স্বাদে ও গন্ধে ইলিশ অতুলনীয়। ইলিশ মূলত নোনাপানির, অর্থাৎ সাগরের মাছ। সাগরে যে ইলিশ ধরা পড়ে তা দেশের সর্বত্র সবার কাছে পৌঁছে না। প্রজননের সময় নদীতে আসে এবং জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ে। আর ওই সময়ই দেশের সব অঞ্চলে কম-বেশি ইলিশ পাওয়া যায়। দাম বেশি হওয়ায় অনেক সময় সবার পক্ষে ইলিশ কেনা সম্ভব না হলেও ইলিশের স্বাদ পরখ করার চেষ্টা সবারই থাকে। নদীর মধ্যে পদ্মার ইলিশ সেরা। এজন্যই ক্রেতারা ইলিশ কেনার সময় বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করেন, 'চাঁদপুরী বা চানপুরী ইলিশ কিনা।'

সাগর থেকে ইলিশ নদীতে আসে আর নদীর ইলিশের কথা সবারই জানা। কিন্তু হাওরেও ইলিশ পাওয়া যায়- এটা কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা বাস্তব। কয়েক বছর ধরে বৃহত্তর সিলেটের হাকালুকি হাওরে যে ইলিশ মিলছে, তা অনেকেই ইতোমধ্যে জেনে গেছেন। সাগর কিংবা নদীর ইলিশ হাওরে পাওয়া গেলে তা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, ইলিশ কীভাবে হাওরে এলো।

আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেটে আগাম বন্যা হয়। এ বন্যায় বোরো ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়। পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় অন্যান্য হাওরের মতো হাকালুকি হাওরও প্লাবিত করে। এই ঢলের পানি হাকালুকি হাওর থেকে কুশিয়ারা নদী দিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়। সময়টা ইলিশের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় পানির স্রোত ধরে মেঘনা নদী থেকে ইলিশ উজানে ছুটতে থাকে এবং কুশিয়ারা হয়ে বেশকিছু ইলিশ হাওরে ঢোকে। দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় সম্ভবত পানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় ইলিশ হাওরেই থেকে যায়। ২০১৬ সালে কিছু ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়েছে। এর আগে অন্যান্য বছর হাতেগোনা কয়েকটি ইলিশ ধরা পড়েছে। ২০১৭ থেকে অদ্যাবধি হাকালুকি হাওরে মোটামুটি ভালো পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয়রা এই ইলিশের নাম দিয়েছে 'হাকালুকি ইলিশ'। অনেকে আবার 'হাওরি ইলিশ' বলে থাকেন। বর্ষা ও শরৎকালেই হাওরে এই ইলিশ পাওয়া যায়।

মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলায় অবস্থিত হাকালুকি হাওরের আয়তন প্রায় ১৮৩৮৬ হেক্টর। ২৩৮টি আন্তঃসংযুক্ত বিল হাওরে রয়েছে। কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইলের কাছে চকিয়া বিলে ইলিশের বিচরণ বেশি লক্ষ্য করা গেছে। আরও কয়েকটি বিলেও ইলিশ দেখা যায়। হাওরের গভীর অংশে ইলিশের বিচরণ বেশি। পদ্মায় পানি বাড়লে ইলিশ মেঘনা নদী থেকে কুশিয়ারা হয়ে হাকালুকি হাওরে ঢোকার সময়ে জালের আকারভেদে প্রতি টানে ৪০ থেকে ৫০টি, কখনও ৬০ থেকে ৭০টি ইলিশও ধরা পড়ে। রাতে জেলেদের জালে অন্যান্য মাছের সঙ্গে বেশি ধরা পড়ে ইলিশ। দিনের বেলায়ও ধরা পড়ে। বেশিরভাগ ইলিশের ওজন ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম। কিছু ইলিশের ওজন ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রামের মতো।

