চলতি বছরের ৬ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ হবে। প্রায় চার বছর ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এবং তার প্রশাসনের অনিয়ম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ লঙ্ঘন, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা চরম নিম্নমানে নামিয়ে স্বজনপ্রীতি/নিয়োগ-বাণিজ্যের মাধ্যমে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষতিসাধন, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী শিক্ষকদের অত্যাচার, নিজ পছন্দনীয় শিক্ষকদের অনিয়ম প্রশ্রয় এবং সাম্প্রতিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর খননের শত শত ট্রাক মাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে ইটভাটায় বিক্রি ইত্যাদি কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ২০১৭-২১ সালের মেয়াদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ বছরের ইতিহাসে নিন্দনীয় অধ্যায় হিসেবে থাকবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অন্যায়-অপকর্মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোপূর্বে সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি গঠন করে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সত্যতা পেয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম দূর করাসহ শিক্ষা ও গবেষণার মান সুরক্ষার স্বার্থে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর ও ১৩ ডিসেম্বর কিছু নির্দেশনা দেন এবং কিছু বিষয়ে কৈফিয়ত তলব করেন।

উল্লেখযোগ্য নির্দেশনাগুলো হলো- ১. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নিয়োগ কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিতকরণ; ২. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের নিয়োগ নীতিমালা বাতিল করে ১৯৭৩-এর আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন; ৩. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক নিয়মবহির্ভূতভাবে দখলে রাখা ডুপ্লেপ বাড়ির ভাড়া ৫,৬১,৬০০ (পাঁচ লাখ একষট্টি হাজার ছয়শ) টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চালানের কপি জরুরিভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট বিভাগে প্রেরণ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নিয়োগ কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত থাকলেও, আমার জানা মতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের নিয়োগ নীতিমালা বাতিল করে ১৯৭৩-এর আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ আজ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি।

শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নত করার পূর্বশর্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক উন্নতমানের শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা। সেই লক্ষ্যে প্রায় আড়াই বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ২০১৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে 'শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা' অনুমোদিত হয়, যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ নামে পরিচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫-এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল, অনার্স ও মাস্টার্সে নূ্যনতম সিজিপিএ ৩ দশমিক ৫ প্রাপ্তদের মধ্যে শুধু প্রথম থেকে সপ্তম স্থান অধিকারীরা আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু ২০১৭ সালের ৭ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর, একই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ ব্যাপকভাবে শিথিল করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৭ প্রণয়ন করেন। কারণ হিসেবে বর্তমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে, দুই-একটি বিভাগ ও ২০১৭ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ শিথিল করতে অনুরোধ করেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের তিনটি শিক্ষক সমিতি শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ প্রণয়নে আন্তরিক ভূমিকা রেখেছিল এবং ২০১৬ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ পরিবর্তনের কোনো দাবি করেনি, বরং সমর্থন করেছে। ২০১৭ সালে শিথিল করা শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় সব অনুষদের ক্ষেত্রে প্রথম থেকে সপ্তম স্থান অধিকারীদের আবেদনের যোগ্যতাটি শিথিল করা হয়।

২০১৭ সালের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় অন্যান্য অনুষদের (বিজ্ঞান অনুষদ, জীব ও ভূবিজ্ঞান অনুষদ, কৃষি অনুষদ এবং প্রকৌশল অনুষদ) আবেদনের নূ্যনতম সিজিপিএ ঠিক রেখে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ, আইন অনুষদ, কলা অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও চারুকলা অনুষদের আবেদনের যোগ্যতা সিজিপিএ ৩ দশমিক ৫-এর নিচে নামিয়ে আনা হয়। এমনকি, কিছু অনুষদে আবেদনের যোগ্যতা সিজিপিএ তিন দশমিক শূন্য করা হয়। উল্লেখ্য, উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের মেয়ে সানজানা সোবহান বিজনেস স্টাডিজ অন্তর্ভুক্ত মার্কেটিং বিভাগ থেকে পাস করে ২২তম অবস্থানে থেকে শিক্ষক হয়েছেন এবং উপাচার্যের নিজ জামাতা এ টি এম শাহেদ পারভেজ বিজনেস স্টাডিজ অন্তর্ভুক্ত মার্কেটিং বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩ দশমিক ৪৭৯ পেয়ে ৬৭তম অবস্থানে থেকে শিক্ষক হয়েছেন। অন্যায়ের তালিকা আরও দীর্ঘ। নিয়োগ পাননি প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত প্রার্থী!

