পোশাক একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। সময়ের সঙ্গে পোশাকের চাহিদায় এসেছে নানান বৈচিত্র্য। আর এ চাহিদা প্রতিনিয়ত মিটিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশের পোশাক শিল্প। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখায় পোশাক শিল্পের গুরুত্ব অনেক বেশি। পরিসংখ্যান থেকে বললে, আমাদের মোট দেশীয় উৎপাদনে এ খাতের অবদান ১১ শতাংশের বেশি। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ অর্জিত হয় এ খাত থেকে। চল্লিশ লাখের অধিক মানুষের জীবন ও জীবিকার সংস্থান করে যাচ্ছে পোশাক শিল্প।

২০২৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে এসেছে, 'উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের কারণে একটি শার্ট অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি করতে বাংলাদেশের যে খরচ হবে তা ভিয়েতনামের চেয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি এমন ধারণা করা হচ্ছে। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুবিধায় ভিয়েতনাম তুলনামূলক এগিয়ে যেতে পারে।' 

এ বিশ্লেষণ করা হয়েছে অনেকটাই গতানুগতিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তর ওপর ভিত্তি করে। তবে আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা ঠিক করে দেবে বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবস্থান। আর এতে জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০১২-১৪ সালে করা বিশদ সমীক্ষায় দেখা যায়, পোশাক খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ২৫ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব যার পরিশোধের সময়কাল (পে-ব্যাক পিরিয়ড) গড়ে ৩.২৫ বছর। আমাদের জ্বালানি দক্ষতা এবং সংরক্ষণে নেওয়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ীও এ খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ অনেক। সঙ্গে জ্বালানি অপচয় রোধ করা গেলে মোট জ্বালানি সাশ্রয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। এজন্য অবশ্যই অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে কারখানার কর্মীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে তারা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারেন।

এ ছাড়া প্রতিটি পোশাক শিল্প কারখানার ছাদে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ। সৌর প্যানেল স্থাপন করে একটি কারখানা তার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারে। বাংলাদেশে নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু থাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত সৌর প্যানেলের দাম কমে যাওয়া, কারখানাগুলোর জন্য আশীর্বাদ বলা চলে। বেশ কিছু কারখানায় এ ধরনের প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। কোরিয়ান ইপিজেডে সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর প্রকল্প তার একটি উদাহরণ।

বস্তুত জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্বালানি অপচয় রোধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বহুলাংশে কমাবে জ্বালানি খরচ। আমাদের পোশাক খাতকে যেহেতু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই টিকে থাকতে হবে, জ্বালানি খরচ কমাতে পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে। আর ক্রমে বৃদ্ধি পাওয়া বিদ্যুতের মূল্য বিবেচনায়ও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার যথেষ্ট সমীচীন।

করোনা পরিস্থিতি অনেক কারখানাকেই ব্যবসায় টিকে থাকতে নতুন ভাবে উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। এদিকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরে আমাদের সামনে রয়েছে পাঁচ বছরের মতো সময়। আবার, সামনের দিনগুলোতে করোনা বা এ ধরনের দুর্যোগ যে আসবে না তা বলা মুশকিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিঘাতে বৈশ্বিক বাজারে নানামুখী সমস্যা দেখা দিতে পারে। এখন থেকে প্রস্তুতি নিলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি পোশাক খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। এক্ষেত্রে একটি প্রশিক্ষিত টিম থাকার কোনো বিকল্প নেই, যারা পুরো কারখানার জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করবে।

আশার কথা হলো, আমাদের পোশাক প্রস্তুতকারী এবং রপ্তানিকারী শিল্প কারখানাগুলোর সংস্থা বিজিএমইএ ইতোমধ্যে ইউএনএফসিসিসির ফ্যাশন চার্টারের সঙ্গে ২০৩০ সাল নাগাদ পোশাক খাতের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এখন প্রয়োজন উদ্দেশ্য পূরণে কাজ করে যাওয়া। পরিবেশ ও এক্ষেত্রে অনেকটা অনুকূলে। ব্যাংকিং খাতে ঋণের বিপরীতে সুদের হার এখন সবচেয়ে কম; পোশাক শিল্প খাতের মালিকরা চাইলেই সুযোগটি নিতে পারেন। আবার বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকল-এর একটি প্রকল্প সবুজ জলবায়ু তহবিলের চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে, যার আওতায় পোশাক শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে ঋণের সুবিধা দেওয়া হবে। এ ঋণের সুদ বাজারে প্রচলিত হারের চেয়ে কম বৈ বেশি হবে না। ২০২৬ সাল পরবর্তী রপ্তানি বাণিজ্যের কথা বিবেচনায় পোশাক খাতের জন্য এ ধরনের প্রকল্প নির্দি্বধায় সময়োপযোগী।

শুরুতে পোশাকের চাহিদা, ব্যক্তিত্ব ও পোশাকের বৈচিত্র্য নিয়ে বলেছিলাম। তবে এটাও বলতে হয়, সেদিন হয়তো খুব দূরে নয়, আমার এবং আপনার শার্ট ও প্যান্টে ট্যাগ থাকবে- এটি তৈরিতে কত কেজি কার্বন ডাই-অপাইড নির্গমন হয়েছে কিংবা এটি প্রস্তুতকালে কত শতাংশ জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসেছে। পৃথিবীব্যাপী মানুষ আজ অনেক বেশি সচেতন- বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তা নিয়ে। কাজেই অদূর ভবিষ্যতে আমাদের পোশাক খাতের ক্রেতারা পোশাক উৎপাদনে 'জ্বালানি ব্যবহার এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন' সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইতে পারেন।

বিষয় : তৈরি পোশাক খাত টেকসই জ্বালানি

মন্তব্য করুন