দীর্ঘ তেইশ বছরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, আঞ্চলিক, শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণার শেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। আজ থেকে ৫০ বছর আগে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের অনেকেই এখনও জীবিত। বিগত ৫০ বছরে অনেক চড়াই-উতরাই, বৈপরীত্য, বৈষম্য আন্তঃ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। যারা মনে করেছিল ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেবে, তারা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে, প্রায়শ্চিত্ত করেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অদম্য নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড় করিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার সঠিক পথে অদম্য অগ্রযাত্রায় ফিরে এসেছে। মাথাপিছু আয়, জাতীয় প্রবৃদ্ধি, জাতীয় সমৃদ্ধি, রিজার্ভ বেড়েছে। বৈশ্বিক আলোড়নে, অংশগ্রহণে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষুধা-দারিদ্র্য, সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর মাধ্যমে নিরাপত্তা, পশ্চাৎপদতা, কূপমণ্ডূকতা, প্রাকৃতিক, সামাজিক-অর্থনৈতিক সকল প্রকার বৈষম্য ক্রমান্বয়ে নির্মূল করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে যারা সঙ্গ দিচ্ছেন- রাজনীতির সঙ্গে, অর্থনীতির সঙ্গে, প্রশাসনকে এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে, তাদের নিয়ে বারবার কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে, যা অদম্য বাঙালির জন্য দুর্ভাগ্যজনক, দুঃখজনক, দুশ্চিন্তা ও দুরাশার। একশ্রেণির প্রশাসক, অপেশাদার আমলা, রাজনীতিক দেশকে নিয়ে অসাধু খেলা খেলে যাচ্ছেন। প্রশাসনিক ইন্টিগ্রিটি সুরক্ষিত থাকছে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কথায় আসতে চাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রধানদের নির্লিপ্ততা, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অপরিপকস্ফ সিদ্ধান্ত এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত জনমানুষকে বারবার আশাহত, বিভ্রান্ত করছে। শিক্ষায় যারা সম্পৃক্ত, তারা মর্যাদায় সিক্ত হতে, আপ্লুত হতে সব সময় উন্মুখ থাকেন। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। চাকরিতে বয়োজ্যেষ্ঠ, বয়োকনিষ্ঠ, শৃঙ্খলাবোধ, ভেদাভেদ চাকরি জীবনের কর্মক্ষমতা, আন্তরিকতা, কাজের উৎকর্ষ বাড়িয়ে দেয়। মানুষ অর্থের সঙ্গে, পদ-পদবির সঙ্গে সম্মান এবং মর্যাদাবোধকে লালন করে। এটি মানুষের সহজাত। কর্মে বেঁচে থাকার মানসিকতা লালন করা মানুষের সংখ্যা শিক্ষকতায় বেশি। দীর্ঘ সময় শিক্ষা ক্যাডারে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে, বিভিন্ন সাধারণ পদে পদায়ন বদলি থেমেই গিয়েছিল। অতিসম্প্রতি এসবের লকডাউন কাটিয়ে উঠে বিশাল পরিসরে পদোন্নতির প্রক্রিয়া সক্রিয় করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতি প্রক্রিয়াধীন আছে। এজন্য সংশ্নিষ্ট সকলকে মাঠ পর্যায়ের পক্ষ থেকে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষ থেকে অভিনন্দন।

অতিসম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক পর্যায়ে পদায়ন করা হচ্ছে দীর্ঘ বিরতির পর। এখানে দীর্ঘ নির্লিপ্ততা কাটিয়ে উঠেছে প্রশাসন। কিন্তু আমলাতন্ত্র এবং উত্তরাধিকারের রাজনীতি যদি দেশপ্রেমের ঘাটতিতে পরিচালিত হয়, ক্ষমতা যদি অপচর্চার হাতিয়ার হয়, কথার রাজনীতি যদি সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়, কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দেশ কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করে না। গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখা গেছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগের অবস্থা দেখে মনে হয়, এখানে আঞ্চলিকতা কাজ করছে। বিশেষ গোষ্ঠীপ্রীতি কাজ করছে। বিশেষ রাজনৈতিক প্রশাসনিক ব্যক্তির প্রভাব কাজ করছে। দর্শন ও দূরদর্শিতায় চরম ঘাটতি বিরাজ করছে। দেশে শিক্ষিত দেশপ্রেমিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করার মানুষের অভাব হয়েছে, এটা বিশ্বাস করা কিংবা চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।

সম্প্রতি অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ঘটনায় আমলাদের অবিবেচক কর্মকাণ্ড আমরা দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী দেশকে নিয়ে যেভাবে কাজ করেন, স্বপ্ন দেখেন, চিন্তা করেন- তাকে সঙ্গ দেওয়ার, সহযোগিতা করার আমলা-মন্ত্রীর সংখ্যা নেহায়েত কম। তাদের মনোসংযোগ নিবিড়ভাবে এদিকে থাকা দরকার।

প্রধানমন্ত্রীর ওপর থেকে বোঝা কমানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত দেশপ্রেমিকের সংখ্যা একেবারেই কম। আমাদের মন্ত্রীদের সঠিক ট্র্যাকে ফিরে আসতে হবে। দেশপ্রেমের যে ঘাটতিগুলো নিয়ে তারা রাজনীতি করে বেড়াচ্ছেন, তা আত্নমল্যায়নের মাধ্যমে পূরণ করা চাই। জনগণ বেশিদিন অজ্ঞতা, অদূরদর্শিতাকে মুখ বুঝে সহ্য করবে না। বঙ্গবন্ধুর কথাকে ঘুরিয়ে বললে যেভাবে বলা যায়, 'আমরা যখন প্রতারণার শিকার হচ্ছি তখন আমাদের মুখ বন্ধ করে রাখাটা খুব সহজ হবে না।' বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন জনগণের সঙ্গেই আছেন, তখন প্রতারিত, বঞ্চিত জনগণের ভয়ের কিছুই নেই।

আমরা বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যতই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হোক, উত্তরাধিকারের পরিচয়ে বা ক্ষমতার পরিচয়ে কিংবা অন্যান্য পরিচয়ে সেটি টিকবে না। অসত্যকে, অসাধুতাকে, অনিয়মকে, অপকর্মকে সাময়িকভাবে আলো দিয়ে, জ্বালানি দিয়ে আলোকিত করা যায়। এতে সত্য, ন্যায়নিষ্ঠতা বিভ্রান্ত হয় সাময়িকভাবে। এটি খুবই সাময়িক। সময়ের ব্যবধানে অসত্য, অনিয়ম নিশ্চিহ্ন হয়ে ভেসে যেতে বাধ্য। যারা রাজনীতি করে তাদের প্রয়োজনেই এই উপলব্ধি জাগিয়ে রাখা দরকার।

প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক এসব অপকর্মকাণ্ডের কথা শুনে আপ্লুত হবেন, বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব কথা পৌঁছাবে না, আমলা রাজনীতিকদের এমন বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের খেলা, গোষ্ঠীর খেলা, আঞ্চলিকতার খেলা পরিহার করলে ব্যক্তির উৎকর্ষ সাধিত হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। দেশটি এগিয়ে যাবে। এ প্রত্যাশা অতিআশা নয়, এটি আমরা সব সময় লালন করি।



মন্তব্য করুন