কয়েক দিন আগে কয়েকজন মৌয়াল সাড়ে সাতশ কেজি চিনি নিয়ে সুন্দরবনে যাওয়ার পথে নৌকাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে গ্রেপ্তার হলে মধুতে চিনি মেশানোর এক ভয়াহব চিত্র বের হয়ে আসে। ধরা না পড়লে আমরা চিনি মেশানো এই ভেজাল মধুই সুন্দরবনের খাঁটি মধু হিসেবে কিনে নিতাম।

অভিযোগ আছে, কফিতে এখন তেঁতুলের বিচি গুঁড়া করে মেশানো হয় দেখতে একই রকম বলে। মরিচ ও হলুদে ইটের গুঁড়া মেশানো হয়। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও মুড়ি সাদা ও বড় করতে ইউরিয়া সার মেশানো হয়। দীর্ঘক্ষণ জিলাপি এবং চানাচুর মচমচে রাখার জন্য মেশানো হয় পোড়া মবিল। আমরা তা-ই খাচ্ছি। বাচ্চাদের আকর্ষণীয় আইসক্রিম, বিস্কুট ও চকলেটে মেশানো হয় কাপড়ের বিষাক্ত রং। কার কী ক্ষতি হতে পারে বা কার কী ক্ষতি হবে, এর কোনো তোয়াক্কা না করেই খাদ্যপণ্যে মেশানো হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এসব কেমিক্যাল। আজকাল মৌসুমি ফল তরমুজে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট সিরিঞ্জ দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে লাল করা হচ্ছে।

আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু পাকাতে কার্বাইড ব্যবহার করা হচ্ছে। মেশানো হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রং। এসব মৌসুমি ফল শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ খাচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফলে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে সংরক্ষণ করার জন্য। নিরাপদ খাদ্য আমাদের মৌলিক চাহিদা। কিন্তু কিছু মানুষ খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশিয়ে জনগণের নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির মৌলিক চাহিদায় কুঠারাঘাত করে চলেছে। এখানেই শেষ নয়, বিভিন্ন ধরনের ফলের জুস ও দুধে ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে অতিমাত্রায়। শিশুরা তা পান করছে জীবন ধারণের উপাদেয় হিসেবে। দেখার যেন কেউ নেই।

অতি মুনাফার লোভে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে ও বিদেশি খাদ্যপণ্যে নতুন স্টিকার লাগানো হচ্ছে নির্দ্বিধায়। কারও কথা চিন্তা না করে বা স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা না ভেবেই কিছু অবিবেচক এমন জঘন্য অপরাধ করে যাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির নামে অনেক ভেজালকারী অপরিশোধিত পানি বাজারজাত করে জনজীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। মাছে ফরমালিন, ফলে ফরমালিন, সবজিতে ফরমালিন, জুসে ফরমালিন! ঈদুল আজহা আসন্ন। অভিযোগ আছে, খামারিরা পশু মোটাতাজাকরণে মানবদেহের জন্য বিষাক্ত কেমিক্যালের ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খামারিরা গরু-মহিষকে মোটাতাজা করার জন্য কৃষি কাজে ব্যবহূত ইউরিয়া সার খাওয়াচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের হরমোন ট্যাবলেট ব্যবহারের কথাও শোনা যায়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এখনই খামারে খামারে এসব ক্ষতিকর কেমিক্যালের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারি-তদারকি জরুরি।

মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালনে বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো খাদ্য খাওয়ানো হচ্ছে। পোলট্রি খামারে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, খাদ্যশস্যে বিষাক্ত কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার শুধু খাদ্যপণ্যই অনিরাপদ করেনি, গোটা জীববৈচিত্র্য অনেকটা ধ্বংস করে দিয়েছে। কী করে নিয়ম ভাঙা যায়, খাদ্যপণ্য বিষাক্ত করা যায়, জীবনধারণকারী খাদ্যে কীভাবে ভেজাল মেশানো যায়- তাতে ভেজালকারীরা খুবই পারঙ্গম, সিদ্ধহস্ত। নামিদামি হোটেল-রেস্টুরেন্টে পচা-বাসি ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার পরিবেশন করা হয়। অভিযোগ আছে, অনেক সুপার শপেও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। মাঝে মাঝে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অভিযান চালায়। অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে। অভিযানে ভেজাল খাদ্য তৈরির নতুন নতুন কারখানা আবিস্কার হয়। সংবাদমাধ্যমে সচিত্র সংবাদ ফলাও করে প্রচারও করা হয়। এমন নানা অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ফলে কিছুদিন পর তারা আবার নতুন উদ্যোমে একই অপকর্মে লিপ্ত হয়।

সরিষার তেলে ঝাঁজালো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে ক্রেতার কাছে আসলত্ব প্রমাণের জন্য। শুঁটকিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকারক কীটনাশক। প্রসাধন সামগ্রীতে মেশানো হচ্ছে মরণব্যাধি ক্যান্সারের উপাদান। এর ফলে মানবদেহে দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধছে।

সারাবিশ্বে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত আইন রয়েছে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। উন্নত বিশ্ব খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে তারা শুধু আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকেই খারাপ মনে করে না, বরং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এমনটি গর্হিত কাজ বলে মনে করে। আমাদের দেশে আইন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্নভাবে খাদ্যে, প্রসাধনীতে, জীবন রক্ষাকারী ওষুধে, শিশুখাদ্যে, ফল-ফলাদিতে, খামারে, সবজিতে যে যেভাবে পারছে নিষিদ্ধ কেমিক্যাল, কীটনাশক মিশিয়ে লাভবান হওয়ার জন্য নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে মানুষের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভেজালকারীদের কঠিন হস্তে দমন করতে হবে এবং তাদের মানুষ হত্যাকারী হিসেবে বিবেচনা করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

যারা খাদ্যে ভেজাল দেয়, ভেজাল খাদ্য তৈরি করে এবং তা সরবরাহ করে, নকল ওষুধ তৈরি ও সরবরাহ করে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না গেলে দেশে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাদের প্রতি কোনো প্রকার অনুকম্পা নয়। এমনিতেই আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর। স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাস্থ্য মোটেই ভালো নয়। করোনাকালে তা আমাদের ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি দেশ-বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

খাদ্যে ভেজালকারীদের কঠোর আইনের আওতায় এনে তা দমন করতেই হবে। নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে কালবিলম্ব মোটেই কাম্য নয়। খাদ্যে ভেজাল রোধ করতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ বলবৎ রয়েছে। বিদ্যমান আইনের আওতায় ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে। প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সব ব্যবস্থা নিতেই হবে।

বিষয় : চতুরঙ্গ  ড. মোহা. হাছানাত আলী

মন্তব্য করুন