৩ জুন তারিখে প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট। বাজেট প্রণয়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে সবার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত করা দুরূহ কাজ। এই দুরূহ কাজটি তখনই সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, যখন সময়োপযোগী উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং কৌশল নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। সঠিক লক্ষ্য এবং উপযুক্ত কৌশল হলে বাজেট সিলভার বুলেটের মতো কাজ করে সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে, সবার চাহিদা পূরণ করে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়; সমৃদ্ধ করে। এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা অতিমারির মধ্যে।

গত বছরের মার্চ মাস থেকে সমগ্র পৃথিবীর মতো বাংলাদেশের ওপর চলছে করোনাভাইরাসের উপর্যুপরি আক্রমণ। করোনার আক্রমণের মধ্যে কেটে গেছে পনেরো মাস। এ পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে আট লাখের বেশি মানুষ; মৃত্যু হয়েছে প্রায় তেরো হাজার; কাজ হারিয়েছে কয়েক কোটি; ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে কয়েক লাখ; দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। দেশবাসী পায়নি উপযুক্ত করোনা চিকিৎসা। হাসপাতাল তথা সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা আর সেইসঙ্গে বেশুমার দুর্নীতি চলে এসেছে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে। তাছাড়া রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে বেড়ে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্য। এমন পরিস্থিতিতে এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে সামাজিক ও আইনি পদক্ষেপ; বাস্তবে তা হয়নি।

করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে বা আয় কমে দরিদ্র হয়েছে প্রায় তিন কোটি মানুষ। আরও তিন কোটি দরিদ্র এবং হতদরিদ্র করোনার আগে থেকেই ছিল। নতুন দরিদ্রের মধ্যে ১ দশমিক ৩৫ কোটি মানুষ করোনার কারণে কাজ হারিয়েছে; বাকিদের আয় কমেছে। এসব মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য; আয় বৃদ্ধির জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বাজেটে। যাদের সহসা কর্মসংস্থান সম্ভব নয়, তাদের জন্য দরকার নগদ সহায়তা। যদিও ৭,৩০০ কোটি টাকার একটি তহবিল করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এই বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে তবে তা কারা পাবে, কীভাবে দেওয়া হবে সে বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। গত বছর ঈদে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারের জন্য পরিবারপ্রতি এককালীন দুই হাজার টাকা বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা সাফল্যের মুখ দেখেনি। তিন কোটি নতুন দরিদ্রের মধ্যে ৭,৩০০ কোটি টাকা সঠিকভাবে বণ্টন করা হলে পরিবারপ্রতি পাবে ২,৪৩৩ টাকা। এক বছরের অধিককাল ধরে আয়বঞ্চিত মানুষের জন্য এই পরিমাণ টাকা কিছুই না; দরকার অনেক বেশি। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্রদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেট।

নতুন দরিদ্রদের হাতে সংসার চালানোর জন্য নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া সমাজের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকে। তার জন্য দরকার একটা সঠিক তালিকা। গত বছর তালিকা একটা করা হয়েছিল। সেটি ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ভুলে ভরা। অতিসত্বর সেটি সংশোধন করে পরিবারপ্রতি মাসিক পাঁচ হাজার টাকা নগদ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর হাতে টাকা না থাকার ফলে দ্রুত কমে যাচ্ছে বাজারের ক্রয়ক্ষমতা। ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে মুখ থুবড়ে পড়বে অর্থনীতি। করোনা চলে গেলেও ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে না বাংলাদেশের। এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে না পারলে গত ১০-১২ বছরে দেশের অর্থনীতির যে অগ্রগতি হয়েছে তা ফিরিয়ে আনতে কয়েক যুগ লেগে যাবে।

নগদ সহায়তার পাশাপাশি সৃষ্টি করতে হবে কর্মসংস্থান। করোনাভাইরাসজনিত অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হওয়ার পর কিছু অর্থনীতিবিদ এবং মিডিয়া সরকারকে ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দিচ্ছে। এই পরামর্শ অত্যন্ত ভয়াবহ ফল বয়ে আনতে পারে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের সময় ইউরোপ এই পথ গ্রহণ করেছিল বলে তাদের সে সংকট কাটাতে আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি সময় লেগেছে। সংকটের সময় যত বেশি সম্ভব সরকারি কাজ বাড়িয়ে দিলে একদিকে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়, যার দুটিই বর্তমান সময়ে দরকার।

করোনাকালে এ পর্যন্ত ২৩,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ব্যবসা এবং কুটির শিল্পের জন্য। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। তার পরও বন্ধ হয়ে গেছে ১৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। ৫০% যুদ্ধ করে এখনও টিকে আছে। কঠিন শর্তের জন্য বিতরণ করা যায়নি বাকি অংশ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৪০ শতাংশের কর্মসংস্থান করে। এদের দুর্দশায় হাহাকার শুরু হয়েছে দেশজুড়ে; টিকিয়ে রাখতে না পারলে কমে যাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, দীর্ঘকালের জন্য ভেঙে পড়বে অর্থনীতি। ক্ষুদ্র, ছোট এবং কুটির শিল্পের জন্য পালনযোগ্য শর্তে সুদবিহীন ঋণ দেওয়া হোক। সেইসঙ্গে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর জন্য থাকুক সরকারের গ্যারান্টি। করোনা থেকে সহসা মুক্তি নেই। সুদবিহীন ঋণ ছাড়া এদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।

এবারের বাজেটে করপোরেট কর কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ তথা কর্মসংস্থান বাড়ানোর আশা করা হয়েছে। দেশের বেশিরভাগ কোম্পানি প্রদেয় করের অতি সামান্যই দিয়ে থাকে; বেশির ভাগ ফাঁকি। করের হার বাড়ালে বা কমাতে তাদের কিছু যায় আসে না। কর কমালে বৃহৎ কিংবা মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরিমাণে কর্মসংস্থান বাড়বে, এমন প্রত্যাশার ভিত্তি নেই। কর কমালে বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান বাড়ে- বহুবার প্রমাণিত এমন ভুল ধারণার প্রচার করে পশ্চিমা দেশগুলোর পুঁজিবাদীরা নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল বহুদিন। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে চাঁদা দেওয়া বন্ধুদের পকেট ভারি করার জন্য এই নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এই নীতির ফল হয়েছে অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়ের হ্রাস। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই নীতি থেকে সরে এসেছে আমেরিকা। তিনি এখন জি-৭ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোতে একযোগে করপোরেট কর ২৫ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা করছেন। আশা করা হচ্ছে যে, সামনের জি-৭ সম্মেলনে এই প্রস্তাব পাস হবে। এমন পরীক্ষিত বিষয় চোখের সামনে থাকার পরেও বাংলাদেশ কীভাবে করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব করতে পারে?

স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং বাংলাদেশের গলার কাঁটা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে প্রস্তাবিত বাজেটে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। সেজন্য দরকার মোক্ষম কৌশল আর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এবারের বাজেট সব দিক থেকেই লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কৌশল বিবর্জিত আয়-ব্যয়ের রেওয়ামিল মেলানো বাজেট। তার ওপর রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য খরচ বৃদ্ধি, করপোরেট কর কমানো, ভ্যাট ফাঁকির শাস্তি কমানো, আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর কমানোর মতো বেশ কিছু অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির সুযোগ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, এবারের বাজেট হবে সংকট নিরসনের বাজেট। এই লক্ষ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করলে এই বাজেটকে গণমুখী করে তোলা সম্ভব।

মন্তব্য করুন