করোনার প্রভাব মোকাবিলায় সরকার গত বছর এপ্রিলে দুই ধরনের আর্থিক প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। একটি হলো- অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আর আরেকটি সামাজিক সুরক্ষার। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রণোদনা হিসেবে গত এক বছরে সরকার ২৩টি প্যাকেজে মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। এই বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৩ মাসে সব প্যাকেজ থেকে বিতরণ করা হয়েছে ৮২ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা, যা শতকরা ৬৪ দশমিক ৩০ ভাগ। ব্যাংক খাতের মাধ্যমে নেওয়া আরও ১১ প্যাকেজে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৬৮ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা।

এই প্রণোদনার মাধ্যমে বিশেষ করে ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সেবা খাত, কৃষি খাত, নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিদেশফেরত শ্রমিকদের ঋণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সরকারের এই ত্বরিত সিদ্ধান্ত যে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সেটা অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক থেকেই বোঝা যায়। মোটাদাগে বলা যায়, সরকার জীবন ও জীবিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমন্বয় ঘটানোর সক্রিয় চেষ্টা করেছে।

এদিকে গত বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গত বছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া যায়নি। এই বছরও নেওয়া যাবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। সর্বশেষ আগামী ১৩ জুন সব স্কুল ও কলেজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আছে। কিন্তু সেটা বাস্তবে সম্ভব হবে কিনা তা বোঝা যাবে করোনা সংক্রমণের হারের ওপর। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, করোনার সংক্রমণ শতকরা ৫ ভাগে না নেমে এলে শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হবে না। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে অবস্থান হচ্ছে সব শিক্ষার্থীর টিকা নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে।

এ পরিস্থিতিতে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ উদ্যোগে বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে চ্যালেঞ্জগুলোর সম্মুখীন হয়েছে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে ক্লাস করার ডিভাইসের অভাব। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে দুর্বল বা গতিহীন ইন্টারনেট এবং বিদ্যুতের আসা-যাওয়া তো আছেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গত এক বছরে ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে বছর শেষ করলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাসই নিতে পেরেছে। এখন পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা নিতে পারেনি।

গত বছরের মাঝামঝি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটা উদ্যোগের কথা শোনা গিয়েছিল। যেখানে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস করার বিভিন্ন উপকরণ কেনার জন্য সফটলোনের ব্যবস্থা করার কথা ছিল। তার অংশ হিসেবে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত শিক্ষার্থীদের একটা তালিকাও সংগ্রহ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, শিক্ষার্থীদের এককালীন ঋণ দেওয়া হবে ডিভাইস বা অন্য উপকরণ কেনার জন্য, শিক্ষার্থীরা এই ঋণ পর্যায়ক্রমে শোধ করতে পারবে। শোধ করার আগ পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত সনদপত্র দেওয়া হবে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত তালিকার ভিত্তিতে মঞ্জুরি কমিশন একটা তালিকাও করেছিল। তারপর কী ঘটেছে তা আর জানা যায়নি।

দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন আছে। এগুলোতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আছেন হাজার হাজার শিক্ষক এবং কর্মচারী। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই গত এক বছর ধরে একেবারেই বন্ধ হয়ে আছে। শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এমতাবস্থায় আশ্চর্যজনকভাবে সরকারের প্রণোদনা পরিকল্পনায় শিক্ষা খাত নেই। অথচ, শিক্ষা খাতে অনেক কিছুই করার সুযোগ ছিল। চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের যদি একটি করে স্মার্টফোন কেনার ঋণ দেওয়া যেত তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস বা পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এতো হাপিত্যেশ করতে হতো না। পড়তে হতো না শিক্ষাজীবন প্রলম্বিত হওয়ার ঝুঁকিতে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী ৮ লাখ ১৭ হাজার ৭০৭ জন। ধরে নেওয়া যাক, এদের মধ্যে অর্ধেকের স্মার্টফোন নেই। এখন প্রণোদনা হিসেবে যদি মাথাপিছু সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থাৎ ৪০০ কোটি টাকার ব্যবস্থা করা হতো তবে কিন্তু শিক্ষাসংক্রান্ত বর্তমান জটিলতাটা খুব সহজেই মোকাবিলা করা যেত। অনুমোদিত মোট প্রণোদনার তুলনায় এই অঙ্কটা একেবারে কিছুই না। এর ফলাফল হতো সুদূরপ্রসারী।

তবে করা হয়নি বলে যে করার সময় চলে গেছে তা নয়। এখনও যদি উদ্যোগ নেওয়া যায় তবে খুব সহজেই স্বল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষা খাতের এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ব্যাংকগুলোর জন্য একটা নির্দেশনা ডিভাইস কেনার বিষয়ে সফটলোনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম। আর ডিভাইসের জন্য সরকারের পক্ষে যদি কোনো প্রণোদনা বা ঋণ দেওয়া সম্ভব না হয় তবে সরকার খুব সহজেই ব্যাংক, টেলকোসহ আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বিষয়টি করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বা সিএসআরের আওতায় আনার অনুরোধ করতে পারে।

সরকার নিম্ন আয়ের পেশাজীবী এবং দরিদ্র মানুষদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা ইতোমধ্যে করেছে। সেটার আওতা বাড়িয়ে তাতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের খুব সহজেই অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। কেননা, এসব শিক্ষক-কর্মচারীর সব তথ্যই সংশ্নিষ্ট দপ্তরের কাছে রয়েছে।

বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিনের বিখ্যাত উক্তি, 'শিক্ষায় বিনিয়োগ সবসময়ই সর্বোচ্চ মুনাফা দেয়', বাংলাদেশে কম-বেশি সবাই জানেন কিন্তু কেন যেন সেটা তেমনভাবে কাজে লাগানো হয় না। তবে হয়নি বলে যে হবে না তা নয়। কারণ, বাংলাদেশের ক্রমাগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এই বার্তাই দেয় যে বাংলাদেশ ফিনিপ পাখির মতো শুধু ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াতেই পারে না বরং বিশ্বের বুকে একটা অনন্য উদাহরণও তৈরি করতে পারে।


মন্তব্য করুন