পশ্চিম ইউরোপের আইবেরীয় অঞ্চলের ছোট্ট দেশ পর্তুগাল। দেশটির উত্তর ও পূর্বে স্পেন এবং পশ্চিম ও দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগরের অবস্থান। ২০২০ সালের ২ মার্চ পর্তুগালে প্রথম কভিড-১৯ শনাক্ত হয়। ২০২১ সালের ৪ জুন পর্যন্ত দেশটিতে আট লাখ ৫১ হাজার মানুষের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৭ হাজার ২৯ জনের। আর সুস্থ হয়েছেন আট লাখ ১১ হাজার জন।

গত বছর পর্তুগালের প্রতিবেশী দেশ স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও পর্তুগাল অনেকটা নিরাপদ ছিল। করোনাভাইরাস শনাক্তের পর পর্তুগাল সরকার দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২০২০ সালের ১২ মার্চ দেশব্যাপী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয় এবং ১৮ মার্চ থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট স্টেট ইমার্জেন্সি ঘোষণা করেন। পরিস্থিতির উন্নতি হলে একই বছরের ২ মে থেকে স্টেট ইমার্জেন্সি তুলে নেয়। একই সঙ্গে জনগণের জন্য বেশকিছু নির্দেশনা জারি করে সরকার। যেমন- মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করা, ১০ জনের বেশি মানুষের একত্রিত হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা প্রদান, দোকান ও রেস্তোরাঁ রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করা, প্রকাশ্যে অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় পানে নিষেধাজ্ঞা, রেস্তোরাঁয় বসে খাবার গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং শুধু টেক-অ্যাওয়ে চালু রাখা ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে পর্তুগাল করোনার প্রথম ধাক্কা সাফল্যের সঙ্গে সামলে নিতে সমর্থ হয়।

কিন্তু ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আবার অবনতি হয়। বাধ্য হয়ে পর্তুগাল সরকার ১৪ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী দুর্যোগকালীন সতর্কতা জারি করে। মূলত গত বছরের অক্টোবর থেকে পর্তুগালে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত করতে শুরু করে। এ সময় করোনার প্রথম ঢেউয়ের ১০ গুণ বেশি মানুষ সংক্রমিত হতে শুরু করে।

করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কায় দীর্ঘদিন দেশটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। প্রযুক্তির সহায়তায় এখানকার শিক্ষার্থীদের অনলাইন মাধ্যমে ক্লাস চালু রাখার নির্দেশনা দেয় সরকার। মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত এভাবে ক্লাস করে এখানকার শিক্ষার্থীরা। সেপ্টেম্বর মাস থেকে আবারও ডে-কেয়ার, প্রাইমারি-হাইস্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব পর্যায়ে অন-ক্যাম্পাস ক্লাস শুরু হয়। তবে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার পর আবার করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলে সরকার আবারও অন-ক্যাম্পাস ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় এবং অনলাইনভিত্তিক পড়াশোনা চালু করে। এই অবস্থায় বেশ কিছুদিন চলার পর দেশটিতে ২০২১ সালের ১৫ মার্চ থেকে অন-ক্যাম্পাস ক্লাস শুরু হয়।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ে ২৮ জানুয়ারি পর্তুগাল দেশটির রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩০৩ জন মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করে। এই সময় দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ হারে পৌঁছায় এবং ২৮ জানুয়ারি পর্তুগালে ১৬,৪৩২ জন মানুষের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ে ৯ নভেম্বর থেকে পর্তুগালে আবারও স্টেট ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয় এবং ২৯ জানুয়ারি দেশটি বর্ডার সিল করে দেয়। কেবল বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে তখন পর্তুগিজ নাগরিকরা অনুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে দেশের বাইরে যাতায়াত করার সুযোগ পেত। জানুয়ারি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে পর্তুগালের প্রতি মিলিয়ন নাগরিকের মধ্যে গড়ে ২৪৭ জন মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় দেশটিতে তীব্র মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। আইসিইউ বেডগুলো পূর্ণ হয়ে যায়। পর্তুগিজ সরকার বাধ্য হয়ে মরণাপন্ন রোগীদের অস্ট্রিয়া, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে আইসিইউ সংবলিত হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

