করোনাকাল চলছে বছর দেড়েকের মতো। যদিও অর্থবছরের হিসাবে করোনা তৃতীয়তম বছরের দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশে করোনারোগী শনাক্ত হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের ২০১৯ এর মার্চ মাসের ৮ তারিখে। এরপর থেকে করোনার দাপট চলছে। মাঝখানে কিছুটা কমলেও ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে দেশে করোনার তাণ্ডব বেড়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় নতুন নতুন রেকর্ডের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে এই এপ্রিলে আবারও কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণা দিতে হয়েছে। মানুষের চলাচলে, যানবাহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রাখার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ দিয়ে দফায় দফায় প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে-জীবন বাঁচাতে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। যদিও নানা বাস্তবতায় ঘোষিত বিধিনিষেধে ইতোমধ্যে কিছু শৈথিল্য আনা হয়েছে, হয়তো আরো শৈথিল্যের ঘোষণাও আসছে। করোনায় জীবন-জীবিকার যুদ্ধে এটুকু বলা যায়, দেশের সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে।

নতুন অর্থবছর ২০২১-২২ শুরু হবে যথারীতি জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে। অলৌকিক কিছু না ঘটলে করোনাকাল তৃতীয় অর্থবছরেও প্রবেশের অপেক্ষায়।

স্বাভাবিকভাবেই ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রায় শেষ পর্যায়ে, উপস্থাপন হবে সম্ভবত ৩ জুন ২০২১। জাতীয় বাজেট উপস্থাপন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি প্রথা অনুযায়ী জুন মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। দেশের অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বাজেট, করোনার সার্বিক অভিঘাত, অর্থনীতি প্রসঙ্গে মতামত দিচ্ছেন।

গত ১৯ এপ্রিল দৈনিক বণিক বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাতের একটি নিবন্ধে তিনি ‘বৈষম্যহীন শোভন সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র’ এর একটি ধারণা দিয়েছেন ও বাজেট নিয়ে তার প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। নিবন্ধের একটি অংশে তিনি বলেছেন—দেশে সুপার ধনী আছেন ১%। দরিদ্রদেরও কয়েকটি ভাগ তিনি দেখিয়েছেন, সেগুলো হলো ‘নিরঙ্কুশ দরিদ্র’-‘আলট্রা হতদরিদ্র’-‘চরম দরিদ্র’ ও ‘নবদরিদ্র’।

তাছাড়া, ১৮ এপ্রিল ‘পিপিআরসি’ ও ‘বিআইজিডে’ যৌথভাবে গবেষণায় জানিয়েছে, দেশে নতুন করে ২ কোটি ৪৫ লাখ লোক দরিদ্র হয়েছে।

‘সানেম’ জানুয়ারিতেই বলেছে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে, পূর্বে যা ছিল ২২ শতাংশের মতো। অর্থাৎ দরিদ্র মানুষ যুক্ত হয়েছে আরও ২০ শতাংশ।

দেশের মোট জনসংখ্যা ন্যুনতম ১৭ কোটি ধরলেও এসব তথ্যানুযায়ী দেশে এখন দরিদ্র মানুষের অনুমিত সংখ্যা ৭ কোটির আশেপাশে। সানেমসহ ‘বিআইডিএস’-‘সিপিডি’-‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-‘পিআরআই’ এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফল প্রায় কাছাকাছি। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে ৪ জন দরিদ্র, যাদের আয় দৈনিক ২ ডলারেরও কম বা অনেকেরই কোনোরূপ আয় নেই।

এছাড়াও ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ নামক একটি এনজিও জানাচ্ছে, করোনায় ৬৬ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে, ৩৭ শতাংশ মানুষ নানান উৎস থেকে ঋণ নিয়ে জীবন নির্বাহ করছে, দেশের মানুষ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছে।

‘বিআইডিএস’ ও সুইডেনভিত্তিক ‘ডব্লিউআইএফ’ যৌথভাবে দেখিয়েছে ৮০ শতাংশ মানুষের মজুরি কমে গেছে। ‘এশিয়া ফাউন্ডেশন’ এর গবেষণা অনুযায়ী ৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা করোনায় ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

