গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্নয়নের ফলে রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিটি কার্যক্রমকে এই মাধ্যমে প্রচার করে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মূলত রাজনীতিবিদদের একটি প্রচার মাধ্যম হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে। কোনো প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, উন্মুক্তকরণ, দরিদ্রদের মাঝে ত্রাণ বিতরণসহ অন্যান্য সব কার্যক্রমের ছবি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক এমন কোনো বিষয় নেই যেগুলো রাজনীতিবিদরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন না। এই প্রচারের প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য রাখলে একটি বিষয় পরিস্কার বোঝা যায়, এগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতারা দলের সামগ্রিক কর্মসূচি যতটা প্রচার করেন, তার চেয়ে বেশি প্রচার করেন তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো।

তবে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, এই বিষয়টি কি সব রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রেই একইভাবে প্রযোজ্য? কিংবা এটা করা কি অপরাধ- এই প্রশ্নের উত্তর হলো, অবশ্যই না। প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। তবে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে, ব্যতিক্রম কখনও উদাহরণ হতে পারে না। তবে বেশিরভাগ রাজনীতিবিদই বর্তমানে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। বরং এর মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে কভিড-১৯ অতিমারির কল্যাণে।

অনেক দিন পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা একটি চিঠি আমাকে বারবার ভাবাচ্ছে। এই চিঠি পড়ে আমি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিবিদের চরিত্র বোঝার চেষ্টা করছি। এবার আসি চিঠির মূল বক্তব্যে। ১৯৮৮ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণকে শেখ হাসিনা লেখেন, "বন্ধুবরেষু গুণ, আপনার অনুরোধে কিছু ছবি পাঠালাম। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন। 'ত্রাণ বিতরণ করছি' এ ধরনের কোনো ছবি ছাপাবেন না। মানুষের দুর্দশার ছবি যত পারেন ছাপান। আমার ধারণা, এ ধরনের অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের ছবি টেলিভিশন ও খবরের কাগজে দেখে দেখে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে। ওরা গরিব, কিন্তু সেটা কি ওদের অপরাধ? একশ্রেণি যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ না করত তাহলে এরা কি গরিব হতো? কার ধন কাকে বিলাচ্ছে? যা কিছু আছে সকলে মিলে ভাগ করে ভোগ করলে একের কাছে অপরের হাত পাতার প্রয়োজন হতো না।" (সংগৃহীত)। চিঠির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, কবি নির্মলেন্দু গুণ তার কাছে কিছু ছবি চেয়েছিলেন হয়তো পত্রিকায় ছাপানোর জন্য। কারণ তখন তিনি সংবাদপত্রে কাজ করতেন। এবং সে জন্যই হয়তো শেখ হাসিনা তাকে কিছু ছবির সঙ্গে চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন।

উপরের অংশটি চিঠির একটি খণ্ডিতাংশ। এই চিঠি পড়ে বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিবিদরা কি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন? ১৯৮৮ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। দেশের প্রধানমন্ত্রী না হয়েও তিনি জনগণ ও আওয়ামী লীগের জন্য যে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই প্রচারমাধ্যমের আলোয় আসতে চাননি। তাই তিনি যথার্থই চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, দরিদ্র জনগণের মাঝে ত্রাণ বিতরণের ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করলে যারা ত্রাণ গ্রহণ করছেন তাদের ছোট করা হয়। এই বাক্যটি থেকে দুটি বিষয় পরিস্কার। একটি হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রতি তার সীমাহীন সম্মানবোধ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে নিজেকে প্রচারের বাইরে রেখে জনগণের কল্যাণে কাজ করা।

