকারের আমলে চোখে দেখিনি বা নামটিও শুনিনি। কারণ তার গুটিকয়েক ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব ছাড়া আমজনতা কেউ তাকে কখনও সেভাবে চিনত না বা চেনার মতো বয়স কিংবা অবস্থান কোনোটি তার ছিল না। তিনি শুধু নিউটনের তৃতীয় নয়, প্রথম সূত্রের ধারাবাহিক বলবাহক (আমার ভাষায় ফলবাহক) মাত্র। 'কোনো বস্তুতে বল প্রয়োগ না করা পর্যন্ত তা স্থির থাকে এবং গতিশীল কোনো বস্তুকে বল প্রয়োগ না করা পর্যন্ত তা সমান গতিতে চলমান থাকে'- এটিই হলো নিউটনের গতির প্রথম সূত্র। ইমরান সে রকমই একজন 'বস্তু' (ব্যক্তি) ছিলেন, যাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে সচল করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, ইমরান সরকার গতি সূত্রের প্রথম সূত্রানুযায়ী তাহলে কোন বলে বা শক্তিতে বলীয়ান বা গতিশীল হয়েছিলেন? জি, তা জানার জন্য আমাদের আরও খানিকটা পেছনে ফিরে যেতে হবে। গোলাম আযম ১৯৯১ সালের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির নিযুক্ত হয়েছিলেন। আমির নিযুক্ত হওয়ার পরে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিলের এবং সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট প্রগতিমনা প্রায় ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। এই নির্মূল কমিটি কর্তৃক মনোনীত গণআদালতের ১২ জন বিচারক ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ জন যুদ্ধাপরাধীর প্রতীকী ফাঁসির রায় প্রদান করেন। এ বিষয়টি আমাদের সবার জানা আছে।

এখানে যে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসেই তিনি স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য জনভিত্তিমূলক এবং জননন্দিত সব রাজনৈতিক কর্মসূচি একের পর এক ঘোষণা করতে থাকেন। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কর্মসূচি ছিল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠনের মাধ্যমে সব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে স্বাধীনতার সপক্ষের সব শক্তিকে একমঞ্চে নিয়ে আসা এবং রাজাকারদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো। সেই সুমহান উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে আন্দোলনের বাঁকে বাঁকে কখনও জাহানারা ইমাম, কখনও হাসান ইমাম প্রমুখদের তিনি উজ্জীবনী শক্তি বা নিউটনের প্রথম গতি সূত্রের সেই 'বল' (উৎসাহ, উদ্দীপনা, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ) সঞ্চারণের মাধ্যমে ঘাতক দালালদের রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং ধাপে ধাপে সফল হয়েছেন। শেখ হাসিনা যে এ ক্ষেত্রে একজন নিখুঁত দেশপ্রেমিক এবং পরে সুদক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন তাই কেবল নয়, নিউটনের প্রথম সূত্রের 'বল' (জনতার শক্তিকে সংগঠিত করে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে) প্রয়োগের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে রুখে দিয়েছেন, যা আজ দিবালোকের মতো সত্য।

যা হোক, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ইমরান এইচ সরকারের হাতে সেই গৌরবান্বিত 'বল'টি এসে পড়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো- সেই মর্যাদা তিনি কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছেন? সাম্প্রতিক হেফাজতের দ্বিতীয় লন্ডভন্ড করার মহাষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে সেই ইমরান এইচ সরকার এখন মৃত না জীবিত? আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, জীবিত থেকেও তিনি মৃত। ইমরান অজানা কোনো এক ভুলের খেয়ালে অথবা অন্য কোনো মোহাবিষ্ট হয়ে চোরাবালির দিকেই হাঁটছেন। কারণ ইতোমধ্যে ইমরান এইচ সরকারকে নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। এই সংশয় থেকেই হয়তো ইমরান এইচ সরকার আবার ২০১৩ সালের আগের সেই অচেনা একজন বালকে পরিণত হয়ে যেতে পারেন, ইতিহাসে এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু রাজাকার নিধনের সেই প্রক্রিয়া ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চলতেই থাকবে। সেই প্রক্রিয়ায় ইমরান এইচ সরকাররা হয়তো থাকবেন না, থাকবেন একজন শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দেশপ্রেমিক জনগণ।

তবে এহেন পরিস্থিতিতে প্রেস ক্লাব এবং টকশোকেন্দ্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের ভূমিকাও যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে হঠাৎ করে বার্ধক্যের মতো চরম দৈন্যদশায় পরিণত হয়েছে। বিষয়টা এমন যে, কাছে থেকে দূরে দূরে সেই মৌলবাদের বা হেফাজতের বিভিন্ন কর্মসূচিকে সমর্থন দিচ্ছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে উগ্র মৌলবাদীদের সঙ্গে বামেরাও শুধু যে হাত মিলিয়েছেন, তা নয়; সরকার বিরোধিতার আগুনকে আরও উস্কে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। কথাগুলো এজন্য বলা যে, একসময় গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে যেমন তৃতীয় সূত্রের অনিবার্যতায় মৌলবাদীরা একত্রিত হয়ে ফুঁসে উঠেছিল। কিন্তু এখন ঠিক তার বিপরীত প্রক্রিয়ায় হেফাজতের সাম্প্রতিক আস্টম্ফালন বা মৌলবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে আমাদের প্রগতিরা জ্বলে উঠল না। তারাও কেন জানি সরকারবিরোধী এমন এক হেফাজত খুঁজছে, যেখানে আড়ালে তার জামায়াত হাসে, বিএনপি তার নাগপাশে। যদি তাই হয়, তাহলে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতেরা ভুলে না যাওয়া অতীতের প্রতিশোধ নেওয়ার উন্মত্তায় শুধুই স্বাচ্ছন্দ্যের ভেংচি কেটেই ক্ষান্ত হবে না, অক্ষরে অক্ষরে বদলা নিতে তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। অতএব, নতুন শাপলা চত্বরের পুনরুত্থান ঠেকাতে মুক্তিযুদ্ধের সমমনা রাজনৈতিক দল এবং দেশপ্রেমিক জনগণের আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প আর আছে কি?


মন্তব্য করুন