প্রত্নতত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। আমরা ফিরে যাই সুদূর অতীতকালের সংস্কৃতির সারবত্তায়। পুরোনো দিনের মানুষের তৈরি সকল বস্তু ও নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় প্রত্ন অনুসন্ধানের মাধ্যমে। লিখিত তথ্যের মাধ্যমে খুব বেশি হলে পাঁচ থেকে সাত হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। বর্তমান আবিস্কৃত উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন থেকে কুড়ি থেকে তিরিশ লাখ বছর আগের মানুষের ইতিহাস জানা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ইতিহাসে নতুন মাত্রা সংযোজিত হচ্ছে প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে। প্রত্নতাত্তিকি অনুসন্ধান ও আবিস্কারের মাধ্যমে যেমন পাওয়া সম্ভব অতীত সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সন্ধান, তেমনই প্রত্নতত্ত্ব জনজীবনের ইতিহাসকে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। কোনো অঞ্চল এবং সে অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে মানুষের আগমন, তাদের সামাজিক জীবন এবং অতীত ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা ও সমস্যা আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতির মাধ্যমে জানতে পাই। খ্রিষ্টীয় জন্মের বহু আগে থেকেই রাজা-বাদশাসহ নানা শ্রেণির মানুষের মধ্যে পুরাকীর্তির প্রতি আগ্রহ ছিল বলে জানা যায়। সে সময়ের মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের নানা কর্মকাণ্ড নির্মাণকাজ ও ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য সচেষ্ট ছিলেন।

পদ্ধতিগত প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চা শুরু হয়েছে দেড় শতাধিক বছর ধরে। বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ আহরণ তিন যুগে তিনটি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে হয়েছে। ১৯৪৭-এর ভারত-বিভাগের পূর্বে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং আর্কলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তৎপরতায় উৎখনন ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অনেক প্রাচীন প্রত্নমূল উন্মোচিত হয়। পাকিস্তানি শাসন যুগে এদেশে প্রত্নতত্ত্ব চর্চার দায়িত্ব নেয় পাকিস্তান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি তাদের তেমন মনোযোগ ছিল না। সে সময়ে লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের প্রত্নসম্পদগুলো উন্মোচিত হয়। মহাস্থানগড়ের কিছুটা খননকার্য চলে। আমাদের প্রত্নসম্পদ অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয় স্ব্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত ও নীতিনির্ধারণী কিছু সমস্যা থাকায় প্রত্নসম্পদ আহরণে খুব বেশি সাফল্য দেখাতে পারেনি।

প্রতিষ্ঠান শুরুর প্রাক্কালে দিনাজপুর জেলার সীতাকোট বিহার, ময়নামতির আনন্দ বিহার, বগুড়ার বাসুবিহার এলাকায় কিছু কাজ করা হয়। তাই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রত্নসম্পদ বলতে লালমাই-ময়নামতি অঞ্চল, বগুড়ার মহাস্থান অঞ্চল এবং নওগাঁর পাহাড়পুরের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুলতানি ও মোগল আমলের কিছু মসজিদ, মন্দির আবিস্কৃত ও সংরক্ষণ করা হয়। তবে ১৯৭৯ সালের পর স্বল্প পরিসরে হলেও বিভিন্ন সময়ে খনন কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ময়নামতির ইটাখোলা মুড়া, রূপবান মুড়া, মহাস্থানের দুর্গ, নেত্রকোনার রুয়াইল বাড়ি, সাভারের হরিশ্চন্দ্রের ঢিবি, সোনামসজিদ, বারোবাজার প্রভৃতি।

১৯৮২ সালে ইউনেস্কো ও ইউএনডিপি পাহাড়পুর এবং বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ চর্চার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে ফ্রান্স ও বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রাচীনতম শহর পুণ্ডুবর্ধন উৎখনন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০১৫-১৬ বছরে পঞ্চগড়ের ভিতর গড় এলাকায় খনন কাজ চালিয়ে দুর্গনগরী আবিস্কারসহ বিভিন্ন সময়ে নানা প্রত্নবস্তুর আবিস্কার করে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে জমিদারবাড়ি মেরামত, পুরাকীর্তি চিহ্নিতকরণ ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে। এতকাল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যেসব প্রত্নসম্পদের সন্ধান পেয়েছে তার সবই ছিল ঐতিহাসিক যুগের নিদর্শন। এতে করে ধারণা করা হতো, বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক জনবসতি ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূত্র ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ১৯৮১ সালে লালমাই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান পরিচালনা করা হয়। এর ফলে সেখানে আবিস্কৃত হয় পুরোনো প্রস্তরযুগের জনবসতির চিহ্ন পাথরের হাতিয়ার। ফলে বাংলাদেশের সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎস প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত দীর্ঘ বলে প্রমাণিত হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে অনুসন্ধানের কার্য পরিচালনা করে চাঁদপুরের আশ্বিনপুর, বারগাঁও ও লকি গ্রামে। সেখানে আবিস্কৃত হয় প্রাচীন পুকুর, প্রাচীন ইট, দেয়াল, মৃৎপাত্র, বেলে পাথরের স্তম্ভ ইত্যাদি। প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর আলোকে ধারণা করা হয় এখানে নবম খ্রিষ্টাব্দে একটি জনবসতি গড়ে উঠেছিল। গবেষণা ছাড়াও এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাভার অঞ্চলের প্রত্নতাত্তিক জরিপ, ধামরাইয়ের তাম্র ও মৃৎশিল্পের ওপর নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষাসহ বিভিন্ন স্থানে জরিপ ও খনন চালিয়ে অনেক কিছু আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের প্রত্নতত্ত্ব চর্চার ক্ষেত্রে ইতিবাচক। এই বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও একটি প্রত্নস্থল আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছে, যা সপ্তম-অষ্টম শতকে এ অঞ্চলে মানববসতি ছিল বলে প্রমাণ করে।

