লাল টি-শার্ট, গাঢ় নীল রঙের শর্টস আর পায়ে কালো জুতো পরা সমুদ্রতীরে পড়ে থাকা সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির নিষ্প্রাণ দেহের ছবিটির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে ! এই ছবিটি সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে সাড়া ফেলেছিল, কাঁদিয়েছিল সমগ্র বিশ্বকে। ছবিটি ইউরোপের অভিবাসী সংকটকে প্রথমবারের মতো বিশ্ব আলোচনার শীর্ষে নিয়ে আসতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়া থেকে আয়লানের পরিবার প্রথমে তুরস্ক, পরবর্তীকালে ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর তুরস্ক থেকে নৌকায় ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টার সময় বোদরুম শহরের কাছে আকিয়ারলার সমুদ্রসৈকতে দুর্ঘটনার শিকার হয়। অন্তিম যাত্রায় পাড়ি জমায় আয়লান।

পৃথিবীর কিছু রাষ্ট্রের বা মানুষের নৃশংসতা, যুদ্ধ, হানাহানি, রাহাজানির কারণে প্রায় প্রতি মিনিটে পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে একজন করে হলেও মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে যাচ্ছে, দেশান্তরিত হচ্ছে, জীবন-জীবিকার তাগিদে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার-ইউএনএইসসিআরের ২০২০ সালের তথ্য মতে, 'মধ্য ২০২০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ৮০ মিলিয়ন (৮ কোটি) মানুষ উদ্বাস্তু। যার মধ্যে ৪৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন আশ্রয়প্রার্থী, ২৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষ শরণার্থী এবং ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ভেনেজুয়েলানরা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। মাত্র পাঁচটি দেশ, যেমন- ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন সিরিয়ান, ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ভেনেজুয়েলান, ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান থেকে ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন এবং ১ মিলিয়ন মিয়ানমার থেকে সারা বিশ্বের উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। মধ্য ২০১৯ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে, তার ৩৮-৪৩ শতাংশ শিশু (আঠারো বছরের নিচে), যার মোট পরিমাণ ৩০-৩৪ মিলিয়ন। এছাড়াও, ৭৯টি দেশে প্রায় ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। তবে, এর সঠিক পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।' এই পরিসংখ্যানের পেছনে সশস্ত্র সংঘাত, সাধারণ সহিংসতার বিষয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট দুর্যোগের বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

বর্তমানে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিয়ানমার, ভেনেজুয়েলা, আফগানিস্তান, সুদানের মতো রাষ্ট্রের জনগণের উদ্বাস্তু হওয়ার পেছনে যুদ্ধ বা সংঘাত সবচেয়ে বেশি দায়ী। তবে, বর্তমানে যুদ্ধ বা সংঘাতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উদ্বাস্তু হওয়ার সম্ভাবনা তীব্রতর হচ্ছে। বর্তমানে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া, খরা, লবণাক্ততার বৃদ্ধি, নদীর নাব্য হ্রাস, নদীভাঙনের ফলে এই সম্ভাবনার বাস্তব চিত্র ক্রমান্বয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। একুশ শতকের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে জলবায়ু শরণার্থী বিষয়টি মানবজাতির জন্য বিরাট সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ রাষ্ট্রের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট মানবজীবনের সংকট মোকাবিলা করা বিরাট চ্যালেঞ্জ।

প্রতি বছর বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকাসমূহ ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর কী পরিমাণ মানুষ তার ঘরবাড়ি হারিয়ে দেশান্তরিত হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান কারও জানা নেই। এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস ফাউন্ডেশনে (ইজেএফ) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এর ভয়াবহতা কিছুটা হলেও লক্ষ্য করা যায়। ইজেএফ-এর তথ্য মতে, 'বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ উপকূলবর্তী অঞ্চলে বাস করে। ২০৫০ সালের মধ্যে যদি সমুদ্রের উচ্চতা ৫০ সেন্টিমিটার বেড়ে যায় এ উপককূলের প্রায় ১১ শতাংশ জমি বিলীন হয়ে যাবে, প্রায় ১৫ মিলিয়ন (১ দশমিক ৫ কোটি) মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই ভোগান্তির শিকার হবে। পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ার ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৩৩ মিলিয়ন মানুষ এই ভোগান্তির শিকার। বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে উপকূলের মানুষ ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগ, বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি, চর্মরোগের মতো ব্যাধির সম্মুখীন হচ্ছে। এই সমস্ত বিষয় উপকূলের মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি, শ্যামনগর উপজেলা এবং খুলনা জেলার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ সারা বছর পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ১০ বছর আগেও অনেক এলাকা ছিল যেখানে ফসল এবং মাছ চাষ উপযোগী ছিল, তা এখন পানিতে বিলীন। এমনকি, বর্তমানে জোয়ারের পানির বাড়ার ফলে অনেক লোকালয় পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে আয়ের উৎস, ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানির উৎস, স্বাস্থ্যব্যবস্থা। মানুষের জন্য ক্রমান্বয়ে এই এলাকাগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেকের ঘরবাড়ি বিলীন ও ধ্বংসপ্রাপ্তের ফলে তারা বাধ্য হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন উঁচু জায়গায় বিশেষ করে রাস্তার পাশে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনির নদীর তীর, বেড়িবাঁধ এবং রাস্তার পাশে প্রায় ১৫-২০ লাখ মানুষের বসবাস করছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২১ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কবলে পড়ে কী পরিমাণ মানুষ বসতবাড়ি এবং আয়ের উৎস হারিয়েছে তা বলা দুস্কর। উপকূলবর্তী বিভিন্ন এলাকায় যেমন- সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের হরিষখালী, কুঁড়িকাহুনিয়া, সুভদ্রকাটি অঞ্চল, শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পশ্চিম পাতাখালী, খুলনার কয়রা উপজেলার আংটিহারা এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে, যা উপকূলের মানুষের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ তৈরি করেছে। অনেকে বাধ্য হয়েছেন ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে। এই সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।

প্রতি বছর পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের ফলে হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। উদ্বাস্তু হয় অসংখ্য মানুষ। সাধারণত, বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙনের রূপ তীব্রতর হয়ে ওঠে। ইজেএফ-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি ভাঙনের ফলে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। প্রতিদিন ১-২ হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমায় বসবাসের এবং জীবিকার জন্য। যাদের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ আশ্রয় নেয় বিভিন্ন বস্তিতে। ২০২০ সালে গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) জানায়, 'এ বছর নদীভাঙনে ২ হাজার ৩৬৫ হেক্টর এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ১৬টি এলাকার প্রায় ২৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হবে।' এই বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর বাস্তুহারা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের পথে বিরাট অন্তরায়।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অগ্রগতির জন্য পৃথিবীর বুকে মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচকের বিভিন্ন রিপোর্টে বাংলাদেশের অগ্রগতি সারাবিশ্বের কাছে উদাহরণ। তবে জলবায়ু শরণার্থীর (ক্লাইমেট রিফিউজি) সংখ্যা বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য অনেক উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মতো একুশ শতকে পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা করা সারাবিশ্বের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী ক্রমাগত কার্বন নিঃসরণ, বন উজাড়, পাহাড় ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ডের ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তচ্যুত হয়ে পড়ছে। এখনই সময়, বিশ্বের সকল রাষ্ট্রকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করা। বাংলাদেশসহ একুশ শতকের পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রকে জলবায়ু শরণার্থী বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে সমগ্র বিশ্বের মানবজাতির জন্য পরিবেশ হয়ে উঠবে আরও বেশি বিপজ্জনক ও ভয়ংকর।