গত ২৮ এপ্রিল সকাল ৮.২১ মিনিটে ভারতের আসামে সৃষ্ট এক ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ ও উত্তর-মধ্যাঞ্চল কেঁপে ওঠে। ভূকম্পনটি ভুটান, নেপাল, চীন ও মিয়ানমারেও অনুভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (ইউএসজিএস) ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) ওয়েবসাইটে ৬.০ মাত্রা উল্লেখ করলেও ভারতের ন্যাশনাল সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (এনএসসি) বলছে ৬.৪। এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের সোনিতপুর জেলার ঢেকিয়াজুলি থেকে ৯ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পশ্চিম দিকে ভূঅভ্যন্তরের ৩৪.০ কিলোমিটার নিচে। ঢাকার আগারগাঁওয়ের বিএমডির সিসমিক কেন্দ্র থেকে ভূমিকম্প উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল ৩৯৭ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর-পূর্ব দিকে। ওই এলাকায় এনএসসি পরবর্তী ৩২ ঘণ্টায় ৩.২-৪.৭ মাত্রার দশটি আফটারশক রেকর্ড করেছে। বিএমডির তথ্যানুযায়ী একই এলাকায় গত ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ১৮.২৪ মিনিটে ৪.৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়।

ইউএসজিএস, এনএসসি ও বিএমডি ওয়েবসাইটগুলোর উপাত্ত, বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাদির বিশ্নেষণ করে এখানে প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদানের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তীব্র এ ভূমিকম্পে আসামসহ পুরো উত্তরবঙ্গ কেঁপে ওঠে। ঢেকিয়াজুলিতে মাটি ফেটে যায়, মাটি থেকে পানি নির্গত হয়; পার্শ্ববর্তী তেজপুর, নাগাও, গুয়াহাটি ও ইটানগর শহরে ভবনে ফাটলের সৃষ্টি হয়ে ক্ষতি করে। কোথাও মানুষজন ঘুম থেকে জেগে ওঠে, আবার কোথাও আতঙ্কে কেউ কেউ ঘরের বাইরে চলে আসার, বহুতল ভবন থেকে নেমে আসার খবর দেয়। তবে এ ভূমিকম্পে কোথাও থেকে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী জেলায় এ কম্পন অনুভূত হয়েছে। এ ছাড়া শেরপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকাতে কম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে আতঙ্কে পঞ্চগড় ও শেরপুরে মানুষজন ঘরের বাইরে চলে আসার খবর এসেছে সংবাদপত্রে। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ঠাকুরগাঁও শহর থেকে শোয়া অবস্থায় দুলুনি অনুভব করলেও তীব্রতা না থাকা; গাইবান্ধায় যমুনা নদী তীরে দাঁড়ানো অবস্থায় কম্পন অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কে মাটিতে বসে পড়া; রাজশাহী শহরে উত্তর-দক্ষিণে দুলুনি অনুভূত হওয়ার, সে সময় হাঁটারতদের কম্পন অনুভূত না হওয়া; কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় মৃদু কম্পন অনুভূত হওয়ার তথ্য জানা গেছে।

বর্তমান নিবন্ধকার দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে চেয়ারে বসা অবস্থায় উত্তর-দক্ষিণে দুলুনি অনুভব ও জগের পানিতে ছোট ঢেউ সৃষ্টি ও কারও কারও আতঙ্কিত হওয়া প্রত্যক্ষ করেছেন। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী বগুড়ার শিবগঞ্জে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মাটির দেয়াল এক ঘণ্টা পরে চাপা পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ঢাকার মিরপুরে সাততলায় বসবাসকারীরা জানিয়েছেন টিভিসহ আসবাবপত্র দোলার, আতঙ্কিত হওয়ার। পাবনা, খুলনা, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কপবাজারে যোগাযোগ করা হলে ভূকম্পন অনুভবের কথা কেউ বলেননি। একইভাবে শ্রীমঙ্গলে কম্পনের ব্যাপারে নিশ্চিত করতে পারেনি।

