মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান। অন্নের জোগান দিচ্ছেন কৃষক, বস্ত্র তৈরি করছেন বস্ত্র প্রকৌশলীরা আর বাসস্থান নির্মাণ করছেন নির্মাণ প্রকৌশলীরা। উন্নত জীবন-যাপন ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে মানুষের আরও দুটি চাহিদা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য আগে না শিক্ষা আগে এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে দুটি যে একে অন্যের পরিপূরক তা সকলের কাছে সহজেই অনুমেয়। আজ চিকিৎসা খাতে দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের অভাবই বলে দিচ্ছে স্বাস্থ্য শিক্ষায় আমরা কতটা পিছিয়ে। আমরা আজ যে উন্নত বিশ্ব দেখছি তা সম্ভব হতো না যদি না পিথাগোরাস অঙ্কের ধারণা, আর্কিমিডিসের ভাসমান সূত্র, নিউটনের বলবিদ্যা, জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন আবিস্কারের তত্ত্ব, ফেরাডের বিদ্যুৎ আবিস্কারের সূত্র, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরি না হতো। বিজ্ঞানীরা ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কার না করলে সম্ভব হতো না মানুষকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে।

তাহলে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে আরেকটি প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে বিনোদন, যা মানুষকে মানসিক চাপ কিংবা কাজের একগুঁয়েমি থেকে সাময়িক প্রশান্তি দেয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষের বিনোদন কতটুকু প্রয়োজন? বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের চেয়ে বিনোদনে কতটুকু বিনোয়োগ ও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন? কেনো প্রশ্ন করলাম একটু ব্যাখ্যা করে বললেই বিষয়টি পরিস্কার হবে বলে আমার বিশ্বাস। তাহলে তাকানো যাক বিশ্বে বিজ্ঞানী ও সেলিব্রেটিদের জীবন-যাপনের দিকে। কেউ কি বলতে পারবেন কোনো নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আজ নেইমার, মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে, টম ক্রুজ, শাহরুখ খান তাদের মতো কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থকড়ি কামাতে, প্রায় ২০০ কোটি টাকা দামের ৮-৯টি নামি-দামি গাড়ি শখের বসে গ্যারেজে রাখতে, স্বর্গতুল্য প্রাসাদ তৈরি করতে, আরাম-আয়েশের জন্য প্রমোদতরী কিংবা ব্যক্তিগত বিমানে যাতায়াত করতে? বিজ্ঞানীদের জীবন বিশ্নেষণ করলে দেখা যাবে তাদের পুরো জীবনটাই মানবজাতির জন্য উৎসর্গ করে গেছেন, অর্থকড়ি যা পেয়েছেন তা দিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান করেছেন কীভাবে পৃথিবীকে আরও উন্নত, সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করা যায়। আজ করোনা মহামারি আমাদের কী শেখাচ্ছে?

আজ প্রতিবেশী ভারতের দিল্লি যেন এক মৃত্যুপুরী। শব দাহের জন্য কোনো শ্মশানে চুলা খালি নেই, হতভাগ্য তরুণী শ্রুতি সাহা জনেজনে হাতে-পায়ে ধরেও মাকে বাঁচানোর জন্য পাননি একটুখানি অপিজেন। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে বলিউডের অনেক খ্যাতনামা রুপালি পর্দার তারকারা নিজেদের বাঁচাতে অবকাশ যাপনের নামে পাড়ি জমাচ্ছেন আমেরিকা কিংবা মালদ্বীপ। অথচ এ সব তারকা গোটা পৃথিবীর মানুষের অত্যন্ত পূজনীয় এবং তারা মানবতা ও দেশপ্রেম শিক্ষায় প্রতিনিয়ত অভিনয় করে যাচ্ছেন। তাইতো স্প্যানিশ বায়োলজিক্যাল গবেষক আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'নেসেসিটির চেয়ে লাপারি যে পৃথিবীতে বড় হয়ে যায়, জীবন বাঁচানো মানুষের চেয়ে বিনোদনের মানুষ সেলিব্রেটি হয়ে যায়, হাসপাতালের চেয়ে স্টেডিয়ামের গুরুত্ব বেড়ে যায় সেই অসভ্য সমাজে তো মানুষের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।' 

