করোনার প্রথম ঢেউয়ের শেষ মুহূর্তে সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর হার কমছে দেখে আশা জেগেছিল, সম্ভবত আমরা ধীরে ধীরে এর কঠিন ছোবল থেকে রক্ষা পেতে যাচ্ছি। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আবার তার নিজ গতিতে ছুটে চলল সবকিছু উপেক্ষা করে। জোর দিয়েই বলা যায়, এই সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য মূলত আমরাই দায়ী। দায়ী আমাদের সেই শ্রেণির মানুষগুলো, যারা করোনাকে সবসময় উপেক্ষা করেছে, স্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছে- বুক ফুলিয়ে মাস্ক ব্যবহার না করে অবাধে চলাফেরা করেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনোরকম তোয়াক্কা করেনি কোনোভাবেই। তাদের এ উপেক্ষা ও অবহেলায় এ চিত্র আমাদের আবার দেখতে হচ্ছে। যে কোনো অনুষ্ঠান, আন্দোলন, বিক্ষোভ করাতেও কোনোরকম বাধা ছিল না; সবকিছু চলেছে স্বাভাবিক গতিতে।

করোনা সংক্রমণ রোধে মাত্র তিনটি নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক। এক. সঠিক মানের মাস্ক পরা, ২০ সেকেন্ডব্যাপী ঘন ঘন হাত ধোয়া এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলা। এ তিনটি নিয়ম মেনে চলা কি খুব কঠিন? শেষের নিয়মটি অনেক সময় এবং অনেক ক্ষেত্রে মেনে চলা একটু কঠিন হলেও বাকি দুটি তো কঠিন নয়! এক শ্রেণির মানুষ তো খুবই গর্বের সঙ্গে মুখে মাস্ক না দিয়ে দিব্যি রাস্তাঘাটে চলাফেরা করছে। অনেকে মাস্ক ব্যবহার করলেও তা থুতনিতে ঝুলিয়ে কিংবা পকেটে ভরে কিংবা হাতে নিয়ে হেঁটে বেড়ায়। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বালাই নেই। তারা যেন বুঝতেই চায় না, এতে সাহসের কিছুই নেই- এটা সচেতনতা, বেঁচে থাকার সহজ ঠিকানা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত এসব স্বাস্থ্যবিধি আমাদের অবশ্যই মেনে চলা প্রয়োজন।

অনেকেই বুঝতে চান না সামান্য অবহেলায় বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। করোনা চলাকালীন হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ করে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা কতটুকু যৌক্তিক? আবার এসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুরসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে!

করোনা সংক্রমণ রোধে লকডাউন দিয়ে মানুষকে আর ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না। মানুষের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেকেই নির্ভর করে দৈনিক আয়ের ওপর। কাজ করতে না পারলে তারা খাবে কী? করোনার প্রথম ধাক্কায় অনেকেই অনেক কিছু হারিয়েছে, নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে। তাই সবকিছুরই একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অবশ্যই থাকা দরকার। এক্ষেত্রে সরকারের ভ্যাকসিন কার্যক্রম অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ভ্যাকসিনের সুবিধা যেন সবাই সহজভাবে পেতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যেন মজুদ থাকে সে ব্যাপারে সরকারের জোরালো উদ্যোগ অবশ্যই থাকতে হবে।

আমরা সবাই তাকিয়ে আছি সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়। এ ক্ষেত্রে সচেতনতার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া স্বাস্থ্যবিধিগুলো সবার মেনে চলা আবশ্যক। করোনায় আক্রান্তকারীরা যেন হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে না আসে এবং অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে না পড়ে, সে ব্যাপারে সরকারের যথাযথ ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজন হলে আরও হাসপাতাল ও বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে যেন কোনো দুর্নীতি কিংবা অবহেলা না হয়, সেদিকে সচল দৃষ্টি রাখতে হবে। সম্প্রতি ভারতে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে যেন আমরা সহজে শিক্ষা নিতে পারি। আপনার-আমার সামান্য সচেতনতাই করোনাকে জয় করতে পারবে সহজে- বাঁচাতে পারবে নিজেকে, পরিবারের সবাইকে এবং পুরো দেশকে।