বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রমভিত্তিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আধুনিক সমাজে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং পরিতৃপ্তির মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে সমতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ব্যক্তি মানুষ যা চায়, সমাজ হয়তো তার সবটুকু দিতে অপারগ। কেননা, সমাজে বিদ্যমান সম্পদের মাধ্যমে মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে ব্যক্তি সমাজের ওপর আস্থা হারায়, যার ফলে সমাজে বিভিন্ন আত্মহত্যা ঘটমান। এই আত্মহত্যা বাংলাদেশে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ইদানীং কিছু উঠতি বিপদগামী যুবকের ইভটিজিং বা স্বামীর যৌতুকের নির্যাতনের কারণে অনেক তরুণী বা স্ত্রী আত্মহত্যা করে। তাই বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বা সমাজকর্মীরা এই আত্মহত্যা রোধ করার জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। ভাববাদী সমাজতত্ত্ববিদ ডুরখেইম আধুনিক শিল্পায়িত সমাজ বিশ্নেষণ করে বিপ্লবোত্তর ফ্রান্সের সামাজিক অবস্থা আলোচনা করতে গিয়ে এনোমি শব্দটি ব্যবহার করেন। বস্তুত, ডুবখেইমের সামাজিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো এনোমি।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম সামাজিক ও সংহতি বিনষ্টকারী শক্তিগুলো নিয়ে গবেষণাকলে আত্মহত্যা বিষয়টিকে সমাজবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্নেষণ করেন। ডুবখেইম আত্মহত্যাকে সামাজিক সংহতির সূচক রূপে ব্যবহার করেন। ডুবখেইম আত্মহত্যাকে সমাজে শ্রমবিভক্তির নেতিবাচক ফল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, প্রায় প্রতিটি আধুনিক সমাজের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন এসে উপস্থিত হয়। যেটি হলো গোষ্ঠী ও ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করা। আত্মহত্যা ও সামাজিক ঘটনা এই দুটি প্রত্যয়ের মধ্য পারস্পরিক যোগসূত্র আছে। আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা একটি নিতান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক আচরণ বলে প্রতীয়মান হলেও ফরাসি সমাজতত্ত্ববিদ এমিল ডুরখেইম এটিকে সামাজিক ঘটনা বলে প্রমাণ করেন। তার মতে, আত্মহত্যা হলো স্বেচ্ছাকৃত আত্মধ্বংস কিন্তু এই স্বেচ্ছাকৃত কর্মটির কারণ সমাজের তথা সামাজিক সংহতি বা সমাজের নৈতিক বিন্যাসের মধ্যে নিহিত। মোদ্দা কথা, ব্যক্তির নিজের দ্বারা সংঘটিত যে কোনো মৃত্যুই আত্মহত্যা।

ঘটনা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রথম ও প্রধান আলোচ্য বিষয়। আমেরিকার কলেজ ডিকশনারি উল্লেখ করেছে যে, ঘটনা হলো, 'হোয়াট ইজ রিয়েলি হ্যাপেন্ড'। ঘটনাকে 'গুড' এবং 'হাট' পর্যবেক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, 'ঘটনা কেবল একটি দৈবিক পর্যবেক্ষণ নয়; বরং তা কোনো বিষয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষাকৃত বিবৃতি। এ সমস্ত পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং প্রচলিত জ্ঞানের সঙ্গে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পর্কযুক্ত'। ঘটনা বস্তুগত বা দৈহিক, মানসিক বা আবেগীয়, সামাজিক বা পরিবেশগত ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে হতে পারে। একটি ঘটনার মধ্যে মূলত দুই বা ততোধিক বিষয়ের বা উপাদান ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান থাকে।

সার্বিকভাবে বিবেচনা করে বলা যায় যে, ঘটনা হচ্ছে দুটি প্রত্যয় বা ধারণা মধ্যেকার সম্পর্ক সম্বন্ধে একটি বিবৃতি।

 ডুরখেইম আধুনিক সমাজে আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে ভৌগোলিক, উত্তরাধিকার, মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক কারণ অপেক্ষা সামাজিক কারণ বা উপাদানের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তার মতে, সামাজিক জীবনে সংহতির স্বল্পতা ও গভীরতার ওপর আত্মহত্যা নির্ভরশীল। অন্য কথায়, ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে পার্থক্য যখন ব্যাপক, তখন ব্যক্তি আত্মহত্যা করে। আধুনিক মানুষ সাধারণত দুটো কারণে নিজেকে হত্যা করে।

