গল্পটা শুরু ১২ বছর আগে। নতুন একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কয়েক স্বপ্নবাজ তরুণের স্বপ্ন শুরুর গল্প। একেবারে ভিন্ন চিত্রপট। বলা যায়, প্রায় অপরিচিতি একটি ধারণাকে বাজারে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। কেমন ছিলো সেই শুরুর লড়াই? আজ ১২ বছর পর সেই ইন্ডাস্ট্রি কোথায় দাঁড়িয়েছে? আগামীতেই বা আর কী করার আছে? দেশের অন্যতম শীর্ষ জনসংযোগ (পিআর) প্রতিষ্ঠান কনসিটো পিআর-এর এক যুগ পূর্তিতে দেশের জনসংযোগ শিল্পের সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন কনসিটো পিআরের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মানজেনো রায়হান খান (অমিত) 

বাংলাদেশে জনসংযোগ: ১২ বছর আগে ও পরে

বাংলাদেশের পিআর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কনসিটো পিআর, ইমপ্যাক্ট, ফোরথট মোটামুটি একই সময়ে পথচলা শুরু করে। তখনও পিআরের যে সামগ্রিক প্রক্রিয়া সেটা গ্রহণ করা হতো না, এমনকি চর্চাই হতো না। তখন পিআর মানে বোঝা হতো- প্রেস রিলিজ। এর বাইরে যে আরও অনেক কিছু করার আছে, সেটাই ভাবা হতো না বা সে সম্পর্কে কারও সুস্পষ্ট ধারণাও ছিল না। ওই কঠিন সময়টাতে আমাদের শিখতে এবং শেখাতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক পিআর প্রতিষ্ঠানের অংশ হওয়ায় আমরা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অফিসে আমাদের ক্লায়েন্টদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মশালার আয়োজন করতাম। এর পেছনে প্রচুর সময় ও শ্রম দিতে হয়েছে আমাদের।

আর এখন এসে পিআরের রূপ অনেকটাই মার্জিত। যেকোন প্রতিষ্ঠান এখন বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহী হলে কিংবা কাজ শুরু করলে ডিজিটাল আর অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি খোঁজার আগে পিআর এজেন্সি খুঁজে নেয় এবং নিয়োগ দেয়। তখনও তারা ডিজিটাল আর অ্যাডভার্টাইজিং নিযুক্তই করেনি। গত ১২ বছরে পিআর চিত্রপটে আমূল পরিবর্তন এসেছে। মানুষ পিআর এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে শুরু করেছে। একসময় যে পেশার কথা বললে মানুষ চিনতই না, সেই পেশায় নিযুক্ত থাকতে পারা এখন গর্বের।

আসলে জনংসযোগ কী?

খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে নিজের ভালো গুণ বা দক্ষতার কথা নিজে বলা হলে অর্থাৎ নিজের ঢোল নিজে পেটালে সেটা হয় বিজ্ঞাপন। তবে এই ঢোলটা যখন অন্য এক বা একাধিক কেউ পেটায় অর্থাৎ একই গুণের কথা যখন অন্যেরা জানান দেয় তখন তা হয়ে যায় জনসংযোগ বা পিআর। অন্য কেউ যখন ঢোল পিটিয়ে আপনার গুণের প্রশংসা মানুষের কাছে তখন ব্যাপারটা অনেক আস্থানির্ভর ও বিশ্বস্ত মনে হয়। এতে করে সুনাম বৃদ্ধি পায়, সেইসাথে সকল স্টেকহোল্ডারদের সাথে গড়ে উঠে সুসম্পর্ক। স্টেকহোল্ডারদের কাছে সুনাম বৃদ্ধি ও সুসম্পর্ক তৈরির এই প্রক্রিয়াটারই প্রাতিষ্ঠানিক নাম পিআর বা জনসংযোগ। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত কৌশল নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে থাকে একটি পিআর প্রতিষ্ঠান। সম্পূর্ণ এই প্রক্রিয়াটি মার্কেটিং কিংবা অ্যাডভার্টাইজিং থেকে খুব সুক্ষ্মভাবে ভিন্ন।

জনসংযোগ কীভাবে কাজ করে?

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে পিআর অনেক দূর এগিয়ে গেলেও আমাদের দেশে এর পথচলার শুরু খুব বেশিদিন আগে না। পরিবর্তনের ছোঁয়াটাও তাই একটু দেরিতেই লেগেছে বলা যায়। গণমাধ্যমের জন্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরি করে দেওয়াই কিন্তু পিআর এর একমাত্র কাজ নয়, এর রয়েছে নানা কাজ, নানা রূপ।

পিআর কাজ করে উভমুখী যোগাযোগ নিয়ে। এই যোগাযোগকে সফল করার অন্যতম হাতিয়ার হলো গল্প। সকল স্টেকহোল্ডারদের কাছে কার্যকরি উপায়ে পৌঁছানোর উপযুক্ত মাধ্যমই হলো সঠিকভাবে গল্প বলা। সেটা বিভিন্ন উপায়েই হতে পারে। যেমন, সরাসরি উপস্থিত হয়ে, বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে, ফেসবুক লাইভে কিংবা একজন সাংবাদিকের সাথে কফি খেতে খেতে গল্পটা তুলে ধরা।

