এ বছরের বাজেটকে 'জীবন জীবিকার বাজেট' আখ্যা দিয়ে সরকার সর্বমোট ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার একটি বাজেট ৩ জুন ঘোষণা করে, যা মোট জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বছরটির জন্য রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমান বছরে ব্যক্তি শ্রেণির মোট করদাতা হচ্ছেন ২৫ লাখ ৪৩ হাজার, যা সম্ভাব্য করদাতা হিসেবে খুবই কম। তাই আগামী অর্থবছরে মোট ঘাটতি বাজেট হচ্ছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ। ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। আবার অভ্যন্তরীণ এ ঋণ নেওয়া হবে ব্যাংক থেকে এবং সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। এতে ব্যাংকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি ব্যক্তির ক্ষেত্রে আয় নিরাপত্তাও বাড়বে, যা পরোক্ষভাবে বিনিয়োগের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াবে।

আগামী বছরের জন্য এ সিদ্ধান্তের কিছু অনুকূল দিক রয়েছে যেমন- ব্যক্তির খাতে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ কম হবে, ফলে ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নেবে এবং সে কারণে ব্যাংকের আয় থাকবে। তার ফলে ব্যাংকে নূ্যনতম একটি সুদের হার ধরে রাখা সম্ভব হবে। ফলে ব্যাংকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। তবে এটি সরকারের ব্যয় বাড়াবে এবং পরোক্ষভাবে সরকারের বিনিয়োগ করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দেবে। তাই সরকারকে একটি কঠিন হিসাবের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, অর্থাৎ একদিকে সস্তা বিদেশি বিনিয়োগ, আবার অন্যদিকে বেশি সুদে দেশি বিনিয়োগ করার বিষয়।

আগামী অর্থবছরে সরকারি ব্যয় ধরা হয়েছে জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ আর দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো তা করে ২৪-২৫ শতাংশ। এমনকি ভিয়েতনামও তাদের জিডিপির ২৩ শতাংশের মতো বাজেটে বরাদ্দ রাখে। বর্তমানে ভিয়েতনামের ঘাটতি মোট জিডিপির ৫ শতাংশের কাছাকাছি হলেও তারা ২০২৬ সালের মধ্যে তা জিডিপির ৩ শতাংশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে। অর্থাৎ এখানে আমাদের বাজেট তৈরির মান উন্নয়নের অনেক সুযোগ আছে এবং অনেক কিছু করণীয় আছে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইমেজ বিল্ডিং করা খুব দরকার। এর প্রধান দুটি দিক হচ্ছে খেলাধুলা এবং জ্ঞানচর্চা। কিন্তু আমরা উল্টো পথে হাঁটছি বলে মনে হচ্ছে। আগামী বছরের বাজেটে ক্রীড়া উন্নয়ন খাতে মাত্র ২৭৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বাজেট অত্যন্ত হতাশাজনক। এখানে কেবল কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ থাকলেও যেমন বারি, ব্রি, সার্বিকভাবে গবেষণার বরাদ্দ কিন্তু বাড়ানো হয়নি। ধান, পাট, মাছ, মাংস, চা, চামড়া থেকে শুরু করে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসৃজন, ব্যবসা, বিনিয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের গবেষণা করতে হবে। স্বল্প মূল্যে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের কৌশল আমাদের আবিস্কার করতে হবে। চীন যেভাবে সারা পৃথিবীর পুরোনো ধনী দেশগুলোকে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে গেছে তেমনি বিভিন্ন রকমের গবেষণা এবং উদ্ভাবনী কৌশল দিয়ে আমাদের তা করতে হবে।

একটা অর্থনীতিতে ধনীরা গরিব হয়ে যাচ্ছে এমন তথ্য যত ভয়ংকর হতে পারে তেমনি গরিবরা আরো গরিব হচ্ছে তাও ততটা ভয়ংকর হতে পারে। আমাদের এখানে কভিড উচ্চমধ্যবিত্তকে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যেমন ঢাকার বাড়িগুলোর ফ্ল্যাটগুলো অনেক খালি পড়ে আছে। যারা ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় ভাড়া থাকত তারা তা ছেড়ে দেওয়ার ফলে সে সব ফ্ল্যাট বাসা এখন খালি। আবার এ সব পরিবারের ড্রাইভার থেকে শুরু করে মহিলা গৃহকর্মীরা চাকরিহারা হয়েছে। তাদের আয় একেবারে কমে গেছে। সুতরাং এ সব বিষয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। কর কমানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব কতটা হারাবে তার কোনো হিসাব বাজেটে থাকে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ও তেমন কোনো গবেষণা করে না। কিন্তু এ সব তথ্য দিলে প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতি মানুষের অনেক বেশি সমর্থন থাকত, আস্থা অনেক বেড়ে যেত।