প্রত্নতত্ত্ব একটি প্রায়োগিক বিষয়। এর পূর্ণতা আসে ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা ও অনুসন্ধান উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে। তবে প্রত্নতত্ত্বকে সঠিক অর্থে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নেই। তা প্রমাণিত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। এই বিভাগে সাধারণ শিক্ষাক্রম পরিচালিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলনে নতুন নতুন গবেষণা কার্যক্রম প্রত্নতত্ত্ব চর্চার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। নতুন ধারার প্রত্নতাত্তিক গবেষণার ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে দুটো বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করা হয়। প্রথমত আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে আলোচিত হয়নি এমন প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ জনবসতিগুলো খুঁজে বের করা এবং সেসবের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বকে বিশ্নেষণ করা। দ্বিতীয়ত প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের রুটিন দায়িত্বের পরও ঐতিহাসিক যুগের যেসব স্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়নি তাদের ইতিহাস নির্মাণ করা।

বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় ৪৬২টি পুরাকীর্তি রয়েছে। এসব পুরাকীর্তি থেকে উদ্ধারকৃত প্রত্নসম্ভার নিয়ে স্থানীয়ভাবে ২৪টি জাদুঘরও চালু করা হয়েছে। তবে এই অধিদপ্তর কোথায় কী করছে, পুরাকীর্তি সংগ্রহের ব্যাপারে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে- এ সম্পর্কিত সুস্পষ্ট রিপোর্ট ও উদ্ধারকৃত নিদর্শনগুলো জনসম্মুখে দেখানোর ব্যবস্থা করা হলে জনগণ এ বিষয়ে আরও জানতে পারত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০০টি ছোট-বড় জমিদারবাড়ি অনেকটাই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কিছু জমিদারবাড়ি তাদের আওতায় নিয়ে সংরক্ষণ করে স্থানীয়ভাবে মানুষের বিনোদনের খোরাক জোগানোর চেষ্টা করছে। দেশের অনেক জমিদারবাড়ি ভূমিদস্যুদের কবলে চলে গেছে। কুচক্রী মহল আবার কোনো কোনো পুরাকীর্তি ও প্রত্নস্থলও দখলের অপচেষ্টায়ও লিপ্ত। ঐতিহ্য রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পাশাপাশি সকলেই এগিয়ে এলে প্রত্নভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হবে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে সরকারি এবং সংশ্নিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ব্যাপক গবেষণা ও উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা হয়ে থাকে। তার ফলে উল্লেখযোগ্য প্রত্নসম্পদ আবিস্কারে সাফল্য লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশেও প্রত্নতত্ত্ব চর্চার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়ার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও উন্নত গবেষণা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রমাণিত হচ্ছে যে, হাজার হাজার বছরের সংস্কৃতি ধারণ করে আছে আমাদের এই বাংলাদেশ। দক্ষতা ও উদ্যোগের অভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি আমাদের ঐতিহ্য অনুসন্ধানে। তাই এখনও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে উৎখনন অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন প্রত্নসম্পদ খুঁজে পাওয়ার। এতে করে ইতিহাস পুনর্গঠনে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।

প্রত্নতত্ত্ব চর্চা একটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য জরুরি, তাই প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা। সেইসঙ্গে পুরাকীর্তি বিভাগের উন্নয়ন। জানা গেছে, এই বিভাগের সারাদেশে মাত্র চারটি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে অথচ দেশে বর্তমানে বিভাগের সংখ্যা আটটি। ফলে নূ্যনতম পক্ষে প্রতি বিভাগে একটি করে আঞ্চলিক অফিস ও জনবল কাঠামোর সুবিন্যাস প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ে দক্ষ জনবল প্রেরণ করে পুরাকীর্তি বিভাগকে আরও গতিশীল করা গেলে রক্ষা পাবে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

প্রত্নসম্পদ একটি দেশের মনস্তাত্ত্বিক এবং বস্তুগত জীবনের আনুকূল্যে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ সম্পদের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত দেশের অতীত ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতা মানুষকে আশাবাদী করে তোলে এবং হতাশা থেকে মুক্তি দিতে পারে, অনুপ্রেরণা দিতে পারে উন্নয়নের পথ তৈরিতে। সেইসঙ্গে প্রত্নসম্পদ যথার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের দেশের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানো সম্ভব।

মন্তব্য করুন