প্রথমত, আধুনিক সমাজে সংহতির অভাব; দ্বিতীয়ত, সঠিক মূল্যবোধের অভাব। ব্যক্তির সঙ্গে সমাজ ব্যবস্থা নৈকট্যের মাত্রার ওপরে ওই ব্যক্তির আত্মহত্যার প্রেষণা নির্ভরশীল। ব্যক্তির অবস্থান যখন দুটি বিপরীত মেরুতে হয় তখন তার আত্মহত্যার প্রেষণা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ ব্যক্তি যখন অতীব ঘনিষ্ঠভাবে কিংবা অত্যন্ত ক্ষীণভাবে সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তখনই তার আত্মহত্যার প্রেষণা জাগে।


ব্যক্তির মধ্যে তিনটি কারণে আত্মহত্যা ঘটছে- আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা, পরার্থমূলক আত্মহত্যা, নিয়মনীতিহীন বা নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা।

আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা :সমাজ বা গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যক্তির সংহতির অভাব দেখা দিলে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা ঘটে। এ পর্যায়ে ব্যক্তি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সমাজের মূল্যবোধ ও নীতিমালা ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেতে পারে না। সমাজের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থায় ব্যক্তি সহজেই আত্মহত্যা প্রবণতা হতে পারে। যে সমাজে সংহতি কম থাকবে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যার প্রবণতা সে সমাজে বেশি হবে এবং সংহতি যতো বেশি থাকে এ ধরনের আত্মহত্যার প্রবণতা ততো কম দেখা যায়। বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিতদের মধ্যে, মহিলার চেয়ে পুরুষের মধ্যে, গ্রামবাসীর চেয়ে নগরবাসীর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। বিবাহিত ব্যক্তিরা স্বামী/স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে অবিবাহিতদের চেয়ে বেশি সম্পর্কযুক্ত থাকে; ফলে বিবাহিতদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যার প্রবণতা কম দেখা যায়। অন্যদিকে অবিবাহিত ব্যক্তিরা পরিবারের সঙ্গে সেইভাবে যুক্ত না থাকার ফলে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সমাজের নিয়ন্ত্রণমুক্ত অবস্থায় আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে অবস্থান লক্ষ্য করা যায়; শ্রম বিভাজনের ফলে নগরবাসীর মধ্যে সামাজিক সংহতির অভাব দেখা যার, ফল হিসাবে এ ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। তালাকপ্রাপ্ত অথবা বিধবা ও বিপত্নীক প্রভৃতি মহিলাদের চেয়ে বিপত্নীক (স্ত্রী মৃত বা তালাকপ্রাপ্ত) পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। একজন পুরুষ বিবাহের মাধ্যমে সমতা ও নিয়মকে মেনে নিলেও সামাজিক আচার-প্রথার কারণে সে কিছুট স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। একজন নারীকে বিয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতার চেয়ে নিয়মকেই বেশি প্রাধান্য দিতে হয়। ফলে তালাকপ্রাপ্ত অথবা বিধবা নারী বিবাহিত জীবনের চেয়ে পরবর্তীকালে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। সে কারণে তাদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে কম আত্মহত্যার হার লক্ষ্য করা যায়।

পরার্থমূলক আত্মহত্যা :আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যার সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী হচ্ছে পরার্থমূলক আত্মহত্যা। যেখানে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সংহতির অভাবে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা ঘটে সেখানে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের অতিরিক্ত সংহতির কারণে পরার্থমূলক আত্মহত্যা ঘটে। এ ধরনের আত্মহত্যা সাধারণত আমাদের নজর এড়িয়ে যায়, কেননা এখানে ব্যক্তি সমাজের স্বার্থে নিজেকে হত্যা করে থাকে। তার নিজেকে হত্যার মূল কারণই হচ্ছে সে সমাজের সঙ্গে অত্যধিক সংশ্নিষ্ট। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদান এমন আত্মহত্যার প্রকৃত উদাহরণ। মুক্তিযোদ্ধারা স্বজাতির মুক্তির লক্ষ্যে এবং স্বজাতির প্রতি দৃঢ় ভালোবাসার জন্য নিজের জীবনকে উৎর্সগ করে দিয়েছিলেন এবং অনেকেই এভাবে নিজেকে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করেননি। তাদের এই আত্মহত্যা ছিল এ দেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি অতিরিক্ত সংহতির ফল এবং সেজন্য একে পরার্থমূলক আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তাছাড়া বিভিন্ন সমাজ বা গোষ্ঠীর মধ্যে এই আত্মহত্যা দৃশ্যমান। (ক)    আদিম সমাজগুলোতে যখন একজন বৃদ্ধলোক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভশীলতা কমানোর উদ্দেশ্যে আত্মহত্যাকে বরণ করে অর্থাৎ গোষ্ঠীর কারণে তাকে আত্মহত্যা করতে হয়। (খ)    আধুনিক রাষ্ট্রে যে কোনো ধরনের যুদ্ধে সৈনিকদের মৃত্যু পরার্থমূলক আত্মহত্যা এবং এটি প্রায় বিশ্বজনীন। (গ)    প্রাচীন ভারতে একজন সদ্য বিধবা তার মৃত স্বামীর সঙ্গে একই চিতায় সহমরণে যেতে ইচ্ছুক থাকত। এখানে ব্যক্তির আলাদা কোনো সত্তা নেই, গোষ্ঠীর কাছে তার সত্তা বিলুপ্ত।