‘এসডিজি অর্জনে নাগরিক প্লাটফর্ম’ বলছে- এই করোনায় ৬০ শতাংশ পরিবার সব রকম ব্যয় সংকুচিত করেও দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ‘সিপিডি’র হিসাবে ৫৪ শতাংশ গৃহকর্মী কাজ হারিয়েছেন ও ১৯ শতাংশ পোষাকশিল্প খাতের মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। ভিন্ন একটি গবেষণা আরও দেখিয়েছে, পোষাকশিল্প শ্রমিকদের একটি অংশের কাজ থাকলেও মজুরি কমে যাওয়ায় তাদেরকে ধার-দেনা করে জীবন চালাতে হচ্ছে।

‘পিপিআরসি-বিআইজেডি’ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী করোনার প্রথম দফার অভিঘাতেই শহর ছেড়ে ২৭.৫ শতাংশ মানুষ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এরমধ্যে ৯.৩ শতাংশ মানুষ আর শহরে ফিরে আসেনি। অর্থাৎ এই ৯.৩ শতাংশ মানুষের শহরে বসবাসের জন্য আর উপার্জন সক্ষমতা তৈরি হয়নি।

আরেকটি সমীক্ষা বলছে—করোনায় বিদেশফেরতদের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ দেশে আর কোন কাজের সংস্থান করতে পারেননি।

আমাদের ক্রমবর্ধনশীল প্রবৃদ্ধির ছন্দপতন হয়েছে করোনায়। ৯ মাস আগে ‘বিবিএস’ প্রদত্ত ৫.২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক হিসাব এখন এসে সংশোধন হচ্ছে, যা ৪ শতাংশের কিছু কমবেশি হতে পারে। যদিও মূল বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরা ছিল ৮.২ শতাংশ। জানা গেছে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে ৭.৪ শতাংশ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনাকালে আমাদের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে শুধু প্রবাসী আয়ে— যা ১৫ বা ১৬ শতাংশ। কিন্তু এসময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১৬.৮ শতাংশ, আমদানি প্রসূত আয় কমেছে ১২ শতাংশ। বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান হয়নি বলা চলে। অর্থাৎ করোনায় আমাদের আমদানি-রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ ভোগ, বিনিয়োগ সবই নেতিবাচক।

২০১৯ এর সেপ্টেম্বর থেকেই আমাদের অর্থনীতি মন্দা কবলিত। করোনার কারণে এটি আর ঘুরে দাঁড়াতেই পারেনি। দ্বিতীয় দফা করোনার আঘাতে অবস্থা আরও নাজুক হবে- এটিই বাস্তবতা।

বছর বছর আমাদের বাজেটের আকার বাড়ছে। ২০২০-২১ এ ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা টাকা, ২০২১-২২ এ হতে যাচ্ছে ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রাও চলতিবছরের ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে বেড়ে ২০২১-২২ এর জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ধার্য্য করা হচ্ছে। এডিপি বরাদ্দও কিছু বাড়ছে। কিন্তু আমাদের ঘাটতি বাজেট নতুন অর্থবছরের জন্য দাঁড়াবে ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি, ২০২১-২২ এ যা ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ঘাটতি বাজেট সংকুলানের উৎস ধরা হয় ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র ও বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তি থেকে। যেটি সবসময়ই আপেক্ষিক।

বাজেটের আকার ও অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও বাস্তবায়ন হার কমছেই। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাস্তবায়ন ছিল ৮০ শতাংশ, আর চলতি বছরের বিগত ৯ মাসে বাস্তবায়ন মাত্র ৩৩ শতাংশ। এদিকে আমাদের সরকার পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে—একবছরেই বৃদ্ধি ১৯ শতাংশ। আমাদের ঋণের সুদ বাবদ বাৎসরিক ব্যয় বেড়েছে, যা ছিল অনধিক ১৮ শতাংশ-সেটি বেড়ে হয়েছে ২৮ শতাংশ। প্রতিবছরেই রাজস্ব আয় প্রাক্কলন অনুসারে আহরণ করা যায় না। সুপার ধনী, ধনী ও বিভিন্নভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত প্রভাবশালীদের কাছ থেকে উপযুক্ত কর আদায় করা যাচ্ছে না। কর আদায়ের বড় অংশই আসে ‘সিএমএসএমই’ খাত ও সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে।

