কালোটাকা বলতে এমন টাকাকে বোঝানো হয়, যার উৎস বৈধ বা আইনসম্মত নয়। তবে আয়কর আইন অনুসারে বৈধ উৎস থেকে অর্জিত অর্থও কালো হতে পারে, যদি টাকার মালিক তার আয়কর বিবরণীতে তার উল্লেখ না করেন এবং সে টাকার কর না দেন। অবশ্য আয়কর আইনে কালোটাকা বলতে কিছু নেই। আয়ের যে অংশ আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন করা হয় না, তা-ই অপ্রদর্শিত অর্থ কালোটাকা নামে পরিচিত।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির মাত্র ৭ ভাগ। এরপর থেকে সেটা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। বিশ্বব্যাংক ২০০৫ সালের এক গবেষণায় বলছে, ২০০২-০৩ সালে বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ ছিল মোট জিডিপি'র ৩৭ দশমিক ৭ ভাগ। এদিকে ২০১১ সালে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কালোটাকা নিয়ে একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০১০ সালে কালোটাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৬২ দশমিক ৭৫ ভাগ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আরও বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত গড়ে কালোটাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩৫ দশমিক ৬ ভাগ। রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ বিভাগের নানা সূত্র থেকে গণমাধ্যমে যেসব তথ্য এসেছে তাতে দেখা যায় এ পর্যন্ত দেশে ১৬ বার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে, প্রায় ৩২ হাজার ব্যক্তি ওই সুযোগে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা বৈধ করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রায় সাড়ে নয়শ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন সাত হাজার ৪৪৫ জন করদাতা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

সংগত কারণেই জনমনে এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন, কৌতূহল ও হতাশা আছে। কালোটাকা নিয়ে অর্থনীতিতে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি আছে। কারও কারও মতে কালোটাকা সাদা হয়ে দেশের উৎপাদনে চলে আসে, বিনিয়োগ হয়, ফলে অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। যদি সুযোগ না থাকে তাহলে হয়তো সে টাকা 'অলস মানি' বা 'গোপন মানি' হিসেবে পড়ে থাকতো কিংবা বিদেশে পাচার হতো। কিন্তু আমাদের দেশে এ সুযোগ বছরের পর বছর ধরে চলছে, বরং কিছু মানুষের জন্য এটা প্রায় স্থায়ী সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যারা সৎভাবে আয় করছেন ও কর দিচ্ছেন তাদের জন্য এটা কি হতাশার নয়? এভাবে চললে অনেক সৎ করদাতাও যে করদানে বিরত থেকে অসৎ প্রক্রিয়া অবলম্বনে উৎসাহিত হবেন না তা কি বলা যায়?

বর্তমান নিয়মে যারা কালোটাকা সাদা করবেন তাদের টাকার উৎস বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা হয় না। এটা কি সুশাসনের বিপরীত নয়? ধরা যাক, একজন ডাকাতি করে, খুন করে, ছিনতাই করে, অন্যের সম্পদ জবর-দখল করে, ঘুষ খেয়ে যে অবৈধ সম্পদের মালিক হয়, মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়েই সে টাকার 'হালাল' মালিক হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ওই মানুষগুলোর কী হবে যারা সম্পদ হারিয়েছে? তারা কার কাছে ন্যায় বিচার চাইবে? আর যারা এমন করছে, তারা কি আরও অপরাধ করতে উৎসাহিত হবে না? যারা আগে আয় প্রদর্শন করেননি, তারা কি অন্যায় ও অপরাধ করেননি? যদি দেশে সবার জন্য একই আইন থেকে থাকে, তাহলে ওই মানুষগুলোকে শাস্তি না দিয়ে কেবল সামান্য কর নিয়েই দায়মুক্তি দেওয়া কি ন্যায়সংগত? আমাদের সংবিধান কি সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও অধিকারের বিষয়টি সংরক্ষণ করেনি? যদি করে থাকে, তাহলে বর্তমান নিয়ম কি সমাজে বৈষম্য তৈরি করছে না? এটাতো বিশেষ কোনো পরিস্থিতি বা সময়ের জন্য নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে। তাই বলতেই হয় যে, এরকম নিয়ম সমাজের উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণ হওয়ার আশঙ্কা অনেক অনেক বেশি।

পরিস্থিতি এমন যে, কার টাকা কে সাদা করছে এর কোনো উত্তর নেই। এমনতো হতে পারে বা হচ্ছে, সরকারের টাকা চুরি করে আবার সরকারকেই ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে আরামে পার পেয়ে যাচ্ছে ওই অবৈধ সম্পদের মালিকরা। তাহলে সরকারের লাভ কি কেবল শতকরা ১০ টাকা? আমরা অপরাধের বা টাকা কালো হওয়ার কারণ চিহ্নিত না করে যেভাবে সব 'হালাল' করছি, তাতে গোটা সমাজকেই বিচ্যুত আচরণে পথ দেখাচ্ছি। কার স্বার্থে এমনটা হচ্ছে? সাধারণ কৃষক, মজুর, খেটে খাওয়া মানুষের জন্য, যাদের অধিকাংশের কর দেওয়ারই সামর্থ্য নেই?

আমাদের মনে রাখা দরকার, অন্যায় ও অপরাধের সঙ্গে আইন-নীতি-নৈতিকতা সমান্তরালে চলতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্টেম্নর সফল বাস্তবায়নের জন্য, সরকারের ভিশন ২০৪১ অর্জনের জন্য দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের পথ বন্ধ করা একান্ত জরুরি।





মন্তব্য করুন