উল্লিখিত উপাত্তের ভিত্তিতে ধারণা করা যায়, দেশে এ ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ তীব্রতা মডিফাইড মার্কলি স্কেলে ছিল ৩-৪ যা দুর্বল-হালকা ঝাঁকানো নির্দেশ করে। কম্পন অনুভূত হওয়া দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো হলো- পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া ও রাজশাহী এবং মধ্য-উত্তরাংশের ময়মনসিংহ, শেরপুর ও ঢাকা। পশ্চিমাঞ্চলের বগুড়া ও রাজশাহী বরেন্দ্র ভূমি এবং অন্যগুলো মূলত তিস্তা অ্যালুভিয়াল ফ্যানে অবস্থিত। ময়মনসিংহ ও শেরপুর প্লাবনভূমি এবং ঢাকা মধুপুর গড় ও কিছু এলাকা প্লাবনভূমিতে অবস্থিত। তবে ঢাকায় মূলত উঁচু ভবনে বসবাসকারীর এ কম্পন অনুভবের কথা বলেছেন। বরেন্দ্র ভূমি ও মধুপুর গড় প্লাইসটোসিন উপযুগের লাল রঙের কাদাসমৃদ্ধ মৃত্তিকা এবং তিস্তা অ্যালুভিয়াল ফ্যান ও প্লাবনভূমিগুলো হলোসিন উপযুগের নরম বালি-সিল্ট-কাদা মিশ্রিত ধূসর পলি দ্বারা গঠিত।

ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ এলে দুটি শব্দের কথা চলে আসে- একটি হলো 'মাত্রা (ইংরেজিতে ম্যাগনিচুড)' অন্যটি হলো 'তীব্রতা (ইংরেজিতে ইনটেনসিটি)'। প্রথমটি দ্বারা একটি নির্দিষ্ট ভূমিকম্পের আয়তন বা কত শক্তি নির্গত হয়েছে তা বুঝায়। কোনো একটি ভূমিকম্পের জন্য মাত্রা একটিই যা সিসমোগ্রাফ নামের যন্ত্র দ্বারা মাপা হয় ও সাধারণত রিখটার স্কেলে প্রকাশ করা হয়। দ্বিতীয়টি দ্বারা কোন ভূমিকম্প কোন এলাকায় কেমন প্রভাব ফেলেছে যেমন- ভূপ্রকৃতি, মানুষ ও অবকাঠামোতে পড়া প্রভাব থেকে নিরূপণ করা হয় যা সাধারণত মডিফাইড মার্কলি ইনটেনসিটি স্কেলে প্রকাশ করা হয়। কোনো স্থানে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকম্পের তীব্রতা নির্ভর করে তিনটি উপাদানের ওপর- ভূমিকম্পের মাত্রা, ভূমিকম্প উৎপত্তিস্থল হতে সে স্থানের দূরত্ব ও সেখানকার মাটি বা শিলার বৈশিষ্ট্য। কাজেই ভূমিকম্প উৎপত্তিস্থল থেকে যত দূরে যাওয়া যাবে সেই ভূমিকম্পের প্রভাবও তত দুর্বল হতে থাকবে। তাই মাত্রা ও তীব্রতাকে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ না থাকলেও প্রায়শই তা করা হয়ে থাকে।

প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত এবং অত্যন্ত সীমিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করা এ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্নেষণকে সংশ্নিষ্টরা ভূকম্পবিদ্যা বা সিসমোলজিক ও ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত সমীক্ষা তথা গবেষণার মাধ্যমে গভীরতর করবেন বলে আশা করা যায়। উপাত্ত সংগ্রহে আমাদের যন্ত্রপাতির সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, কাজেই জ্ঞান সৃষ্টি ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে টেকসই উন্নয়নের জন্য এ বিষয়ে আরও গবেষণা দরকার- ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে ও জনজীবনকে নিরাপদ রাখতে যা প্রয়োজন। এ ছাড়া ভূমিকম্পের আগে, সময়ে ও পরে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্দেশিত করণীয় সম্বন্ধে জনসচেতনতা তৈরি করাও দরকার যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সহায়ক হবে।

বিষয় : চতুরঙ্গ ড. এ. কে. এম. খোরশেদ আলম

মন্তব্য করুন