বাংলাদেশসহ প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশের বাজেটের সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন- বাজেটের গন্ধ পাওয়ার আগেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, সরকারের সরাসরি উপকারভোগীরা বাজেট ঘোষাণার সঙ্গে সঙ্গে মিছিল বের করেন, মিডিয়ায় প্রচার করা হয় বাজেট জনকল্যাণমুখী, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাজেট ইত্যাদি। লুটেরাদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধার ব্যবস্থা থাকে উন্নয়নশীল দেশের বাজেটে। যার ফলে প্রতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ে, সাধারণ মানুষের ওপর আরোপ করা হয় অতিরিক্ত চাপ। জনতুষ্টির জন্য দুটি কাজ করা হয় উন্নয়নশীল দেশের বাজেটে। এক. কয়েকটি খাতের টাকা একত্র করে বলা হয় শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ; দুই. এ বছর কয়েকটি পণ্য ও সেবার দাম কমবে। যদিও বাজেটের পর কোনো জিনিসের দাম কমার নজির নেই।

করোনায় দেশ ধুঁকছে। করোনায় ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে শিক্ষা খাত। ১০ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ আছে। অনেকেই সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। সরকারি সুবিধার বাইরে থাকা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায়ও আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রস্তাব দেখা যায়নি। উপরন্তু বেসরকারি কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর করারোপ করা হয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ২৬ হাজার ৩১১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ২৪ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। মাধ্যমিকে ৩৬ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা ছিল ৩৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ৯ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা এবং গত বছর এটি ছিল ৮ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে প্রতি বছর বরাদ্দের দুই-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানে। এখন শিক্ষার উন্নয়নে যেসব খাত আসে সেগুলো হচ্ছে, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য বিষয়ভিত্তিক, পেডাগজিক্যাল এবং ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ দিচ্ছে টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলো, নায়েম এবং সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্টসহ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রশিক্ষণে বাজেট আছে, খরচ করো। কী কাজে লাগল বা না লাগল, কার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, কীভাবে তাদের বাছাই করতে হবে এগুলো কিছুই দেখা হয় না। শুধু বাজেট আছে খরচ করো। আমরা জানি, হাজার হাজার শিক্ষক আছেন যাদের কোনো বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ হয়নি। আবার অনেক শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন তাদেরও প্রশিক্ষণে ডাকা হয়। আবার প্রশিক্ষণ শুধু প্রতিষ্ঠানে টিটিসি বা নায়েমে ডেকেই দিতে হবে সেটিও নয় কারণ, শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এসে যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তাদের শ্রেণিকক্ষগুলোর অবস্থা সেখান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে অধিকাংশ প্রশিক্ষণই কাজে লাগে না।

করোনার কারণে বাল্যবিয়ে ও ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। শিশু শ্রমও বাড়ছে। শিক্ষায় চলমান এই বিপর্যয় রোধকল্পে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা আবশ্যক। উপরন্তু ইউনেস্কো গঠিত দেলরস কমিশন প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাপ্ত মোট বৈদেশিক সহায়তার ২৫ শতাংশ অর্থ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার জন্য যে সুপারিশ আছে, বাংলাদেশের তা মেনে চলা উচিত। আগামী দু-তিন বছর মেয়াদি একটি শিক্ষা পুনরুদ্ধার কর্মসূচি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কভিড-১৯-এর ফলে শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১১-১২ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ বাংলাদেশে ৫ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ১০ ডলার, ভারতে ১৪ ডলার, মালয়েশিয়ায় ১৫০ ডলার ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৬০ ডলার। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত একটি যুক্তিযুক্ত সীমার মধ্যে রাখা প্রয়োজন, যা প্রাথমিক স্তরের জন্য ১ :৩০, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের জন্য ১ :৪০ এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ১ :২৫-এর বেশি নয়। এসব বিষয়ের প্রতিফলন বাজেটে ঘটেনি।

তবে, এমপিও কাঠামোর মধ্যে না থাকা বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা এবং ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য ২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর সংশোধিত (২০২০-২১) বাজেটে অবসরে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য ৪০ কোটি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও ভবন মেরামত ও সংস্কার খাতে ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় এসব অঙ্ক যদিও অপ্রতুল, তার পরও ভালো পদক্ষেপ বলতে হবে।


মন্তব্য করুন