বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী বুঝতে পারছে না যে, এখন সময়টা এখন সংগ্রামের। সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আমাদের অনীহা! অপার বিস্ময়ে আমরা এসব কর্মকাণ্ড দেখেছি। একটা গাছাড়া ভাব সর্বত্র। হাটবাজার খোল, দোকানগুলো খুলে দাও- এসব নিয়ে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ। এসব করতে করতে রোজার ঈদ চলে এলো আমাদের ঘরে। আমরা রোজার ঈদ পার হয়ে এলাম। এর আগে সরকারিভাবে জানানো হয়েছিল, অফিসগুলো বন্ধ হলেও যে যার জায়গায় অবস্থান করবে। কে শোনে কার কথা! ঢাকা থেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে আপামর জনগণ ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ছুটে গেল। তারা বুঝেও বোঝেনি। লকডাউনের ভেতরেও রাস্তায় রাস্তায়, অলিগলিতে, মোড়ে মোড়ে, বাসস্ট্যান্ডে, ট্রেনে, ফেরিতে লোকে লোকারণ্য অবস্থা।

ভারতে করোনার যে ভয়াবহ মরণযজ্ঞ চলছে, সেই মরণযজ্ঞের করোনার চেহারাটার ধরন আবার আলাদা, যাকে বলা হচ্ছে 'ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট'। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই জাতীয় ভাইরাসের প্রকোপ নিয়ে ইতোমধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় প্রকাশ করেছে। এটা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বেশ তোড়জোড় চলছে। কিন্তু আমাদের এখানে একশ্রেণির মানবগোষ্ঠী এটা নিয়ে নানা মিথে জোকসে এবং ভাইরালে ব্যস্ত রয়েছে। ভারতে করোনার ব্যাপক দূরাচারের ভেতরেও বাংলাদেশের অগুনতি মানুষ সেখানে তাদের নানা কাজে গমনাগমন করেছে। অবশ্য চেকপোস্টগুলোতে সতর্ক নজরদারি বসানো হয়েছে। নিয়মিত আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাতে ফলাফল কতটুকু সেটা সময়ই বলবে। কেননা ভাইরাস ছড়াতে সময় লাগে না। আমরা জানতে পেরেছি, নতুন যে ভাইরাস আমাদের আশপাশে ঘাতকের মতো ছড়িয়ে আছে, তা একজন মানুষের এক হাঁচিতেই অন্তত ৪০০ জনের ওপরে আক্রান্ত করা সম্ভব! এগুলো কে ভাববে আর কে ভাবাবে? সে কারণে জনসচেতনতা খুবই জরুরি এখন। আর দরকার কঠোর সব পদক্ষেপ। পৃথিবীর বহু ধনী দেশ করোনার ছোবলে পড়ে তাদের অর্থনীতি, জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, চাপ সামলে উঠতে তাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। ভারতের মতো দেশ তাদের করুণ দৃশ্য দেখছি প্রতিদিন, ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আর আমরা এখনও এতটা স্বাবলম্বী নই যে, করোনার ভয়াবহ যে তাণ্ডব চলছে আর তার প্রকোপ যদি দোর্দণ্ডপ্রতাপে বাড়তে থাকে, তা আসলে সত্যিকারভাবে কতটা সামাল দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে। ভাবনার আরও যৌক্তিক কারণ আছে। রোজার ঈদ শেষ না হতে না হতে আবার এসে পড়বে কোরবানির ঈদ। গবেষকরা এরই মধ্যে মন্তব্য করেছেন আগামী জুন মাস থেকে বাংলাদেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ জাগার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা যৌক্তিক বলেও আমরা মনে করি।

রোজার ঈদ থেকে কোরবানির ঈদ মাঝখানে সময়ের ব্যবধান দু'মাস। অর্থাৎ ভয়াবহ সামাজিক মিশ্রণের সুযোগ তৈরি হবে। যারা গিয়েছিলেন গ্রামে তারা ফিরতে শুরু করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষত রাজধানী ঢাকায়। তারপর ক্লান্তি না ঘুচতেই আবার এসে গেল কোরবানির ঈদ। অতএব চলো চলো বাড়ি চলো। আর এরই মধ্যে যদি এসে যায় করোনার তৃতীয় ঢেউ ও ভারতীয় উন্নত সংস্করণ, তাহলে তো কথায় নেই, ষোলকলা পূণ হয়ে যাবে। সরকার বাহাদুররা যে এমনি করে আমাদের মতো ভাবছেন না, চিন্তা করছেন না এবং এসব চিন্তা তাদের মাথায় নেই, এটা অবশ্য ভাবা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে করোনা রোধে এখনই খুব যুতসই-টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের বুঝে আসে না, বোধে আসে না পৃথিবীর ভয়াবহ বিপর্যয়, পাশের দেশ ভারতের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়ে যাওয়ার পরও বাংলাদেশের মানুষের সামান্য একটি মাস্ক পরিধানে ব্যাপক দ্বিধা ও নির্লজ্জ মনোভাব এবং সামাজিক দূরত্ব মানতে ব্যাপক অনীহা, এ এক চরম অজ্ঞতার পরিচয়বাহী। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনযন্ত্রের কঠোর পদক্ষেপ জরুরি বলে অনুমিত হয়। পৃথিবীর পরিবেশ ফিরে আসুক, মানুষ বেঁচে থাকার শ্রেষ্ঠ স্থানটিতে পূর্ণ নিঃশ্বাস গ্রহণ করুক। কিন্তু মনে রাখার বিষয়, মানুষের পৃথিবীটাকে মানুষকেই রক্ষা করতে হবে আর সে ক্ষেত্রে বর্তমান যা করণীয় সেটাই করতে এবং নিয়মনীতি, সরকারিবিধি মানতে হবে। শুধু মেনে নেওয়াই নয়, মনেও নিতে হবে। প্রিয় পৃথিবীর কল্যাণ হোক। মানুষের সচেতনতা, আন্তরিকতা, ভালোবাসা, উদারতা, সহায়তা, দেশপ্রেম ও নিয়মানুবর্তিতার ভেতর দিয়ে করোনামুক্ত হোক জননী জন্মভূমি মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন