বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর পরম আরাধ্যপুরুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বকবি রবিঠাকুরের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য পৌঁছেছে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে। বাংলা ছোট গল্প এবং গদ্যের সাবলীল ও গতিময় রূপদানে প্রধান ভূমিকা রবিঠাকুরের। যার চিন্তায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবনা ও সুরের মেলবন্ধন ধরা দিয়েছে অপূর্ব সব গানে। তিনি বাংলা আধুনিক গানের জনক, যা রবীন্দ্রসংগীত নামে বাঙালির মণিকোঠায় চিরস্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত। বলা হয় বাঙালির মননে, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি মুহূর্তের ভাবনা যিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যের সকল শাখায় যেমন ফলিয়েছেন সোনালি ফসল, তেমনি একই সঙ্গে জমিদারি সামলেছেন এবং কৃষক-প্রজার জীবন উন্নয়নে নিয়েছে কার্যকরী উদ্যোগ। তার রাশিয়ার চিঠি প্রবন্ধে বাংলার চাষির ভাগ্যোন্নয়নে সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মতো ইহজাগতিক চিন্তার পরিচয় পাই।

আবার তার রিলিজিওন অব ম্যান বইতে চিরন্তন বিশ্বজগৎ, পরম সত্য, সৌন্দর্য ও পরম মানবের পরিস্কার চিত্র দেখা যায়। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কবিগুরুর চোখে ছিল কৈশোরের তীব্র কৌতূহল। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ভাবনায় একই সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য বিশেষত বেদ, মহাভারত, রামায়ণ, পুরাণ, উপনিষদের গুরুতত্ত্ব থেকে শুরু করে সহজিয়া বাউল, কীর্তনের দেখা পাই; তেমনি পশ্চিমা আধুনিক সাহিত্য ও সংগীতের নির্যাস ভারতীয় উপযোগী করে পরিবেশনাও লক্ষণীয়। পুরাণের মানবসত্তা প্রাধান্য দিয়ে মানবের জয়গান গাইতেন বলেই বিশ্বকবিকে উপনিষদের মানবিক ঋষিও বলা হয়ে থাকে। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে যদিও রাজা রামমোহন রায়কে প্রথম উপমহাদেশীয় আন্তর্জাতিক মানুষ বলে অভিহিত করেছেন কিন্তু ভারতীয় সাহিত্যিকদের মাঝে রবিঠাকুরই প্রকৃতপক্ষে প্রথম পরিপূর্ণ সর্বজনীন মানব, যিনি সাহিত্য সাধনা করেও বিজ্ঞানের সমসাময়িক বিষয়ে ভাবতেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সহজ আলোচনা তার বিশ্বপরিচয় প্রবন্ধে উঠে এসেছে। এছাড়াও সমসাময়িক বিজ্ঞান নিয়ে ভাবনার উদাহরণ হিসেবে শেষের কবিতার অমিত ও লাবণ্যের আলাপের আরম্ভ অংশে হাস্যোচ্ছলে অমিতের কণ্ঠে শুনতে পাই- 'দেশে কালে-পাত্রে ভেদ আছে অথচ নামে ভেদ নেই, ওটা অবৈজ্ঞানিক। রিলেটিভিটি অব নেইমস প্রচার করে আমি নামজাদা হব স্থির করেছি।' তিনি সত্য ও সৌন্দর্যের অনুসন্ধিৎসু এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তার প্রধান অনুষঙ্গ। রবিঠাকুর লিখেছেন- 'নারদ কহিলা হাসিয়া, সেই সত্য যা রচিবে তুমি/ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি/রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।'

সহজভাবে মানব মস্তিস্ক চোখে আলোর প্রতিফলে বস্তুকে যে রঙে দেখায় আমরা সেই রংই দেখি। তাই বর্ণান্ধ ব্যক্তির পুরো জগৎটাই সাদাকালো। বিশ্বকবি মানবিক চেতনাকে প্রাধান্য দিয়ে বলেছেন, আমরা যেরূপে উপলব্ধি করি, জগৎ সেরূপেই ধরা দেয়। এ প্রসঙ্গে বিশ্বকবির বিখ্যাত পঙক্তি স্মরণযোগ্য :আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ/চুনি উঠল রাঙা হয়ে। আমি চোখ/মেললুম আকাশে জ্বলে উঠলো আলো/পূবে-পশ্চিমে গোলাপের দিকে তাকিয়ে বললুম সুন্দর/সুন্দর হল সে।

সৌন্দর্য দর্শন অনুভূতি মানুষের চেতনানির্ভর বলে স্পষ্ট করেছেন বিশ্বকবি। আনন্দ ও দুঃখকে সত্যেরই দুটি রূপ হিসেবে চিহ্নিত করে লিখেছেন : 'সত্যকে যখন অন্তরের মধ্যে মানি তখনই তাহা আনন্দ, বাহিরে যখন মানি তখনই তাহা দুঃখ'। সত্য আনন্দ ও বেদনা- এই দুই রূপেই ধরা দেয়। তাই বিশ্বকবি সত্যকে সহজে মেনে নিতে আহ্বান করে লিখেছেন- মনরে আজ কহ যে,/ভাল মন্দ যাহাই আসুক/সত্যকে লও সহজে।