এই চিঠির মাধ্যমে শেখ হাসিনার জনবান্ধব নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের প্রবল প্রতিফলন শেখ হাসিনার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে এই চিঠির মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু যেমন সারাজীবন প্রচারের বাইরে থেকে জনগণ ও দেশের জন্য কাজ করে গেছেন, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় গত এক দশকে বিশ্ব মানচিত্রে অন্যরকম এক বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। আমাদের দেশ তার নেতৃত্বে উদীয়মান অর্থনীতির একটি দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনেকে আবার বাংলাদেশকে 'এশিয়ার বাঘ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে এশিয়ার শক্তিশালী দেশগুলোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের এই উন্নতিতে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হচ্ছেন শেখ হাসিনা।

সত্যিই আজ বাংলাদেশে তার মতো নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দিয়েছে। আমরা এখন যাদের নেতা হিসেবে দেখি, তাদের বেশিরভাগ সবসময় নিজেদের প্রচারের আলোয় রাখতে পছন্দ করেন। এর মূল কারণ নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্বার্থ হাসিল করা। তারা কখনোই ভাবে না যে একজন দরিদ্র মানুষের ত্রাণ নেওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে সেই ব্যক্তির কী ধরনের সম্মানহানি হয়? কিংবা তার মধ্যে কী ধরনের মানসিক বেদনা অনুভূত হয়? বরং আমরা সবসময় এর উল্টোটা দেখি। কারণ একজনকে ত্রাণ দেওয়ার জন্য ১০-১৫ জন লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে। একজন দরিদ্র সাধারণ মানুষের ত্রাণ নেওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করা একদিকে যেমন অমানবিক কাজ, অন্যদিকে এটি কখনোই সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারার পরিচায়ক হতে পারে না।

বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে তরুণ রাজনীতিবিদরা এই চিঠি থেকে অনেক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। তারা শিখতে পারেন কীভাবে নিজেকে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে রেখে ও প্রচারের বাইরে রেখে জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করা যায়। তারা বুঝতে পারবেন তাদের মূল লক্ষ্যই হলো জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। কিন্তু বাংলাদেশ রাজনীতির এই পরিবর্তিত পরিপ্রেক্ষিতে বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের পরিবর্তে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের খেলায় মেতে ওঠে, যা কোনোভাবেই দেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।

বর্তমানে রাজনীতি একটি পেশা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সবাই রাজনীতি করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য। জনগণ এবং দেশের স্বার্থের কথা না ভেবে রাজনীতিবিদরা অনেক বেশি নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে। ফলে সবাই নিজের স্বার্থসিদ্ধির খেলায় মেতে ওঠে। তাছাড়া, এই অসম প্রতিযোগিতায় প্রকৃত রাজনীতিবিদরা মূলধারার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির আরেকটি কারণ হচ্ছে রাজনীতিতে ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশার মানুষের আধিপত্য। তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতি করে উঠে আসা সাংসদদের সংখ্যা বাংলাদেশে অনেক কম। আমরা যদি গত কয়েক বছরের সংসদ নির্বাচনের তথ্য দেখি তাহলে দেখব, ৬০ শতাংশের বেশি সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী বা অন্যান্য পেশা থেকে আসা। তৃণমূল থেকে উঠে আসা বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ নিজের স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে দেশের ও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতি করে থাকেন। তবে সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম রয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের উচিত নির্মলেন্দু গুণকে লেখা শেখ হাসিনার সেই চিঠি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা এবং নিজেদের সব প্রচারের বাইরে রেখে জনগণের জন্য কাজ করা। তাদের মনে রাখা উচিত, জনগণই হচ্ছে সব ক্ষমতার উৎস। এই জনগণকে অপমান করে কিংবা তাদের সম্মানহানি করে রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদরা যদি নির্মমভাবে রাজনীতি করেন, তবেই দেশের এবং জনগণের প্রকৃত উন্নয়ন হবে। আর যদি রাজনীতির বর্তমান ধারা প্রবহমান থাকে, তবে রাজনীতিবিদদের নিজের উন্নতি হবে, কিন্তু জনগণের ভাগ্যের উন্নতি হওয়া কঠিন।




মন্তব্য করুন