৩. নিয়মনীতিহীন বা নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা :আরেক ধরনের আত্মহত্যা হচ্ছে নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা। এ ধরনের আত্মহত্যা আধুনিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। নৈরাজ্য বলতে বোঝায় সমাজের আদর্শ বা মূল্যবোধহীনতা। অর্থাৎ নৈরাজ্যজনক বা বিশৃঙ্খল অবস্থায় সমাজের নীতি, আইন-কানুন, বিশ্বাস প্রভৃতি ভেঙে পড়ে এবং ব্যক্তির ওপর সমাজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কোনো ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ব্যক্তি নিজ নিজ ইচ্ছামাফিক আচরণ করে এবং এ অবস্থায় সংঘটিত আত্মহত্যাকে নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা বলা হয়। কোনো সমাজে যদি বিপ্লব সংঘটিত হয় তখন সেখানে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। যেমন, ফরাসি বিপ্লবের পরে ফরাসি সমাজে নৈরাজ্যমূলক অবস্থা সৃষ্টি হয়। আমরা যদি আমাদের দেশের দিকেই তাকাই তাহলে নৈরাজ্যমূলক অবস্থার সুন্দর উদাহরণ পাই।

অনিয়ন্ত্রিত বা উচ্ছৃঙ্খল যৌন জীবনযাপনের ফলে অবিবাহিত ব্যক্তিরা এক পর্যায়ে হতাশ ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। যুদ্ধবিগ্রহের সময় বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলায় সমাজ তার সদস্যদের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয় এবং এ সময় অনেকটা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে মানুষের গোষ্ঠীচেতনা বা সংহতি বৃদ্ধি পায়, যে কারণে অনেকই আত্মহত্যার চিন্তা করার অবকাশ পায় না। চরম আর্থিক সংকট বা মন্দার ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলার সূচনা হয়, যা ব্যক্তিবিশেষকে অনটন ও দুর্ভোগের হাত থেকে নিস্কৃতি লাভের জন্যে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়। আবার যখন হঠাৎ করে কেউ প্রভূত অর্থ-সম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠে তখন সে জীবনযাপনের প্রচলিত রীতি ও মান সহজে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু পরিবর্তিত আর্থিক বা বৈষয়িক মর্যাদার সঙ্গে নতুনতর জীবনযাপন রীতি ও মানের সম্বন্ধ ও সাঙ্গীকরণ যখন সম্ভব হয় না তখন অনেকেই আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। মূলত আত্মহত্যা সংঘটিত হবার প্রধান সমস্যা হলো সমাজ কাঠামো। এই আত্মহত্যা মানুষের সঙ্গে তার সমাজব্যবস্থার নৈকট্য ও বিচ্ছিন্নতার ওপর আলোকপাত করে। অন্যভাবে বলা যায় যে, আত্মহত্যার হার ও সামাজিক সংহতির দৃঢ়তার মধ্যে গভীর বিপরীত সহসম্বন্ধ বিদ্যমান। তাই সমাজে সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক দিকগুলো কার্যকরী করে সমাজ কাঠামে স্বীকৃত পন্থায় আচরণ করলে আত্মহত্যা হ্রাস পাবে।

যে সমাজে যত বেশি সামাজিক অস্থিরতা থাকবে ততো বেশি নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা ঘটবে এবং সামাজিক অস্থিরতা যত কম থাকবে এ ধরনের আত্মহত্যা ততো কম হবে। ইদানীং বাংলাদেশে বহু সংখ্যক মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হবার কারণে আত্মহত্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে আত্মহত্যার হার কমানো সম্ভব। আত্মহত্যা ব্যক্তি প্রপঞ্চ (ঘটনা) হলেও তার কারণ একান্তভাবেই সামাজিক। কিছু সামাজিক শক্তি রয়েছে, যার উৎপত্তি ব্যক্তি বিশেষ নয়; বরং গোষ্ঠীবদ্ধতা, যা পরিণামে ব্যক্তিকে আত্মহত্যার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।



মন্তব্য করুন