কর্মসংস্থান তথা শ্রমবাজারের ৮৬ শতাংশ যোগানদাতাই ‘সিএমএসএমই’ বা ‘কুটির, ক্ষুদ্র,ছোট, মাঝারি,শিল্প’ খাত। যেটি মূলত: অনানুষ্ঠানিক খাত। করোনা অভিঘাতে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত বেশি। ফলে মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়াটা বাস্তবিক কার্যকারণপ্রসূত। যে কোন মন্দায় ও এরুপ চলমান মহামারিতে ‘সিএমএসএমই’ খাত ক্ষতির তুলনায় ঋণ বা অন্য কোনোরূপ পৃষ্ঠপোষকতা থেকেও বঞ্চিত হয় বেশি।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প শ্রেণীর জন্য ৬৪ বছর আগে গঠিত ‘বিসিক’ থেকে ইতোমধ্যে ক্ষুদ্র-কুটিররা বড়দের চাপে উধাও হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এমন আরও অসংখ্য উদাহরণ এক্ষেত্রে দেয়া যাবে।

করোনাকালের বিভিন্ন সুবিধাদির বেলায়ও বড়রাই উপকৃত হয়েছেন, ছোটরা হয়েছেন বঞ্চিত। বড়রা ঋণপ্রাপ্তিসহ নানাবিধ সুবিধার বড় অংশের ভোগ অব্যাহত রেখেছেন। এমন দুঃসময়ে বড়রা ঋণ বা আর্থিক সুবিধা পেয়ে বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান করেন না, বরং নিজেরা ভোগমুখী হন বেশি। এর ফলে সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা কোনোভাবেই উপকৃত হন না।

দেশের ধন-সম্পদের বড় অংশই সুপার ধনী ও ধনীদের করায়ত্বে। অথচ দেশের কর্মসংস্থান, কর প্রদান , জিডিপি প্রবৃদ্ধির সামস্টিক অবদান ‘সিএমএসএমই’ খাত ও কৃষি খাতের অনেক বেশি।

উপরের গবেষণাগুলোর দেয়া তথ্য, জরিপ ও পরিসংখ্যানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু তারতম্য থাকলেও এটি স্পষ্ট যে আমাদের বাজেট, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য নীতি-কৌশল ও বিদ্যমান কাঠামোর কারণেই ধনী-সুপার ধনী হচ্ছে — ধনী বাড়ছে। দরিদ্র, সেটি করোনায় সৃষ্ট ‘নবদরিদ্র’ই হোক আর বিদ্যমান যে কোন প্রকার দরিদ্রই হোক—সেটিও কেবলই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ অবস্থা নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ দরকার। সব প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শোনা যাচ্ছে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ও সার্বিক অবস্থা নিরুপনে কাজ চলছে। এটি খুবই জরুরি। দরিদ্র ও দারিদ্রের স্বরুপের প্রকৃত তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছে থাকলে এবং উপযুক্ত নীতি-কৌশল প্রণীত হয়ে প্রদেয় সুবিধাদির বণ্টন-ব্যবস্থাপনা দায়ীত্বশীলভাবে করা গেলে এর ইতিবাচক প্রতিফলন আসবেই।

এসবের জন্য বড় ভূমিকা থাকে জাতীয় বাজেটের। করোনাসহ বৈশ্বিক প্রতিকূলতা ও দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় ২০২১-২২ এর বাজেটে এডিপির আকার ছোট করা যেতে পারে। কৃষি, সিএমএসএমই খাত, সামাজিক সুরক্ষা খাত, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, অগ্রাধিকার প্রকল্প ও সরকার পরিচালনায় প্রয়োজনীয় খরচের খাত বাজেটে বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। মৌলিক সেবাখাত ছাড়া অন্য যে কোন খাতে ভর্তুকি বন্ধে স্থায়ী নীতি-প্রবিধান প্রয়োজন।

আমাদের ধনী বৃদ্ধি আর নবদরিদ্র সৃষ্টি দু’টোই আমাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংকট। মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশ্ব বা স্থানীয় মন্দায় এসবের চিত্র আরও প্রকট হয়-সাধারণ মানুষের দুর্দশা বহুগুণ বেড়ে যায়। আমরা এখন সেটির কবলে। অদূর ভবিষ্যতে সেগুলো থেকে উত্তরণ মোটেও সহজ নয়।

তবু প্রত্যাশা— অত্যাবশকীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, নীতি-কৌশল-প্রবিধি প্রণয়ন ও দায়ীত্বশীল প্রায়োগিক দক্ষতায় শোভনীয় একটা সমাজ বিনির্মাণের পথরেখা তৈরি ও মানুষের দুর্দশা লাঘবের আলোকচিহ্ন দৃশ্যমান হবে হয়তো।

মন্তব্য করুন