কভিড-১৯ গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কভিডের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক গবেষণা হয়েছে। শুধু আর্থিক দিক থেকেই বিবেচনা করলে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে এই রোগের অভিঘাত ব্যাপকতর। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ গত ১৫ মাসে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরও বেশি।

নবসৃষ্ট এই বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য মোকাবিলায় ক্ষুদ্রঋণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ এ ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে জানা যায়, দেশব্যাপী প্রায় সাত শতাধিক প্রতিষ্ঠান (যাদের অধিকাংশই এনজিও-এমএফআই) দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে প্রায় ৩ কোটি দরিদ্র, হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করেছে। পরিবারগুলো ঋণের অর্থে উৎপাদন সংশ্নিষ্ট কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়ে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপাশি কেউ কেউ অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এর পাশাপাশি তারা দেশের জাতীয় উৎপাদনেও নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তিকে যুক্ত করেছে।

বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত। তাদের একমাত্র ভরসা বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণগ্রহণ। যার জোগান দেয় এ দেশের এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ ও বিভিন্ন বেসরকারি আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। এই ঋণগ্রহণের মাধ্যমে তারা শুধু দারিদ্র্য দূর করেনি, বরং তারা এখন সামাজিক সচেতনতার বেষ্টনীতেও অবস্থান করছে। তারা পরিবারের স্বাস্থ্য, সন্তানের শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও শৌচাগার ব্যবহারে সচেতন হয়েছে। নিজেরা সামাজিকভাবে মর্যাদার অধিকারী হয়েছে। সর্বোপরি আর্থিক সচ্ছলতা তাদের 'মানুষ' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে।

অপর এক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ গ্রাহকের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত। প্রতি গ্রাহকের পরিবারে পাঁচজন সদস্য ধরে নিয়ে হিসাব করলে ক্ষুদ্রঋণের সেবা প্রাপ্ত মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি, যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮৩ শতাংশ। প্রায় ২৫ লাখ কর্মী ক্ষুদ্রঋণ খাতে কাজ করে জীবিকার সংস্থান করছেন।

এটি প্রমাণিত যে, বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সামাজিক সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করা সম্ভব। গ্রামাঞ্চলে নারীর উন্নয়ন ও অধিকার আদায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বিদেশ গমনে সহায়তা প্রদানে এনজিও এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। এসব সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং জবাবদিহিতা নিয়ে কিছু অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনাকারী এনজিওগুলো একটি সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি বা এমআরএ) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এমআরএ'র পাশাপাশি আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান পিকেএসএফ (পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন) দ্বারাও আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং তাদের একটি জবাবদিহিতা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দাতা সংস্থার সাহায্যে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এনজিওবিষয়ক ব্যুরোতেও নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিল ও ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয় কোনো কোনো সংস্থাকে। সব ক্ষেত্রেই সংস্থাগুলোকে বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। আয়কর অফিসেও সংস্থাগুলোকে নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। এই নানামুখী ও কঠোর জবাবদিহিতা কাঠামোর মধ্যে আসলে খেয়াল খুশিমতো ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের খেয়াল খুশিমতো ঋণ প্রদান ও সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করছে- এ ধরনের যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অনেক বেশি জবাবদিহিতা ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। তবে রেজিস্ট্রেশনবিহীন কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের প্রতারিত করে এ খবরও আমরা জানি। এ ধরনের সংস্থাকে কঠোর নজরদারির মধ্যে আনা দরকার।

ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন নজির নেই। কয়েকটি ব্যতিক্রম উদাহরণ হয়তো আছে। বরং ঋণের টাকা আয়-বর্ধনমূলক কাজে বিনিয়োগ করে লাভবান হয়েছেন সুবিধাভোগীরা। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের তদারকি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই তাদের দারিদ্র্য অবস্থা কাটিয়ে ওঠে স্বাবলম্বী হয়েছে। সুতরাং এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, ক্ষুদ্রঋণের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের দারিদ্র্য অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিক কর্মপরিকল্পনা ও ঋণ প্রদানের প্রবাহ ঠিক রাখা।

মহামারি করোনার আঘাতে দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দারিদ্র্যের হার আবারও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় ক্ষুদ্রঋণের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এবং নবসৃষ্ট দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্রঋণের আওতায় এনে দারিদ্র্য অবস্থা মোকাবিলা করা ও উত্তরণ সম্ভব বলে আমরা মনে করি। বাংলাদেশ সরকার ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ বরাদ্দ দিয়েছে। ফলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার কারণে সৃষ্ট দরিদ্রদের মধ্যে নতুন করে স্বল্প সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে। ঋণ প্রদানের পাশাপাশি তারা গ্রাহকদের করোনাভাইরাস রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চালাচ্ছে।

তবে এসব সত্ত্বেও ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক কর্মীই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং নিয়মিত সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। ফলে অনেক সদস্যের ঋণের টাকা বকেয়া পড়ে যাচ্ছে। আবার অনেক সদস্য ঋণের টাকা নিয়ে স্থানান্তর করছেন। কারও কারও আয়-বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঋণের টাকা নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছেন না। এসব কারণে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে যাচ্ছে এবং তারা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে এবং সেইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আরও নমনীয় হলে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর জন্য সুবিধা হবে।

বাংলাদেশের মোট শ্রমজীবী মানুষের ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও দক্ষতা সবই আছে। কিন্তু করোনার কারণে তাদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি ও অকৃষি খাতে যুক্ত এই বিশাল জনশক্তির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ ও জীবনযাপনের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম জোরদার করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারের উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনা।

মন্তব্য করুন