কভিড-১৯ মহামারির চলমান সময়ে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা উচিত বলে অভিমত দিয়েছেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সমকালের সঙ্গে আসন্ন বাজেট ভাবনা নিয়ে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ করা উচিত কর্মসংস্থান বিকাশের জন্য। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সমাজকল্যাণ খাতেও এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। বাকি এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত অন্যান্য কাজে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, করোনা মহামারি সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের এই সময়ে স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিতে হবে। যদি ব্যক্তি পুঁজিপতিদের দিয়ে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা দিয়ে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র গড়া হবে না, বরং বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দিতে হবে সামাজিক দায়িত্ববোধের বাজেট। সরে আসতে হবে লুটেরাতন্ত্রকে উৎসাহিত করার গতানুগতিক বাজেট থেকে। তিনি বলেন, করোনাকালীন পরিস্থিতিতে ডিজিটাল বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে। এ ধরনের সকল বৈষম্য দূর করার সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা বাজেটে থাকতে হবে।
একান্ত কথোপকথনে সিপিবি সভাপতি বলেন, দেশে বাজেট দেওয়া হচ্ছে নিউ-লিবারাল ক্যাপিটালিজম বা নতুন-উদারপন্থি পুঁজিবাদের দর্শনের ভিত্তিতে। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই দর্শনের আলোকে দেওয়া বাজেট দ্রুতগতিতে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়াচ্ছে, লুটপাটতন্ত্রকে উৎসাহিত করছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, উদার পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সব দেশেই এ ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব হচ্ছে আরও ভয়াবহ; জাতীয় বাজেটে এ ধরনের দর্শন দেশের বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচারের সহায়ক হয়ে উঠছে। ফলে বাজেটের দর্শনগত দিকটি আগে ঠিক করতে হবে। মূল দর্শনকে পাশ কাটিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি খাতের বাজেট বরাদ্দ কিংবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা করা হবে অর্থহীন। কারণ লুটপাটতন্ত্রভিত্তিক মূল নীতি না বদলালে বাজেট বরাদ্দ যেমনই হোক না কেন, তা লুটপাট হয়ে যাবে।
উদাহরণ দিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, মহামারিজনিত পরিস্থিতিতে সরকার তৈরি পোশাক খাতে প্রণোদনা দিয়েছে। সিপিবির পক্ষ থেকে এ প্রণোদনা সরাসরি গার্মেন্ট শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছিল। সরকার তা আমলে নেয়নি। প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে গার্মেন্ট মালিকদের। মালিকরা প্রথমেই সেখান থেকে একটা অংশ কেটে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শেষমেশ শ্রমিকরা এ প্রণোদনার কোনো সুফল পাননি। এই প্রণোদনা শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে পারেনি কিংবা করোনাকালীন তাদের বেতন কর্তন ও উপার্জন কমে যাওয়ার বিপর্যয় দূর করতে পারেনি। সরকার দরিদ্র মানুষকে সহায়তার জন্য যে অনুদান বা সহায়তা দিয়েছে, তারও অধিকাংশই বেহাত হয়ে গেছে বা সঠিক জায়গায় পৌঁছেনি। এর প্রধান কারণ হলো, যে নীতিগত অবস্থান থেকে বাজেট পরিকল্পনা ও প্রণয়ন করা হচ্ছে তা ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীগত লুটপাটের সুবিধা করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ এর থেকে কিছুই পাচ্ছে না। বরং করোনাকালে সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান আরও প্রকট হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে উদ্বেগজনক এবং আত্মঘাতীমূলক।