কৃষি খাতের দ্রুত যান্ত্রিকীকরণ কৃষি শ্রমিকদের বেকারত্ব বাড়াবে কিনা এটি একটি বড় প্রশ্ন। বর্তমানে অতিমারীর কারণে কৃষিতে অকৃষি শ্রমিকের সাময়িক কর্মসংস্থান দেখা যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা আবার অকৃষিখাতে ফিরে যাবে। তাই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অব্যাহত রাখা দরকার। সরকারের এ বাজেটে এ বিষয়ে চাহিদা এবং জোগানের বিষয়টি সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে এটি কতটুকু বিচার-বিশ্নেষণ করে করা হয়েছে তা নাগরিকদের কাছে প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।

দেশের মানুষের বিশেষ করে করদাতাদের একটি বড় হতাশার জায়গা হচ্ছে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়মের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া। আগের বছরের বাজেট প্রদানকালে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক কমিশন গঠন করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখনও সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। আগামী বছরের বাজেট দেখে মনে হচ্ছে নতুন কোনো বিকল্প ভাবছেন। আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ইত্যাদির ব্যাপারে দেশের মানুষ আরও বেশি জোরালো পদক্ষেপ আশা করে।

জননিরাপত্তা বিষয়ে এবারও বাজেটে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে পুলিশের অপরাধ কমানোর কোনো টার্গেট দেওয়া নেই। বর্তমানে আরও নিত্য-নতুন অপরাধ যেমন কিশোর গ্যাংসহ নানাবিধ সমস্যা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

'কালোটাকা সাদা' না বলে 'কর অপরিশোধিত টাকা' অর্থ বললে এর ইতিবাচক শব্দ প্রয়োগ হবে। বর্তমানে 'কালোটাকা সাদা' বলার ফলে প্রায় সকল মানুষের মধ্যে ওই ব্যক্তিকে অসৎ হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার একটি ঝুঁকিতে পড়তে হয়। আর যারা সত্যি সত্যি কালোটাকার বা অ-উপার্জ্জিত টাকার মালিক তাকে এটি সাদা করার সুযোগ দেওয়া তো হচ্ছে না। কোনো চোরাকারবারি, মাদক কারবারি কিংবা দুর্নীতিবাজকে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এটি একটি 'অপবাদসূচক' শব্দ।

গ্রাম এলাকাতে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ইত্যাদি দেওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে এ ধারণা জন্মেছে যে, দেশ উন্নত হচ্ছে। আবার দেখা যায় যে, কোনো কোনো ইউনিয়নের কোনো কোনো ওয়ার্ডে এ ধরনের ভাতা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক লোক নেই। সে-সব জায়গায় কোটা নির্দিষ্ট না রেখে অন্য ওয়ার্ডে দেওয়া যেতে পারে। তবে সমস্যা হচ্ছে এটি উন্মুক্ত করলে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা তৈরি হতে পারে। তাই এর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা দরকার।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বাজেট বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিক্ষার ওপর কভিডের প্রভাব কতটা হয়েছে তার কোনো সংখ্যা এবং গুণগত আলোচনা করা হয়নি। কত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, কত স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে তার ওপর জরিপ চালিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ছিল।

প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিটি বিষয়ে মান উন্নয়নের সুযোগ আছে। তাই এখানে উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো। বিষয়টি সহজ করার জন্য সংক্ষেপে এই বাজেটের কিছু সবল এবং দুর্বল দিক তুলে ধরা হলো।

এ বাজেটের সবল দিকগুলো হলো যেমন- আগের বছরের তুলনায় বেশি বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব, ব্যবসা এবং বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা, প্রধান প্রধান বিষয় যেমন- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে বরাদ্দ বাড়ানো, গৃহহীনদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা, অনেক খুঁটিনাটি বিষয় যেমন স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিষয় বিবেচনায় নেওয়া, কভিডের জন্য বিশেষ বরাদ্দ, টিআইএন-এর ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এর দুর্বল দিকগুলো হলো- নতুন দরিদ্রদের জন্য কী পদক্ষেপ থাকবে, কর্মসৃজন নিয়ে চাহিদার বিপরীতে পরিকল্পনা না থাকা, ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনার অভাব, ব্যয় করতে না পারার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার অভাব, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সীমিত বরাদ্দ রাখা যেমন গবেষণা, বায়ু এবং শব্দদূষণ রোধে যথাযথ পরিকল্পনা না থাকা, চাহিদাভিত্তিক বাজেট তৈরি না করা, দারিদ্র্য নিরসন এবং কর্মসংস্থান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা না থাকা ইত্যাদি।


বিষয় : বাজেট জীবনমান উন্নয়ন

মন্তব্য করুন