কল্যাণীয়াষু শান্তি-

'আমার গানের সঞ্চয় তোর কাছে ... বিশুদ্ধভাবে সে গানের প্রচার করা তোর কর্তব্য হবে। আমি তোর পিতার পিতৃতুল্য। আশাকরি আমার উপদেশ মনে রাখবি- শুভার্থী রবীন্দ্রনাথ।' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২১ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে শান্তিদেবকে স্বহস্তে এই চিঠি লিখেছিলেন।

উল্লেখিত চিঠিতে 'বিশুদ্ধভাবে সে গানের প্রচার' কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কবির এই মন্তব্যের বিষয়টি মনে রেখেই তৎকালীন শান্তিনিকেতনের বাস্তব পরিবেশে একবার ফিরে দেখা যাক। ভূমি রাও শাস্ত্রী। ১৯৪১ সালে হিন্দি গানের অধ্যাপক হয়ে শান্তিনিকেতনে আসেন। তিনি শান্তিনিকেতনে এসে বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্রসংগীত খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে শিখতে আরম্ভ করেছিলেন। তিনি বহু বাংলা গান শিখেছিলেন এমনকি গাইতে পারতেন। বহু অনুষ্ঠানে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাকে একক গান গাওয়াতেন। তার কণ্ঠে গুরুদেবের গান শুনে বোঝা যেত যে অবাঙালি কেউ গাইছেন। এত কিছুর পরও রবীন্দ্রনাথ তাকে গান গাইতে বা ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাতে দিয়েছেলিন। এমনকি তিনি রবিঠাকুরের গানের স্বরলিপিও করেছিলেন।

শ্যাম ভট্টাচার্য নামে একজন শিক্ষককে শান্তিনিকেতনে উপাসনার মন্দিরে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যেয় রবীন্দ্রনাথ ও তার পরিবারের অন্য সবাই ধর্মসংগীত গাইবার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি যে ঢংয়ে এবং যে সুরে রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় সংগীত গাইতেন, তার সঙ্গে প্রচলিত স্বরলিপির অমিল ছিল খুব বেশি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রবীন্দ্রনাথ কখনও শ্যাম ভট্টাচার্যকে স্বরলিপি অনুসারে গান গাইতে বলেননি অথবা তাকে গান গাইবার কাজ থেকে সরিয়ে নেননি। শ্যাম ভট্টাচার্য বৃদ্ধ বয়সে অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একইভাবে গান গেয়েছিলেন।

অথচ বিশ্বভারতী সৃষ্টি হওয়ার পর ১৯২৬ সাল থেকে কোনো গায়ক অথবা গায়িকা যাতে নিজেদের ইচ্ছামতো সুরে গেয়ে কবির গান রেকর্ড করতে না পারেন সেদিকে রবীন্দ্রনাথ দৃষ্টি রেখেছিলেন। এমনকি তিনি রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করেছিলেন, যিনিই তার গান গাইবেন, তিনি যেন সুর ঠিকমতো শিখে গান পরিবেশন করেন। এর পর থেকেই শিল্পীরা বা যারা রবীন্দ্রসংগীত গাইতে ইচ্ছুক তারা ঠিকমতো সুরের শিক্ষা নিয়ে তবেই গান গাইতেন। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বলতে যা বুঝায় সেই পর্যায়ভুক্ত যদি নাও হন, অর্থাৎ অরবীন্দ্রসংগীত গাইয়ে গিয়েও যদি কবির গান রেকর্ড করতে চাইতেন, তাতে তিনি আপত্তি করতেন না। যদি তার গান ঠিকমতো শিখে নিয়ে রেকর্ড করার চেষ্ট করতেন এবং কবি তাদের গাওয়া গান শুনে যদি সন্তুষ্ট হতেন, তবেই তিনি উদার মনে অনুমতি দিতেন। যদি তাই হয়, তবে রবীন্দ্র গানের গায়কী নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

বর্তমানে রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে আলোচনা সভায় এবং বিশেষ করে তার গানের গায়কী নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কোনো কোনো রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞের মুখে শোনা যায়, রবীন্দ্রগানের গায়কী না জানলে তার পক্ষে কবির গান গাওয়া ঠিক নয়। আর যেহেতু কবি তার গানের বিষয়ে ভীষণ রকমের সংবেদনশীল ছিলেন, তাই এই নীতিটা মেনে চলা উচিত। প্রশ্ন হলো, গায়কী বলতে কী বুঝায়? ধরা বাঁধা সংজ্ঞা অনুযায়ী বলাই যায়, 'গায়কী' শব্দের অর্থ গান গাইবার ধরন বা শৈলী। আবার কেউ কেউ বলেছেন, নির্ঝর কলতানে, সুর তাল ফাঁকের অপূর্ব শব্দময় নৈঃশব্দের চির-মধুর স্পর্শে প্রাণ উত্থিত হয় কী যেন এক অলৌকিকতার আবেশ। বাস্তবের জটিলতা ছিন্ন করে একটি আলাদা বোধের তন্ময়তার সৃষ্টি হয় আর সেটাই হলো গায়কী।