২০১৭ সালের শিক্ষক সমিতির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে 'শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা' পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষক সমিতি প্রতি বছর বেশ কিছু দাবি করে; তার অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয় না। অধিকন্তু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এ উপাচার্যের ক্ষমতা ও দায়িত্বে ১০ নম্বর উপধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, উপাচার্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ পরিপন্থি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অথরিটি বা বডির সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হলে, উপাচার্যের ক্ষমতা আছে তা বাস্তবায়ন না করার বা সংশ্নিষ্ট অথরিটি/বডির কাছে পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানো (তথ্য সূত্র :রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যালেন্ডার; চ্যাপ্টার ১)। উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান একমত হয়েছিলেন (বা চেয়েছিলেন) বলেই, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ ব্যাপকভাবে ২০১৭ সালে শিথিল হয়েছিল। উল্লেখ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ অনুযায়ী, বর্তমান উপাচার্যের মেয়ে ও নিজ জামাতা এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার নিজ জামাতার আবেদনের যোগ্যতা ছিল না।

দেশের ৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চারটি অর্থাৎ ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, যা পরে আইন হয়েছে, সেই আইনে চলে। এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটে ভোটাভুটির মাধ্যমে উপাচার্য হিসেবে তিনজনের নাম প্রস্তাব করলে চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি সেই তালিকা থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করেন। কিন্তু এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সিনেটে ভোটাভুটির আয়োজন করেন। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আলাদা আলাদা আইন আছে। তবে সেই আইন অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচনের কোনো প্রক্রিয়া নেই। রাষ্ট্রপতি উপাচার্য নিয়োগ করে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া, তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং অযোগ্যদের নিয়োগ- এসব বিষয়ে গত কয়েক বছরে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, প্রায় সব সংকটের কেন্দ্রে আছেন উপাচার্যরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের ৩ জন শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে (রিট পিটিশন নং- ৮৯৮৬/২০১৯) উল্লেখ আছে, 'সর্বোচ্চ বিদ্যালয় তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সর্বোচ্চ উঁচু মানের হবেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরসহ সকল কার্যক্রমের পরিচালনাকারী উপাচার্য হবেন আরও উঁচু মানের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জাতীয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মানজনক পেশা। এ পেশার কোনো ব্যক্তি আইন এবং আদালতের আদেশ ভঙ্গ করতে পারেন, তা সাধারণ মানুষ চিন্তাও করতে পারে না। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সেই অকল্পনীয় কাজটি করলেন। তিনি প্রকৃত পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ সকল শিক্ষককে অপমান করেছেন।"

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে, আমরা সেরকম বিশ্ববিদ্যালয় চাই না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মেধাবী ও আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজনের পাশাপাশি উচ্চ নৈতিকতা বোধসম্পন্ন দক্ষ ও অবিতর্কিত উপাচার্য প্রয়োজন। যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য সোবহানের অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অন্যতম মুখ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে তিনি আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের স্টিয়ারিং কমিটির ২০২১ সালের নির্বাচনে উপাচার্য সোবহান প্যানেলের কনভেনর প্রার্থী হয়েছিলেন। উপাচার্যের ওপরই নির্ভর করে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন এবং এগিয়ে যাওয়া। এমন একজন উপাচার্য দেখতে চান প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্নিষ্ট সবাই। সে কারণে সততা, দক্ষতা ও নীতি-নৈতিকতা বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ প্রয়োজন।



মন্তব্য করুন