পর্তুগাল করোনার সময় অত্যন্ত মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় দেয়। দেশটিতে নিয়মিত হতে আবেদন করা প্রায় ৪ লাখ অবৈধ নাগরিকের জন্য সব নাগরিক সুবিধা উন্মুক্ত করে দেয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, সরকারি ভর্তুকি লাভ, বিনামূল্যে চিকিৎসসেবা গ্রহণের জন্য মেডিকেল নম্বর প্রদানসহ পর্তুগালের বৈধ নাগরিকদের প্রাপ্ত সব সুযোগ-সুবিধা এসব অবৈধ নাগরিকের জন্য বৈধ ঘোষণা করা হয়।

পর্তুগালে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথম কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন বা টিকা প্রদান করা হয়। পোর্তোর সান জাও হাসপাতালে চিকিৎসক অ্যান্তনিয় সারমেন্তো সর্বপ্রথম পর্তুগিজ হিসেবে করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণ করেন। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে কভিড-১৯-এর টিকা প্রদান কার্যক্রম জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়। পর্তুগাল সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি ধাপে টিকা প্রদানের ঘোষণা দেয়। সর্বপ্রথম ধাপে ৫০ বছরের অধিক বয়স্ক হার্ট, ডায়াবেটিস ও কিডনির জটিলতায় ভোগা নাগরিকদের টিকা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে এ সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবার জড়িত ব্যক্তিরা কভিড-১৯ করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণের সুযোগ পান। দ্বিতীয় ধাপে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ১.৮ মিলিয়ন পর্তুগিজ মেডিকেল নম্বরধারী জনগণ করোনাভাইরাসের টিকা লাভ করেন। একই সঙ্গে ৫৫-৬৪ বছর বয়সী নয় লাখ মানুষ যাদের হার্ট, কিডনি, লিভার, ব্লাড প্রেসার কিংবা অন্যান্য জটিল শারীরিক সমস্যা আছে তারা টিকা গ্রহণ করেন।

পর্তুগালে বসবাসকারী বাদবাকি জনগণ যাদের বয়স ১৮-এর ওপরে তারা তৃতীয় ধাপে করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণের সুযোগ পান। বর্তমানে তৃতীয় ধাপের টিকা প্রদান কার্যক্রম চালু রয়েছে। পর্তুগিজ সরকারের এসএনএসের ওয়েবসাইটে ৪৫ বছরের অধিক বয়সের জনগণ করোনার টিকা গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারেন। এ ছাড়া ৪০ ঊর্ধ্ব বয়সের বাদবাকি নাগরিককে ৬ জুন থেকে এবং ৩০ ঊর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের ২০ জুন থেকে করোনার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০ ঊর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের টিকা কার্যক্রম সম্পন্ন হলে আগামী জুলাই মাস থেকে ২০-২৯ বছর বয়সী নাগরিকদের টিকা প্রদান করা হবে। এক কোটির কিছু সংখ্যক বেশি জনসংখ্যার দেশ পর্তুগালে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ লাখ নাগরিককে নূ্যনতম এক ডোজ কভিড-১৯-এর টিকা প্রদান সম্পন্ন হয়েছে। পর্তুগাল সরকার শুধু ৬০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য অপফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ব্যবহার করছে। বাদবাদি নাগরিকের জন্য ফাইজার-বায়োএনটেক এবং মডার্নার টিকা প্রদান করছে।

টিকা কার্যক্রম চালু হওয়ার পর পর্তুগালে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বর্তমানে এখানে দৈনিক সংক্রমণের গড় সংখ্যা মাত্র ৬০০ এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলশ্রুতিতে পর্তুগালের আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে। গত ১ মে থেকে দেশটিতে দোকানপাট, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ পুনরায় চালু হয়েছে। জনগণ ও পর্যটকদের জন্য বিশেষ পর্যটন স্পটগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দোকানপাট খোলা রাখার সময় রাত ৮টা থেকে বাড়িয়ে ৯টা পর্যন্ত করা হয়েছে। আগামী ১৪ জুন থেকে অবশিষ্ট নিষেধাজ্ঞাও তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী।

পরিকল্পিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পর্তুগাল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা জনগণ কঠোরভাবে পালন করেছে। একই সঙ্গে পর্তুগালের পুলিশ বাহিনী, চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশাজীবীরাও জনগণকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেছে। ফলশ্রুতিতে পর্তুগাল করোনাভাইরাসে মোকাবিলায় ইউরোপের অন্যতম সফল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

বিষয় : করোনা মোকাবিলা পর্তুগাল

মন্তব্য করুন