আবার সত্যকে ধারণ করা, তাকে উপলব্ধি করাও সহজ নয়। এ বিষয়ে কবিগুরু লিখেছেন- 'সরল রেখা আঁকা সহজ নহে। সত্য বলাও সহজ ব্যাপার নহে। সত্য বলিতে গুরুতর সংযমের আবশ্যক। দৃঢ় নির্ভর হয়ে নিষ্ঠার সহিত তোমাকেই সত্যকে অনুসরণ করিতে হইবে, সত্য তোমার অনুসরণ করিবে না'। সত্যকে অনুসরণ করা, সত্যকে লালন করা, সত্যের পথে চলা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, কঠিন সংযম ছাড়া সম্ভব নয়। মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী তার চোখ দেখিয়ে বলেছিলেন, 'দেখ আমার চোখ কত ছোট কিন্তু তা দিয়েই সমস্ত জগৎ দেখা যায়'। ঠিক তেমনি বাঙালি জাতি রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়েই বিশ্বসাহিত্য, সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচিত্র জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছে। পশ্চিমের যাত্রীর ডায়েরিতে রবিঠাকুর সুন্দরের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লিখেছেন- 'সৃষ্টিতে যতক্ষণ দ্বিধা থাকে ততক্ষণ সুন্দর দেখা দেয় না। সামাঞ্জস্য যখন সম্পূর্ণ হয় তখনই সুন্দরের আবির্ভাব হয়'।

রবিঠাকুর ১৯৩০ সালে ক্যাপুথে বিজ্ঞানী এলবার্ট আইনস্টাইনের বাড়িতে মিলিত হয়েছিলেন চিন্তার পারস্পরিক বিনিময়ে। চিরন্তন জগৎ, পরম সত্য ও সৌন্দর্য নিয়ে এই দুই মহাজনের একান্ত আলাপচারিতা বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম কথোপকথন বলে পরিগণিত। আইনস্টাইন তার অতিথি সম্পর্কে বলেছিলেন, 'তিনি আমার কাছে আত্মা, আলো এবং ঐকতানের জীবন্ত কিংবদন্তি। তার সাহিত্য মানবিক দুঃখ-যাতনা, সংগ্রাম নিয়ে রচিত যার মূল শিকড় মানুষের ভালোবাসায় প্রোথিত'। রবীন্দ্রনাথ ৪২ বছর বয়সী আইনস্টাইনকে গণিতের প্রাচীন সত্তা স্থান, কালের অন্বেষণে ব্যস্ত নিঃসঙ্গ অলৌকিক মানুষ এবং চমৎকার প্রশ্নকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুই অমিত প্রতিভাধর ব্যক্তি ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ- বিশেষত জাতীয়তা, সংস্কৃতি, কর্মক্ষেত্র এবং দর্শনে। তথাপি দু'জন ছিলেন সত্য ও সৌন্দর্য অনুসন্ধিৎসু এবং সংগীতপ্রেমী। তাদের আলোচনার মূলে ছিল সত্য, সৌন্দর্য ও চিরন্তন বিশ্বজগৎ। সহজভাবে বললে আইনস্টাইনের প্রথম জিজ্ঞাসা ছিল, 'সত্য ও সৌন্দর্য মানব অস্তিত্ব নিরপেক্ষ কিনা?' উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, 'চিরন্তন জগতের সকল সত্য প্রকৃতপক্ষে মানবসত্য। অন্যভাবে বললে বিশ্বজনীন সত্য হল মানবিক সত্য। কাজেই মহাবিশ্ব যখন মানব চেতনার ঐকতানে একীভূত হয়, যা চিরন্তন রূপ নেয়, তখনই তাকে সত্য বলে মানি এবং একে সৌন্দর্য হিসেবে অনুভব করি। কাজেই সত্য ও সুন্দর সম্পূর্ণ মানব চেতনানির্ভর'।

আইনস্টাইন সৌন্দর্যের পরিপ্রেক্ষিতে একমত হলেও সত্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, 'মানুষের অনুপস্থিতিতে অ্যাপোলো ভেলভেদরকে কি সুন্দর বলা যাবে না?' এ প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বকবি কিছু বলেননি। তখন আইনস্টাইন বলেন, 'সুন্দরের ক্ষেত্রে মানলাম কিন্তু সত্যের ক্ষেত্রে মানছি না। কেননা সত্য সর্বদা মানব পর্যবেক্ষণের ঊর্ধ্বে হতে হবে। যেমন পিথাগোরাসের সূত্র এমনিতেই সত্য, কোনো মানবিক চেতনা/অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সত্য মানব চেতনানির্ভর সত্য। মানব সত্য তখনই কেবল সত্য যখন মানব চেতনা ও বিশ্বচেতনা এক হয়ে যায়। এই সত্য মানুষের মধ্য দিয়েই উপলব্ধি হয়।'

মানব চেতনা নিরপেক্ষ সত্যের উদাহরণ হিসেবে আইনস্টাইন বলেন, 'যদি এই ঘরে কেউ না থাকে, তবুও টেবিলটি থাকবে। ফলে টেবিলের অস্তিত্ব আছে- এটা মানব চেতনানির্ভর নয়।' পক্ষান্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'বিজ্ঞান অনুযায়ী টেবিল কঠিন পর্দাথ বিধায় তা দৃশ্যমান অনুভূতি। দৃশ্যমান অনুভূতি মানব চেতনারই অংশ। মানব চেতনা বলে কিছু না থাকলে টেবিলের অস্ত্বিও থাকবে না।' সত্য নিয়ে উভয়ের মাঝে ভিন্ন মত থাকলেও উভয়ই সংগীতের সৌন্দর্য ব্যাখ্যাতীত এ বিষয়ে একমত হন। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্রকে মেনে নিতে না পারলেও রবীন্দ্রনাথকে বেহালার সুরে মুগ্ধ করিয়ে আইনস্টাইন সংগীতের সৌন্দর্য তার সুরে না কি কথার গভীরতায় এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পেরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে একমত হয়ে উভয়ই স্বীকার করেন সংগীতের সৌন্দর্য ব্যাখ্যাতীত।

মন্তব্য করুন