শিল্পকারখানায় অগ্নিদুর্ঘটনাসহ অন্যান্য দুর্ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছে হাজারের কাছাকাছি মানুষ, বিল্ডিং ধসে মারা গেছে হাজারের অধিক। নৌ ও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল তো আরও উদ্বেগজনক। এসব দুর্ঘটনায় যে শুধু অনেক সম্ভাবনাময় জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে তাই নয়, ধ্বংস হচ্ছে অনেক সম্পদ। সেইসঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

আমাদের দেশের শিল্পকারখানার মালিকরা অসচেতন, অশিক্ষিত কিংবা বোধহীন নন। তারা নিশ্চয়ই জানেন একটি কারখানা গড়তে হলে কী কী প্রয়োজন, কোন কোন শর্ত মানতে হবে। আমাদের দেশে শ্রম আইন, বিধিমালা এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ও বিধিমালা মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মানুষের কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার জন্য তারা এসব আইন ও বিধিমালা মানতে বাধ্য এবং অঙ্গীকারবদ্ধ। তাহলে এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে কেন? 

কারখানাগুলোতে এসব আইন ও বিধিমালা মানার ব্যাপারে মালিকপক্ষের খুব বেশি তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। তারা মুনাফা নিয়ে যতটা ভাবেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ততটাই উদাসীন থাকেন।

গত ৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাশেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুনে পুড়ে ৫২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। যাদের অনেকেই শিশু। প্রায় প্রতিবছরই আমরা এ ধরনের একাধিক বড় দুর্ঘটনা লক্ষ্য করি। প্রতিটি দুর্ঘটনা নিয়েই কিছুদিন হইচই হয়, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, আবার কিছুদিন পর সবকিছু যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দৃষ্টান্ত তেমন নেই। অনেক সময় তদন্ত প্রতিবেদনই প্রকাশ হয় না। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। ভাবতে অবাক লাগে অনেক তদন্ত কমিটি হয় দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ছাড়াই। এতে দুর্ঘটনার মূল কারণ খুঁজে বের করা দুরূহ হয়ে পড়ে এবং এটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুযোগও তৈরি হয়। ফলে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনা যায় না।

২০২০ সালের গত ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে একটি মসজিদে আগুনে পুড়ে মারা যায় ৩১ জন মানুষ। প্রথমে বলা হলো এসির গ্যাস থেকে আগুন ধরে বিস্ফোরিত হওয়ায় এই দুর্ঘটনা। তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসি কিংবা রেফ্রিজারেটরে যে গ্যাস থাকে তা মোটেও দাহ্য নয়। এসির বিস্ফোরণে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না, যদি সেখানে অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ না থাকে।

কলকাখানায় অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ যত্রতত্র দাহ্য পদার্থ ছড়িয়ে রাখা। কলকারখানায় দাহ্য পদার্থ মানুষের সঙ্গে একত্রে মিলেমিশে থাকতে পারে না। পদার্থের দহনের তীব্রতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্টোরে সংরক্ষণ করতে হয় এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। সেক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি রুলসের ব্যবহার কোথায়? প্রতি বছর আগুনের লেলিহান শিখায় তরতাজা মানুষ নিমেষে ভস্মীভূত হয় কতকগুলো মানুষের সীমাহীন লোভ, দায়িত্বে অবহেলা, খামখেয়ালিপনা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে। এভাবে আর কত মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভে গেলে আমাদের টনক নড়বে? আমাদের মনুষ্যত্ব ও বিবেক জাগ্রত হবে কবে? আমরা আর কবে মানসম্মত ও জুতসই শিল্পকারখানা নির্মাণ করব, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করব?

শিল্পকারখানার পরিদর্শক রাজনৈতিক মালিকানাধীন শিল্পকারখানা যথাযথভাবে পরিদর্শন করতে পারেন না। মালিকপক্ষের ইচ্ছেমতো পরিদর্শন রিপোর্ট দিতে হয়। আবার শিল্পকারখানার পরিদর্শক উৎকোচের বিনিময়ে মানহীন ও নিরাপত্তাহীন শিল্পকারখানার ছাড়পত্র দিয়ে থাকেন- এ অভিযোগ নতুন নয়। অতি মুনাফা আর উৎকোচের কাছে মানুষের জীবন তাই মূল্যহীন।

অগ্নিকাণ্ডসহ সব দুর্ঘটনা রোধে শ্রম মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও পেশাগত স্বাস্থ্য এবং সেফটি কনভেনশনের মানদণ্ড মেনে দেশের সব শিল্পকারখানা পরিচালনায় মালিকপক্ষ, সমিতি ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসহ সবার এগিয়ে আসা উচিত। অপরাধযোগ্য শাস্তির জন্য অর্থদণ্ড ও জেল-জরিমানা বাড়াতে হলে প্রয়োজনে আইন ও বিধিমালায় সংশোধন আনা যেতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিদর্শনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিন। দরকার হলে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটির জন্য পৃথক আইন করুন। এই আইনের অধীনে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত একটি জাতীয় সেফটি বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়াধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অবকাঠামো পুনর্গঠন ও দক্ষ জনবল পদায়ন করুন।

আমরা আশা করি, রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনসের দুর্ঘটনার পরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে এবং মালিক সমিতির আন্তরিকতায় যেভাবে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের উন্নতি হয়েছে, তেমনিভাবে দেশের অন্যান্য কলকারখানায় শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের উন্নতি হবে। কলকারখানাগুলো যেন আর মৃত্যুকূপে পরিণত না হয়- এই প্রত্যাশা সবার।

বিষয় : শিল্পকারখানায় অগ্নিদুর্ঘটনা

মন্তব্য করুন