সাদামাটাভাবে গায়কী বলতে বোঝায় গান গাওয়ার ঢং। অন্তত আমি বিষয়টিকে এভাবেই বুঝি। গায়কী তৈরির বিষয় নিয়ে আমার বিশেষ কিছু ধারণা আছে যা প্রচলিত মতের সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন রূপ প্রকাশ করে। কবিতা পাঠকের কাছে কবিতা হয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া আছে। কবির কবিতা যখন আবৃত্তিকার তার স্বরপ্রক্ষেপণের মাধ্যমে একটি চিত্রকল্প তৈরি করে এবং সব দর্শক-শ্রোতাকে তার সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন কবির কবিতায় প্রাণ সঞ্চার হয়। আর তা না হলে নিছক মুখস্থ বা পড়ে যাওয়া।

আমি প্রায় তিন দশকের বেশি সময় কবিতা আবৃত্তি বা উচ্চারণ নিয়ে কাজ করছি, যদিও মঞ্চে আবৃত্তি করিনি নব্বই দশকের পরে, কিন্তু আবৃত্তিকার হয়ে সেটার পেছনে এখনও কাজ করছি। গানের বিষয়ে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত। আমি বাংলাদেশের অসংখ্য প্রথিতযশা কবিওয়ালার গান শুনেছি। আমার পিতৃপুরুষেরা সেসব গানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এখনও কেউ কেউ আছেন। ফলে গান, গান হয়ে ওঠার পেছনের কথা আমি খানিকটা বুঝি। যেমন বুঝি কবি ও কবিতার কথা। তেমনি বুঝি রবিঠাকুরের গানের গায়কী। কোথায় যেন সুরের মোহজালে পৃথিবীর তাবৎ সত্ত্বা থেকে আমাকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন করে নেয়।

সাধারণ গায়কী হলো প্রচলিত ধারা মতে এক ধরনের গান গাওয়ার প্রক্রিয়া। যেমন খেয়াল, ধামাল, টপ্পা, ঠুমরি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল সংগীত, লোকসংগীত ইত্যাদি গানের প্রত্যেকটিরই আলাদা আলাদা ঢং আছে এবং সেই আলাদা আলাদা ঢংয়ে গাওয়াকে বলা হয়ে থাকে গায়কী। আরও একটু খুলে বললে বলা যায়, যদি রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হয় তখন যেন রবীন্দ্রসংগীতের মতো হয়, যখন নজরুল সংগীত গাওয়া হবে তখন যেন নজরুল সংগীতের মতো মনে হয়। আবার যখন খেয়াল গান গাওয়া হবে, তখন যেন খেয়াল গানের রূপ খেয়াল গানের মতোই মনে হয়। অর্থাৎ শুনেই একজন শ্রোতা যিনি গান সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা রাখেন, তিনি অনায়াসে বলে দিতে পারেন এটি কোন পর্যায়ের গান। তার মানে শ্রোতা গান শুনেই বলে দিতে পারেন কোনটি খেয়াল, কোনটি রবীন্দ্রসংগীত, কোনটি নজরুল সংগীত, কোনটি লোকসংগীত। অর্থাৎ শিল্পীর গান পরিবেশনার মধ্যে যেন গানের প্রকৃতির প্রকাশ সহজভাবে বোঝা যায় বা সহজে গানের প্রকৃতি নির্ণয় করা যায় সেই রকম পরিবেশনার প্রক্রিয়াকে বলা যায় গায়কী।

কবির একান্ত কাছের জন শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন কবি একান্তভাবেই চেয়েছিলেন, রসে মজে বা যে হৃদয়াবেগের প্রেরণায় গানগুলো রচনা করেছিলেন, সে দিকটির প্রতি ভালো ও মন্দ সব গাইয়েরই যেন লক্ষ্য রেখে গানের ভাবলোক প্রবেশের চেষ্টা করেন। তাই বলে রবীন্দ্রসংগীত গাইবার অধিকার যে সবার নেই, তা কিন্তু নয়। রবীন্দ্রসংগীত গাইবার অধিকার সবারই আছে এবং চেষ্টা করবে, নিজের সুখ-দুঃখের প্রয়োজনে। কিন্তু কেবল পোষা পাখির মতো মুখস্থ করে গেয়ে যাওয়াটা মুখ্য হবে না। উদ্দেশ্য হবে, নিজে গান গেয়ে গানের রসে মনকে মজিয়ে তোলা। আর যখন এটি হবে, তখন আর গায়কী নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না।



মন্তব্য করুন