স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেশি বরাদ্দ কী সুফল নিয়ে আসবে, জানতে চাইলে এই প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ বলেন, করোনা মহামারি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্বনিয়োজিত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা। তাই আসন্ন বাজেটে এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ করা উচিত স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ও গতিশীল করতে, তরুণদের পুনর্বাসন ও বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য সহায়তা করতে। কারণ, দেশে রিকশাচালক, ছোট দোকানি কিংবা এ ধরনের ছোট ছোট পেশায় কর্মসংস্থানই বেশি ঘটে। তারাই অর্থনীতির একটা বড় ভিত্তি। অথচ এদের বিপর্যয় কাটানোর জন্য কোনো প্রণোদনা নেই। তারা কিন্তু নীরবেই টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। আপনি মহামারি ঠেকাতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখবেন-ঠিক আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ আরও দৃঢ় হতে হবে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। গতানুগতিক নীতিতে কর্মসংস্থানের জন্য কিছু পুঁজিপতির জন্য বরাদ্দ রাখা হলে, তারা নতুন বিনিয়োগ কিংবা শিল্প স্থাপন করে কর্মসংস্থান বাড়াবেন, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। সেটা বাস্তবে দেখা যায় না, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সেটা সম্ভবও নয়। বরং সেই বরাদ্দের সিংহভাগ নানাভাবে লুটপাট হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। কারণ পুঁজিপতিরা দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নয়, মুনাফার জায়গা থেকে চিন্তা করেন। তাই পুঁজিপতিরা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও সংকুচিত নীতি গ্রহণ করেন, যা এই করোনার সময়েও দেখা গেছে। এ কারণেই কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ যেন স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানে যুক্ত কর্মজীবীরা সরাসরি পান, সেটার ব্যবস্থা রাখতে হবে। না হলে করোনাকালে সৃষ্ট বিপর্যয় এবং বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে না।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, করোনা মহামারির সময়ে বাজেটে সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দকে প্রাধান্য দিতে হবে। সেই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, বরাদ্দ যেন অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কিংবা লুটপাটে শেষ না হয়ে যায়। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যতই দেওয়া হোক, সেটা মানুষের কাজে আসছে না, বরং দুর্নীতিতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে- তা দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই স্বাস্থ্য খাতে জড়িত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যতই বাড়ানো হোক, তা অর্থহীন হয়ে যাবে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে গত এক বছরের শিক্ষা পরিস্থিতির দিকে নজর দিতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, করোনা পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্যও বেড়েছে। অনেক কিছুই অনলাইনে হচ্ছে। অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। কিন্তু দেখা দরকার, শিক্ষার্থীদের কতজন এই অনলাইন শিক্ষার সুযোগ নিতে পারছে। কতজন ডিজিটাল ডিভাইস এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করার মতো সামর্থ্য রাখে। এই মহামারিতে সাধারণ মানুষের সামর্থ্য আরও কমেছে। ফলে শহরাঞ্চলে সামর্থ্যবানরা ইন্টারনেটের ব্যবহার ও ডিভাইসের ব্যবহার বাড়ালেও দরিদ্র মানুষ আগে যতটুকু ব্যবহার করত, সামর্থ্য কমে যাওয়ায় এখন সেটুকুও করতে পারছে না। ফলে গত এক বছরে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মূলত অনলাইন শিক্ষা সুবিধার বাইরে রয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের সুলভমূল্যে ইন্টারনেট কিংবা ডিভাইস ব্যবহারের সুবিধার আওতায় আনার কোনো সরকারি উদ্যোগ কিংবা ব্যবস্থা এখনও নেওয়া হয়নি। বরং গত বাজেটে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে কর বাড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, করোনাকালে ই-কমার্সের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বড় বিনিয়োগের ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়েছেন। কিন্তু ছোট দোকানিরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ডিজিটাল সুবিধা দিয়ে টিকিয়ে রাখার কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। বাজেটেও এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
সব মিলিয়ে বাজেট গণমুখী করার বিকল্প নেই- এ কথা জানিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, করোনার সময়ে বৈষম্য কমানোর নীতি অনুসরণ করে বাজেট প্রণয়ন না করা হলে তা আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

বিষয় : সাক্ষাৎকার: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

মন্তব্য করুন