মাঝেমধ্যে এক কেজি ওজনের ইলিশও পাওয়া গেছে। হাওরে ইলিশ ধরার কথা জেলেরা স্বীকার করে না, ধৃত মাছও দেখাতে চায় না। কারণ, তাদের ভয় প্রশাসন ইলিশ ধরা এমনকি মাছ ধরাও বন্ধ করে দিতে পারে। এজন্য জেলেরা লুকিয়ে জাল দিয়ে ইলিশ ধরে। বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন মাছের বাজারে মাঝেমধ্যে 'হাওরি ইলিশ' দেখা যায়। বেশি দেখা যায় কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জসহ হাওরের আশপাশের ছোট-বড় বিভিন্ন বাজারে। কুলাউড়ার আছুরিঘাট, ঘাটের বাজার, ভুয়াই বাজার, মিরের শংকর, ভুকশিমইল বাজারে এবং বড়লেখার কানুনগো বাজারে জেলেরা ইলিশ বিক্রি করে যায়।

ইলিশ নোনাপানিতে বসবাসের জন্য বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে অভিযোজিত। শুধু প্রজননকালে মিঠাপানিতে আসে। বংশ বৃদ্ধির সময়ে মিঠাপানিতে অভিস্রবণিক চাপের সমতা রক্ষা করে থাকে। হাওরও মিঠাপানির আবাস। এই আবাসে কী কী বৈশিষ্ট্যের কারণে ইলিশ টিকে থাকছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে জেনেটিক মডিফিকেশনের মাধ্যমে হাওরের আবাসকে ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে রুপালি ইলিশে সোনালি সম্ভাবনার বিপ্লব ঘটতে পারে। এজন্য মৎস্য গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। গবেষণার প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে অবকাঠামোগত ও আর্থিক সহযোগিতাও করতে হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মা ইলিশ যে নদীতে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ইলিশ যেখানে বড় হয়, পরিণত অবস্থায় তারা সমুদ্র থেকে সেই নদীতেই ফিরে আসে। অন্য কোনো নদী বা জলাশয়ে যতই অনুকূল পরিবেশ থাকুক না কেন, তারা জন্মস্থানেই ফিরে আসে (২০১৮-১৯ বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ওয়ার্ল্ড ফিশ)। হাওরের পরিবেশে ইলিশ যদি ডিম ছাড়ে ও বাচ্চা হয় তাহলে পরবর্তীতে এই বাচ্চারা পরিণত অবস্থায় আবার হাওরে ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি। হাওরের ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণ পদ্মার ইলিশের মতো না হলেও তাজা ইলিশ হওয়ায় অনেকের কাছেই পছন্দ।

ইলিশ রক্ষায় সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে বর্তমান বিশ্বের ৮৬% ইলিশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে (ওয়ার্ল্ড ফিশ ২০২০)। হাকালুকি হাওর ছাড়াও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অনেক হাওর রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাওর হচ্ছে- টাঙ্গুয়ার হাওর, দেখার হাওর, শনির হাওর, নলুয়ার হাওর, গুঙ্গিয়াজুড়ী হাওর, শৌলাগড় হাওর, মকার হাওর, কাউয়াদিঘি হাওর ইত্যাদি। নদীর পাশাপাশি হাওরে ইলিশকে অভিযোজিত করাতে পারলে হাওরি ইলিশের বিপ্লব ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তখন বিশ্বের প্রায় শতভাগ ইলিশ উৎপাদনই বাংলাদেশে সম্ভব হতে পারে।

হাওরে ইলিশ প্রাপ্তির সম্ভাবনায় করণীয় :

১. জরুরি ভিত্তিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরের বিলগুলো খনন করা। এতে পানি ধারণক্ষমতা বাড়বে ও ইলিশের আবাস গড়ে উঠবে।

২. বিল শুকিয়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।

৩. ইলিশের পছন্দের খাবারের জোগান হাওরে দিতে হবে।

৪. ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা বন্ধ করতে হাওরে বেশি নজরদারি করা।

৫. নিষিদ্ধ কাঁথা জাল, কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ করা।

৬. হাওরের অপ্রয়োজনীয় বাঁধ অপসারণ।

৭. ফেঞ্চুগঞ্জের বুড়ি কেয়ারি বাঁধ অপসারণ।

৮. কুশিয়ারা নদীসহ অন্যান্য নদনদী পুনঃখনন।

সর্বোপরি হাওরগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। এতে ইলিশের আবাস গড়ে ওঠার পাশাপাশি দেশি নানা প্রজাতির মাছবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হবে হাওর অঞ্চল তথা বাংলাদেশ।