চ্যালেঞ্জ

বিশ্বের সাথে আমরা পুরোপুরি তাল মেলাতে না পারলেও বাংলাদেশে পিআর এখন আর পিছিয়ে নেই। ধীরগতিতে হলেও এগিয়েছে এবং এগোচ্ছে। তবে কিছুটা ঘাটতি আছে। সেটা হলো মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমের সমন্বয়ের অভাব, যেটা নিয়ে কনসিটো পিআর কাজ করে যাচ্ছে। অনেক সময় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও বুঝতে পারে না যে কোনটা পিআর এজেন্সির কাজ আর কোনটা ডিজিটাল এজেন্সির কাজ। এক্ষেত্রে প্রায় সময় একটা ধোঁয়াশা দেখা দেয়। এটা দূর করাটাই একটা চ্যালেঞ্জ।

আরও একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে হয়। তা হলো লবি বা সুপারিশ কিংবা অ্যাডভোকেসি করাও কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যেটা আন্তর্জাতিক পিআর প্রতিষ্ঠানগুলো করে থাকে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সংযোগ করিয়ে দেওয়া পিআর চর্চার মধ্যে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে তা মনে করা হয় না। এই জায়গাতেও পরিবর্তন নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ করছে কনসিটো পিআর।

আরও একটা বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি। সেটা হলো গল্প বলা বা লেখার ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েন্সার কিংবা ব্লগারদের এই খাতে নিয়ে আসা, যেটা আন্তর্জাতিক পিআর-এ হয়ে থাকে। এতে করে কার্যকর যোগাযোগের পাশাপাশি ব্যয়টাও অনেক কমে আসে এবং ইনফ্লুয়েন্সার, ব্লগারদের জন্য আয়ের উৎস তৈরি হয়। 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উপস্থিতির অভাব অত্যন্ত মন খারাপ করা একটি বিষয় হলো, আমাদের দেশে জাতীয় পর্যায়ে পিআর কার্যক্রমের অভাব থাকার কারণে বড় ধরণের কোন নেতিবাচক ঘটনা ঘটলেই কেবল বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে স্থান পায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন কিংবা সম্ভাবনার গল্পগুলো এসব গণমাধ্যমে উঠে আসে না। যেটার আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ক্ষেত্রে একেবারেই উল্টোচিত্র। অন্তত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী কিংবা বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীতেও আমরা আমাদের গলপগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলে ধরতে পারতাম। আমাদের অনেক গল্প আছে বলার। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে পিআর এর কার্যক্রমের অভাবে আমরা এই জায়গাতে পিছিয়ে পড়ছি।

চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠার উপায়

সঠিকভাবে গল্প বলতে বা লিখতে পারা এক কথায় গল্পটা তুলে ধরতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য এমন মানুষ আপনার চাই, যে ভালো গল্প লিখতে বা বলতে পারে। এজন্য আমরা যোগাযোগে দক্ষ এমন ছেলেমেয়েদের বাছাই করে নিয়োগ দেই এবং তাদেরকে তৈরি করি। মজার বিষয় হলো, আমাদের দেশের তরুণরা যেকোন নতুন কিছুকে দারুণভাবে গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে আমরা তারুণ্যের শক্তি ও উদ্যমকে কাজে লাগাই। এভাবে আমরা একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের টিমে এখন সদস্য সংখ্যা ত্রিশের বেশি। তাদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে কনসিটো পি আর এর সাথে আছে। মিডিয়া মনিটরিং/রিসার্চ, ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং, কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্ট এবং মিডিয়া এই চারটি টিম নিয়ে আমরা কাজ করছি এবং আমাদের কর্মীদের নিয়ে গর্বিত।

তবে আমরা যদি দেশের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অধ্যয়ন হয়, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা পেতাম তাহলে আমাদের এগিয়ে যাওয়াটা আরও অনেক সহজ এবং দ্রুতগতির হতে পারতো। পি আর কোর্সটাকে আবশ্যিক করা গেলে এটা ফলপ্রসূ হতে পারে। যেমন রেপ্যুটেশন অ্যান্ড রেলেভেন্ট স্টেকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট/স্টেকহোল্ডার আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড রেপ্যুটেশন বিল্ডিং, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট ইন এথিক্যাল ম্যানার এবং কান্ট্রি ব্রান্ডিং-এর মতো বিষয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক কোর্সে যুক্ত করা যেতে পারে।

আগামীর ১২ বছর

আগামী ১২ বছরে আমরা বেশ কয়েকটা কাজ করতে চায় কনসিটো পিআর। তার মধ্যে একটি হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতায় আয় এবং সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। আমরা খুব শীঘ্রই এই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছি। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের জন্য এ ধরণে আয়োজন বিশেষভাবে দরকার

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে জনসংযোগ করতে চাই। আমাদের অধিকাংশ ক্লায়েন্টই আন্তর্জাতিক বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে আমরা টিকটক, পাবজি, অ্যাভেরি ড্যানিসন, সেরাই, জেনারেল ইলেকট্রিক পাওয়ার (জিই), স্যানি, পিডিলাইট, সিকমেড-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাজ করছি। এখন আমরা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান, সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয় নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করতে চাই। আমাদের ক্লায়েন্ট এফবিসিসিআইয়ের জন্য এমন কিছু কাজ করছি। দেশের ইতিবাচক গল্পগুলো আমরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলে ধরতে চাই। আমরা ডিজিটালের দিকে এগোচ্ছি। ইতোমধ্যেই ডিজিটাল স্টোরিটেলিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন এবং ডিজিটাল পিআর নিয়ে কাজ করছি। তবে আপাতত প্রথম দুটো বিষয়েই আমরা বেশি জোর দিচ্ছি।

মন্তব্য করুন