জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত যে, দারিদ্র্য ও প্রান্তিকীকরণের মতো সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। 

দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবিক উন্নয়ন এবং বৈষম্য হ্রাসে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি তার জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্রের (এনএসএসএস ২০১৬-২০২১) মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। একটি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্টম্ন বাংলাদেশের 'দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা' তথা 'রূপকল্প ২০৪১' এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ২০২০-২০২৫-এও তা প্রতিফলিত হয়েছে। তবুও কয়েক দশক ধরে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নগত দুর্বলতার কারণে লক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবনে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব তৈরি করতে পারছে না।

গত এক দশকে বাংলাদেশ প্রভূত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করতে পেরেছে। তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি সত্ত্বেও দারিদ্র্য দূরীকরণ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, বিশেষত দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বছর বাংলাদেশের জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্রের (এনএসএসএস ২০১৬-২০২১) কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শেষ বছর এবং এই মুহূর্তে সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য নতুন বাজেট প্রণয়নের কাজও করছে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির (এসএসপি) বাস্তবায়ন কৌশল এবং তার দুর্বলতা উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনার এটাই উপযুক্ত সময়।

করোনা মহামারিকালে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখা এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য ৯৫,৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা মোট বাজেটের ১৬.৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.০১ শতাংশ। ২০১৬ সালে সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ১ কোটি ১০ লাখে উন্নীত করেছে। যার ফলে এই কর্মসূচির সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা ২০১০ সালের ২৪.৫ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ২৭.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে, উপকারভোগী পরিবারগুলোর এই সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে অতিদরিদ্র জনসংখ্যার সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভৌগোলিক বিভাগে বয়স্ক ভাতা কিংবা বিধবা ভাতার মতো স্থায়ী পরিষেবাগুলোও বিভাগগুলোতে এই জাতীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যার অনুপাতে বরাদ্দ করা হয় না।

দেখা গেছে, রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার সর্বাধিক হলেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সর্বোচ্চ বরাদ্দ রংপুর বিভাগ পায়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রস্তুতকৃত 'খানা আয় ও ব্যয়ের জরিপ ২০১৬' (রিপোর্ট প্রকাশ ২০১৯) অনুসারে, নারী প্রধান অতিদরিদ্র পরিবার বা খানাগুলোর (বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত নারী পরিবার) জন্য প্রদত্ত পরিষেবাও বিভাগ অনুযায়ী তাদের প্রকৃত সংখ্যার অনুপাতে বিতরণ করা হয় না। বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, রংপুর বিভাগে ৪.২০ শতাংশ পরিবার বিধবা বা দুস্থ নারীর ভাতা পেয়েছে; এই সংখ্যা একদিকে রংপুর বিভাগের প্রকৃত বিধবা ও দুস্থ নারীর পরিবারের সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। অন্যদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে যদিও তুলনামূলক কম দরিদ্র মানুষ বাস করে, তবুও সেখানকার যথাক্রমে ৬.৭২ শতাংশ এবং ৫.৭৬ শতাংশ নারীপ্রধান পরিবার ওই পরিষেবাগুলো পেয়েছে। বিভাগ অনুযায়ী একই রকম বৈষম্য দেখতে পাওয়া যায় বয়স্ক ভাতা এবং মাতৃত্বকালীন পরিষেবার ক্ষেত্রেও। রংপুর বিভাগে বয়স্ক ভাতা গ্রহণকারী পরিবারের হার হলো ১৪.২২ শতাংশ, কিন্তু চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে যথাক্রমে ১৬.১৯ ও ২০.৬৭ শতাংশ। আঞ্চলিক বরাদ্দ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বৈষম্য শুধু দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের পথে অন্তরায় নয় বরং তা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাগুলো তুলনামূলকভাবে কম দরিদ্র পরিবারগুলো পেয়ে থাকে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামাঞ্চলে বহু সম্ভাব্য উপকারভোগীর সঙ্গে আলাপে এমনটা জানা গেছে যে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সেবাগুলো সত্যিকারের যোগ্য পরিবার বা ব্যক্তির পরিবর্তে অনেক সময় তা দরিদ্র নয় এমন পরিবারগুলো পায়। জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলের (এনএসএসএস ২০১৬-২০২১) কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নবিষয়ক মধ্যবর্তী পর্যালোচনাতেও (মিডটার্ম রিভিউ) এরূপ বিশ্নেষণ করা হয়েছে যে, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধাভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভুল ব্যক্তি বা পরিবার নির্বাচনের হার (মিস টার্গেটিং) অনেক বেশি। খানা আয় ও ব্যয় ২০১৬ জরিপের তথ্য ব্যবহার করে উপরোক্ত মধ্যবর্তী পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সেবা পাওয়ার যোগ্য প্রায় ৭১ শতাংশ পরিবার বাদ পড়ে যাচ্ছে। অন্য কথায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সেবা পাওয়ার যোগ্য প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অতিদরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবার এই সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভুল বা অযোগ্য পরিবার অন্তর্ভুক্তির হার কর্মসূচিতে মোট অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৬.৫ শতাংশ। অর্থাৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সেবা গ্রহণকারী পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই তা পাওয়ার যোগ্য নয়। তার মানে দাঁড়ায়, যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভুল বা অযোগ্য পরিবারের অন্তর্ভুক্তি রোধ করা যায়, তবে এই কর্মসূচির সামগ্রিক বাজেট না বাড়িয়েও যোগ্য উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচনের নিয়ম অনুযায়ী ইউনিয়নভিত্তিক বাছাই কমিটিগুলোতে স্থানীয় নাগরিক সমাজের দু'জন প্রতিনিধি থাকার কথা, যারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত বা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় নাগরিক সমাজের এই প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলীয় অধিভুক্তি প্রাধান্য পায়। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি মনোনয়ন ও নির্বাচনও দলীয় রাজনীতির বিবেচনায় হওয়ায় এ অবস্থা আরও জটিল হয়েছে। যার ফলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপকারভোগী বাছাই প্রক্রিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়। যোগ্য পরিবারগুলো বাদ পড়ে আর অযোগ্য পরিবারগুলো অন্তর্ভুক্ত হয় বিভিন্ন পরিষেবার তালিকায়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী বাছাই ও নির্বাচিত তালিকা-সংক্রান্ত তথ্য সাধারণত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে না। এটা দেখা যায়, এই জাতীয় পরিষেবার তালিকা কখন প্রস্তুত হয় সে সম্পর্কে স্থানীয় দরিদ্র বা অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর তা জানা থাকে না। উপরন্তু প্রস্তুতকৃত তালিকা ইউনিয়ন পরিষদের জনসমাগমস্থলে খুব কমই প্রদর্শন করা হয়, যা দেখে স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের মতামত দিতে পারে।

রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও এনজিওকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে :

১. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপকারভোগী বাছাই পদ্ধতি, বাছাই সভার সভাস্থল ও সময় সম্পর্কিত সব তথ্য উন্মুক্ত করা এবং তা সংশ্নিষ্ট ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের অবহিত করা।

২. বিদ্যমান নীতিমালায় স্থানীয় পর্যায়ের উপকারভোগী বাছাই কমিটিতে (ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে) উপকারভোগীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধিসহ অত্র এলাকায় কর্মরত বেসরকারি সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৩. বয়স্ক ভাতার উপকারভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বয়সের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্রকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে অসংখ্য ব্যক্তির ভুল বয়স লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যার সংশোধন প্রক্রিয়া দরিদ্র ও বয়স্ক ব্যক্তির জন্য ব্যয়বহুল ও কঠিনতর। বয়সের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে শুধু এনআইডিকে বিবেচ্য না ধরে ব্যক্তির অন্যান্য দলিল বা তথ্যকেও বিবেচনায় নেওয়া এবং একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল সংশোধন প্রক্রিয়া সহজ ও সুলভ করা।

৪. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নির্বাচিত উপকাভোগীদের সব রকম তালিকা স্থানীয় সেবাদানকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংশ্নিষ্ট ইউনিয়নের জনসমাগম স্থলে প্রদর্শন করা এবং একই সঙ্গে তা ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবাদান করছে এমন সব সরকারি-বেসরকারি দপ্তর বা সংস্থাগুলোতে প্রদানের ব্যবস্থা করা।

৫. উপকারভোগী নির্বাচনে অনিয়মের ক্ষেত্রে ইউপিতে 'অভিযোগ বা পরামর্শ বপ' স্থাপন করা এবং সংশ্নিষ্ট সবার উপস্থিতিতে উত্থাপিত অভিযোগ আলোচনা করা ও অভিযোগের গুরুত্ব অনুসারে অবস্থার উন্নতির জন্য কার্যকর উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৬. আঞ্চলিক দারিদ্র্যের হার ও জনমিতির বৈশিষ্ট্যের আলোকে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর বণ্টন ও বরাদ্দ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

৭. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা নিরূপণের ভিত্তিতে বরাদ্দ নিশ্চিত করা। স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা নিরূপণের কাজে স্থানীয় নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংস্থা ও উপকারভোগীর প্রতিনিধিদের যুক্ত করা।

৮. নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সেবার জনপ্রতি ভাতার (টাকার) পরিমাণ এমনভাবে বাড়ানো যা দরিদ্র উপকারভোগীদের জীবন ধারণের নূ্যনতম ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট হয়।

৯. অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর ডাটাবেজ প্রস্তুত করা ও তা নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং সেই ডাটাবেজের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্ভাব্য উপকারভোগীদের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা।

১০. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সব স্তরের দুর্নীতি রোধে সরকারি ও প্রশাসনিক স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা, কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এ কাজে স্থানীয় নাগরিক সমাজকে যুক্ত করা।

১১. বিদ্যমান ধরনের মাসোহারাভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা সেবা প্রদান ছাড়াও দরিদ্র পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে এমন সহায়তা প্রদান করা।

করোনা মহামারির এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ যখন তার নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ করছে, তখনও প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে চলমান বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসায় স্থবিরতার ফলে অতিদরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জীবন ও জীবিকা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে সুসংহত করে তার দ্বারা অতিদরিদ্র মানুষের জীবনকে সুরক্ষিত করা জরুরি এই মুহূর্তে।

বিষয় : জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা

মন্তব্য করুন