২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়টি সত্যি আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, 'প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রযোজ্য সাধারণ করহার হ্রাস করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজ থেকে উদ্ভূত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। মহান এ সংসদে আমি এ করহার অর্থ আইনের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।'

২০১৮ সাল থেকে আমি মধ্য ইউরোপের স্লোভেনিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছায় ব্যাচেলর অব সায়েন্সে ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিপ বিষয়ে অধ্যয়ন করছি। ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা স্লোভেনিয়ার অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে একটু আলাদা। কেননা ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, ইউনিভার্সিটি অব লুবলিয়ানা কিংবা ইউনিভার্সিটি অব মারিবোরের মতো পুরোপুরিভাবে সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় ফর প্রোফিট নামক একশ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, আমাদের ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা অনেকটা সে ধরনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। আমি স্লোভেনিয়াতে একজন সেলফ ফাইন্যান্সিং স্টুডেন্ট হিসেবে পড়াশোনা করছি এবং আমাকে প্রত্যেক বছর ৩,০৭৫ ইউরো টিউশন ফি প্রদান করতে হয়।

তবে এতটুকু বলতে পারি, আজ পর্যন্ত আমাকে স্লোভেনিয়ার সরকারকে শুধু আমার শিক্ষাবাবদ কোনো অর্থ দিতে হয়নি। উল্টো অন্যান্য স্লোভেনিয়ান শিক্ষার্থীদের মতো আমরাও সরকার থেকে বিভিন্নভাবে ভর্তুকি পাই। যেমন স্লোভেনিয়াতে স্টুডেন্ট মিল নামক এক ধরনের পরিষেবা রয়েছে, যার অধীনে নির্দিষ্ট কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে আমরা তুলনামূলক কম মূল্যে খাবার সংগ্রহ করতে পারি। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফাস্টফুড চেইনশপে স্লোভেনিয়াতে অবস্থিত ম্যাকডোনাল্ডসের কোনো শাখায় যদি একটি কম্বো মিলের দাম হয় ছয় ইউরো, আমাদের জন্য সেটা মাত্র চার ইউরো। এ ছাড়া আমাদের জন্য সাবসিডাইজড বাস টিকিট নামক আরও একটি সুবিধা রয়েছে। আমার বাসা ভিপাভা থেকে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের দূরত্ব আট কিলোমিটার এবং প্রত্যেক বার বাসে যাতায়াত করতে সাধারণ মানুষকে ১.৮০ ইউরো ভাড়া গুনতে হয়। তবে শিক্ষার্থীরা ২৫ ইউরোর বিনিময়ে হোস্টেল থেকে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস পর্যন্ত যতবার ইচ্ছা যাতায়াত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা স্লোভেনিয়ার সরকার থেকে স্টুডেন্ট হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাই।

এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একাংশের মাঝে এখনও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রাইভেট মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ নিয়ে নাক সিটকানি রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিংবা বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোকে অনেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে এ বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোর আয়ের বড় অংশ আসে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও অন্যান্য চার্জ থেকে। কাজেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলো থেকে কর আদায় করার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত করের বোঝা শিক্ষার্থীদের ওপর এসে পড়বে।

তবুও তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি যে শিক্ষার্থীরা নয়, ইউনিভার্সিটি কিংবা কলেজ কর্তৃপক্ষ এ ভ্যাটের টাকা প্রদান করবে। সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোকে তাদের স্টাফদের বেতন কিংবা অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে ১৫ শতাংশ কর্তন করে এ করের টাকা দিতে হবে। অতএব আমার দৃষ্টিতে যে কোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর কর আদায়ের সিদ্ধান্তটি কোনোভাবে বাস্তবসম্মত নয়।

২০২০ সালের এইচএসসি সমমান পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭৭। পরীক্ষার্থীর তুলনায় আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে আসন সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। এ কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হন।

ঢাকাতে যে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ রয়েছে সেগুলো ঢাকা শহরের সব শিক্ষার্থীকে ঠাঁই দিতে সক্ষম নয়। তাছাড়া নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ কিংবা ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মানের জন্য অনেকের পছন্দের তালিকায় বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে।

সাধারণভাবে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার রেজিস্ট্রেশনের আগে টিউশন হিসেবে প্রত্যেক ক্রেডিটের জন্য গড়ে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। কোনো শিক্ষার্থী যদি এক সেমিস্টারে তিনটি সাবজেক্ট নির্বাচন করেন, তাহলে তার মোট ক্রেডিট সংখ্যা কমপক্ষে নয়টি। বেশিরভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে তিন সেমিস্টার, সুতরাং প্রত্যেক চার মাস অন্তর নতুন সেমিস্টার রেজিস্ট্রেশনের জন্য একজন শিক্ষার্থীর খরচ টিউশন ফি ও আনুষঙ্গিক চার্জ মিলিয়ে কখনও কখনও ৫০ হাজার টাকা পার হয়ে যায়। এর সঙ্গে যদি ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করা হয়, সেটি শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা চাপ হবে বলার অপেক্ষা রাখে না।

শুধু যে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন তেমনটি নয়। মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেক সন্তানও আজকের দিনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের জন্য ১৫ শতাংশের ভ্যাটের এ অতিরিক্ত অর্থ কি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে না?

সরকারের প্রতি অনুরোধ করতে চাই, অন্তত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের জন্য এবারের বাজেটে যে প্রস্তাব আনা হয়েছে সেটি যেন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এমনকি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে করের আওতার বাইরে রাখার জন্য সরকারকে অনুরোধ করছি।



মন্তব্য করুন