স্প্যানিশ গবেষকের এই অনুভূতির সঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করলে আমি আরও বেশি হতাশ না হয়ে পারছি না। বিষয়টি হচ্ছে আমার জনৈক ছাত্রের টাইমলাইনের একটি পোস্ট। তার অনুভূতি হচ্ছে 'আমাদের প্রজন্মের ভার্সিটি পড়ূয়াদের মাঝে একটা বড় অংশ ওয়ান্ডারল্যান্ডে বড় হওয়া মানুষ। তাদের কাছে দুনিয়াটা কিছু টিভি সিরিজ, ফুটবল দেখা, হ্যাংআউট করা, প্রেম করা আর খাওয়া-দাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ। কী অদ্ভুত! যদি আপনি এর বাইরে কিছু বলেন, দেশের অবস্থা, আন্তর্জাতিক অবস্থা-তারা আপনাকে নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি করবে। চারদিকে কী হচ্ছে, মানুষ কেমন আছে- এসব নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, আগ্রহও নেই। এ সমস্ত ফিলোসফি তারা শুনতে রাজি নয়, অ্যানিমেশন দেখা আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়ার মাঝেই তাদের দুনিয়াটা সীমাবদ্ধ রাখতে চায়'।

আজ পৃথিবীর অনেক দেশেই চলছে স্বজনহারা মানুষের হাহাকার, আহাজারি, জীবন বাঁচানোর জন্য অপিজেনের স্বল্পতা, আইসিইউয়ের স্বল্পতা, টিকা পাওয়ার অনিশ্চয়তা। অর্থ সংকটের কারণে অনেক দেশ করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা, টেস্ট কিংবা টিকা সংগ্রহ করতে পারছে না। অবশ্য কিছু সংখ্যক সেলিব্রেটি অর্থ-কড়ি দিয়ে সহযোগিতাও করছেন। তবে বিশ্বের বিনোদন জগতের সকল সেলিব্রেটি চাইলেই পারেন গোটা পৃথিবীর এ দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং সমস্যা অনেকটা লাঘব করতে। আজ ভারসাম্যহীন পৃথিবী আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মনে রাখা দরকার পর্দায় হিরোরা আসল হিরো নন। আসল হিরো হচ্ছেন বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও নার্সরা যারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে অহর্নিশ কাজ করছেন করোনায় আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে। আসলে পৃথিবী দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। নতুন নতুন যা দেখছি মনে হচ্ছে পৃথিবীর ধ্বংসের দোরগোড়ায় আমরা পৌঁছে যাচ্ছি। স্বাস্থ্য খাতে এ করুণদশার জন্য দায়ী কারা? আজ রাষ্ট্রপ্রধানরা তাকিয়ে আছেন বিজ্ঞানীদের দিকে, কেউবা আকাশের দিকে আবার কেউবা দানশীল ব্যক্তিদের দিকে। রাজনীতিবিদদের প্রতি অনুরোধ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ তৈরিতে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে একটু গুরুত্ব দিন প্লিজ। পরমাণু বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, বোমারু বিমান, মিসাইল ইত্যাদি বানিয়ে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে কী লাভ? কেউ কি পারছে করোনা নামক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে। আজ সময় এসেছে প্রকৃত সত্যটা উপলব্ধি করা। একটু চেষ্টা করি ধ্বংসের পথ ছেড়ে জাতিতে, ধর্মে, বর্ণে ভেদাভেদ ভুলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শান্তির প্রত্যাশায় মানবিক ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে।

মন্তব্য করুন