মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে শুরু করে অজস্র আঁকাবাঁকা বন্ধুর পথ পেরিয়ে এ সময় পর্যন্ত মানুষ তার সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যে সব কৌশল আবিস্কার করেছে তার মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। জীবন ধারণ কিংবা যাপনের জন্য মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে তার শিক্ষা। জাতি গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য বলা হয়, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মানব জীবনে রোগ-শোক, জরা-ব্যাধি, যুদ্ধ-বিগ্রহ অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। মানুষই হচ্ছে একমাত্র প্রাণী, যারা তাদের মেধা, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে, অতীতে পেরেছেও। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী মানব জীবনের ওপর যে বিভীষিকাময় খড়গটি নেমে এসেছে তার নাম করোনা। 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যা 'কভিড-১৯' নামে পরিচিত। প্রায় দেড় বছর ধরে গোটা বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে এই প্রাকৃতিক দানবটাকে মোকাবিলা করার জন্য। কোনো কোনো দেশ সফলভাবে তা ঠেকাতে পেরেছে, কেউ কেউ আবার এখনও নাজেহাল অবস্থার মধ্যে আছে। কেউ জানে না এর শেষ কোথায়!

করোনার সবচেয়ে বড় আঘাত বা বিপর্যয়ে আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। কেবল আমাদের বললে ভুল হবে, বরং সারা বিশ্বই এ নিয়ে আজ ব্যতিব্যস্ত। উন্নত বিশ্ব তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা আর মেধার সম্মিলন ঘটিয়ে হয়তো উতরে যাবে। তবে সমস্যা হবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর। আমাদের কেবল যে অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত সমস্যা তা কিন্তু নয়, আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে পশ্চাৎপদ মানসিকতা। তবে বিশ্বাস করি, যে জাতি তার মানসিক শক্তির দ্বারা যুদ্ধ করে একটি দেশ স্বাধীন করতে পারে সে জাতি করোনা নামক মহামারি থেকে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে পারবে। এর জন্য আমাদের প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো করোনা নামক মহাশত্রুটি মোকাবিলা করার মানসিকতা। একাত্তরে আমরা একটি প্রশিক্ষিত বাহিনীকে বিতাড়িত করে যেমন এ দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি, তেমনি আমরা করোনাকেও বিদায় করতে পারব সচেতনতা-সতর্কতায়। এটি স্পষ্টতই আরেকটি যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমরা হয়তো অনেক কিছুই হারাবো কিন্তু পরাজিত হবো না।

আমাদের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ প্রায় এক বছর তিন মাস ধরে। আরও কতদিন বন্ধ রাখতে হবে তা এখনই বলা মুশকিল। যেহেতু আমাদের যাপিত জীবনে পরিবর্তন আমরা আনতে পারছি না, তাই সহজে করোনার হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পথ কণ্টকমুক্ত নয়। এমতাবস্থায় প্রশ্ন- তাহলে কী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে না! কারও পক্ষেই এর নিশ্চিত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কিন্তু শিক্ষাদান প্রক্রিয়া কি বন্ধ? না, শিক্ষাদান প্রক্রিয়া বন্ধ নয়, এটি চলমান। তবে তা যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো! এভাবে কি কার্য সিদ্ধি হবে? না, হবে না। তাহলে কি করব চুপচাপ বসে থাকব! না তাও হবে না। তা হলে কী করতে হবে! যুদ্ধ করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে যুদ্ধ হচ্ছে একটি বিশেষ পরিস্থিতি, জরুরি অবস্থা যেখানে অনেক কিছুই স্বাভাবিক থাকে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থাও তাই। এ যুদ্ধে আমাদের সবাইকে শামিল হতে হবে। আমরা অপেক্ষা করব কিন্তু উপেক্ষা নয়। আমরা ধৈর্য ধরব, অধৈর্য নয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে একবার পিছিয়ে গেলে ঘুরে দাঁড়ানো একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। শিক্ষায় পিছিয়ে গেলে টেকসই উন্নয়নে ধস নামবে, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের হিমশিম খেতে হবে। আমাদের জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ পড়েছে জীবিকা সংকটেও। কর্মহীনের ভিড় বাড়ছে। জীবনের জন্যই তো জীবিকা। তাই এ নিরিখেই করণীয় সম্পর্কে ভাবতে হবে।

করোনাকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে, সমালোচনাও হচ্ছে, তাই বলে আমাদের থেমে গেলে চলবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আসবে, সিদ্ধান্ত ভুল হবে। আবার সিদ্ধান্ত আসবে তাতেও ভুল হতে পারে। হোক, থেমে যাওয়া যাবে না। ক্যাম্পাস বন্ধ কিন্তু শিক্ষাদান প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন। অনলাইনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষাও নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করছে, শিক্ষকরা অ্যাসাইনমেন্ট জমা নিচ্ছেন। অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে একটি নতুন অভিজ্ঞতা। এটি তৈরি করতে সবাইকে কিছু না কিছু পড়তেই হবে। শিক্ষা প্রক্রিয়া চলমান রাখতে যা যা প্রয়োজন সরকারি নিদর্শনায় তা করা হচ্ছে। তাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকরা কি সন্তুষ্ট? না পুরোপুরি না। দুধের স্বাদ হয়তো ঘোলে মেটানো যায় কিন্তু একটি ক্লাসে একজন শিক্ষক সরাসরি যে শিক্ষা দান করবেন আর শিক্ষার্থীরা যা গ্রহণ করবে তা কোনোভাবেই অনলাইনে সম্ভব নয়।

অনলাইনে ক্লাস নেওয়া কিংবা পরীক্ষা নেওয়া খুব মজার ব্যাপার, তবে সহজ ব্যাপার না। এর পেছনে অনেক নিয়ামক কাজ করে। শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সরাসরি ইন্টারএকশনের কথা বাদ দিলেও বহু সমস্যা আছে এখানে। প্রথম সমস্যাই হলো আমাদের অপর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা। আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হবেন। আবার আর্থিক সমস্যা না থাকলেও ঢাকা বাইরে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক কারণে কিংবা নেট সংযোগের কারণে, নেটের স্পিড দুর্বলতার কারণে অনলাইন ক্লাসে ব্যাঘাত ঘটেছে। তবুও এগিয়ে যেতে হবে, উপায় নেই, বিকল্পও নেই। আমাদের শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরসমূহ যে সব উদ্যোগ নিচ্ছে তার বাস্তবায়ন সম্ভব হলে করোনাকালীন শিক্ষা বিপর্যয় অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা হয়তো সম্ভব হবে। অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা এখনও আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। অনলাইন ক্লাস পদ্ধতিতে শহরের ছেলেমেয়েরা উপকৃত হলেও গ্রামাঞ্চলের ছেলেমেয়েরা অনেকটাই পিছিয়ে পড়বে। কারণ তাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। এমনিতেই শহর আর গ্রামের মধ্যে এখনও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে অনেক বৈষম্য রয়েছে। অনলাইন শিক্ষা প্রক্রিয়ায় এ বৈষম্য আরও প্রকট হবে। এমন অনেক পরিবার রয়েছে যাদের পক্ষে তাদের সন্তানকে একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কিনে দেওয়া অনেকটাই দিবাস্বপ্নের মতো। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করা যায় কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। যেহেতু আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি, তাই ধৈর্য ধরি এবং প্রাপ্ত অপর্যাপ্ত সুযোগের পর্যাপ্ত ব্যবহার করতে হবে। আমরা হয়তো দৌড়াতে পারব না, কিন্তু হাঁটতে তো পারব, আর হাঁটতেও যদি না পারি চলুন অন্তত হামাগুড়ি দেই কিন্তু থামা যাবে না। সরকার কর্তৃক ঘোষিত কর্মসূচির কেবলই সমালোচনা না করে সেগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতা করি। প্রয়োজনে যৌক্তিক ও সময়োপযোগী পরামর্শ প্রদান করি। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কোনো সমস্যাই চিরস্থায়ী নয় বরং প্রতিটি সমস্যার মধ্যেই প্রচ্ছন্নভাবে তার সমাধানও নিহিত থাকে। আলোর আগমনে আঁধার তিরোহিত হবেই।

বিষয় : করোনা-দুর্যোগ

মন্তব্য করুন